ডকিন্স তার বইয়ে দেখিয়েছেন স্বার্থপর জিন তত্ত্বের মাধ্যমে খুব সফলভাবে জীবজগতে পরার্থিতার উদ্ভবকে ব্যাখ্যা করা যায়। শুধু তাই নয়, জীবজগতে সবসময়ই স্বার্থপরতা আর পরার্থিতার মধ্যে এক ধরনের ‘দড়ি টানাটানির’ খেলা চলতে থাকে। সেই টানাটানি থেকেই শেষপর্যন্ত নির্ধারিত হয় বিবর্তনীয় স্থিতিশীল কৌশল (Evolutionary Stable Strategy)। কীভাবে স্থিতিশীল কৌশল জীবজগতে রাজত্ব করে, তা বাংলায় একটি চমৎকার প্রবন্ধের মাধ্যমে তুলে ধরেছিলেন মুক্তমনা ব্লগার দিগন্ত সরকার[২৯১]। দিগন্ত লেখা শুরু করেছিলেন একটি মজার উদাহরণ দিয়–
ধরা যাক মুক্তমনায় অপার্থিব আর বন্যা আমার প্রতিযোগী দুই সদস্য। এটা ভাবা খুবই স্বাভাবিক যে আমি এখন অপার্থিবের মুখোমুখি হলেই তাকে মেরে ফেলতে উদ্যত হব। কিন্তু, এমন যদি হয় যে অপার্থিব আবার বন্যারও প্রতিযোগী, তাহলে অপার্থিবকে মারলে আদপে বন্যার সুবিধাই হয়ে যাবে। বরং, বন্যা আর অপার্থিবের মধ্যে প্রতিযোগিতা তীব্র হলেই আমার লাভ বেশি। তাই, প্রতিযোগিতার জটিল ঘূর্ণাবর্তে প্রতিযোগীদের নির্বিচারে হত্যা করাটা নির্বাচিত হবার জন্য খুব একটা ভালো কৌশল নাও হতে পারে।
অর্থাৎ কেবল মারমার কাট-কাট করলেই লাভ হবে না। কারণ ‘মারমার কাট-কাট’ স্ট্র্যাটিজি অনেক সময়ই টিকে থাকার জন্য কোনো ভালো স্ট্র্যাটিজি নয়। মারামারির। পাশাপাশি রপ্ত করতে হবে সহযোগিতার কৌশলও। ব্যাপারটা গাণিতিকভাবেই সহজে প্রমাণ করা যায়। দিগন্ত তার লেখায় এই আকর্ষণীয় বিষয়টি ব্যাখ্যা করেছেন ডকিন্সের বইয়ের একটি চমৎকার উদাহরণ হাজির করে। আমি কিছুটা পরিবর্তিত আকারে উদাহরণটি পাঠকদের সামনে তুলে ধরছি। বলা বাহুল্য, এই উদাহরণটি মূলত মায়নার্ড স্মিথের দেয়া কাল্পনিক ‘Hawk and Dove’ এর ঈষৎ পরিবর্তিত উদাহরণ[২৯২]।
ধরা যাক, একটি জীবগোষ্ঠীর মধ্যে দুই ধরনের পরস্পরবিরোধী কৌশল অবলম্বনকারী জীব রয়েছে। প্রথমটি আগ্রাসী নীতি (আনী), আরেকটি ধান্দাবাজ বিবাদ নীতি (ধানী)। আনীরা হচ্ছে আগ্রাসী, এরা মার মার কাট কাট। তারা সবসময় শেষ রক্তবিন্দু অবধি লড়াই করে, মৃতপ্রায় না হলে রণক্ষেত্র থেকে পলায়ন করে না। অপরদিকে ধানীরাও বিবাদী, কিন্তু একটু ধান্দাবাজ টাইপের। এরা মারামারি না করে অন্য উপায়ে লড়াই করে। এরা ঝগড়া করে, রক্তচক্ষু দেখায়, আক্রমণের ভাব করে কিন্তু রক্তপাত করে না। কিন্তু তারপরেও দুই ধানীতে লড়াই বাধলে শেষপর্যন্ত একজন জিতে আরেকজন হারে। এদের পার্থক্যটা অনেকটা অনেকটা ডিপ্লোম্যাট আর আর্মির পার্থক্যের মতো। আনীর সাথে ধানীর লড়াই হয় না, কারণ ধানী পালিয়ে যায়। কিন্তু দুই আনীর লড়াইতে সর্বদা কোনো না কোনো একজন মারা যায় (বা গুরুতর আহত হয়)।
এবারে লড়াইয়ের কৌশলটি গাণিতিকভাবে হিসেব করা যাক। হিসাবের সুবিধার্থে আমরা ধরে নিব, কোনো জীবই জীবদ্দশায় তার কৌশল বদলায় না, এবং এমনকি প্রতিযোগিতার শুরুতে একে অন্যের কৌশল সম্বন্ধেও অবগত থাকে না। আমাদের এই মডেলের কাল্পনিক পয়েন্ট সিস্টেমে ধরা যাক :
প্রতিযোগিতায় জিতলে ৫০ পয়েন্ট, প্রতিযোগিতায় হারলে ০ পয়েন্ট, সময় নষ্টের জন্য ১০, গুরুতর আহত হলে ১০০ পয়েন্ট বরাদ্দ করা হলো।
— জিনের নির্বাচনের সম্ভাবনার সাথে মিল রেখেই এরকম পয়েন্ট সিস্টেম।
আমরা হিসাব করতে চাই যে এদের মধ্যে কোন্ কৌশলটি (বা এদের কোনো সংমিশ্রণ) স্থিতিশীল হয়ে উঠবে।
মনে করা যাক, জীবগোষ্ঠীর সব জীবই প্রথমে ধানী (ধান্দাবাজ বিবাদী নীতি)। ছিল। তাহলে তাদের মধ্যে প্রতিটি প্রতিযোগিতায়, একজন জেতে (+৫০), একজন হারে (০); আর দুজনেই সময় নষ্ট করে (-১০x২ =–২০), কিন্তু কেউই আহত হয় না। সমষ্টিগতভাবে লাভ হয় ৩০ পয়েন্ট, প্রত্যেকের ভাগে যায় ১৫ পয়েন্ট করে। এবার ধরা যাক একটা আনী (আগ্রাসী নীতি) জীব হঠাৎ এসে হাজির হলো এই গোষ্ঠীতে। সে ধানীদের সহজেই লড়াইতে হারিয়ে দেবে, প্রতি যুদ্ধে +৫০ পয়েন্ট হাসিল করবে। তার ফলে তার আগ্রাসী জিন খুব সহজেই জীবগোষ্ঠীতে বিস্তার লাভ করবে। বিস্তার লাভ করতে করতে, ধরা যাক, একটা সময় পরে জীবগোষ্ঠীতে ধানীদের সংখ্যা একেবারেই কমে যাবে আর গোষ্ঠীর প্রায় সবাই আনী হয়ে যাবে। এখন স্বভাবতই দুই আনীতে লড়াই বাধবে। দুটি আগ্রাসী জীবের লড়াইয়ে প্রত্যেকে গড়ে–২৫ পয়েন্ট পায় (জেতায় +৫০, আর গুরুতর আহত হওয়ায়–১০০)। একটি বিবাদী সেই দলে থাকলে সে সব লড়াইতে হারে, কিন্তু গড়ে সে ০ পয়েন্ট পায় (আগের গণনা থেকে)।-২৫ পয়েন্ট এর চেয়ে ০ পয়েন্ট অনেক ভালো। +৩৫ পয়েন্টের সুবিধা থাকায় সহজেই ধানী কৌশল নিয়ন্ত্রক জিন জনপুঞ্জে বিস্তার লাভ করতে থাকবে।
এতদূর পর্যন্ত গল্পটা শুনে মনে হতে পারে যে জীবগোষ্ঠীতে সবসময় এই দুই কৌশলের জীবদের মধ্যে একটা বাড়াকমা চলবে। কিন্তু বিজ্ঞানীরা অঙ্ক কষে দেখেছেন যে ধানী আর আনীদের অনুপাত ৫:৭ অনুপাতে পৌছলে সমাজ স্থিতিশীলতা লাভ করবে! মানে, ওই অনুপাতে পৌঁছনর পরে প্রতিটি আগ্রাসী (আনী) আর প্রতিটি ধান্দাবাজ বিবাদী (ধানী)র গড়পড়তা লাভ-ক্ষতির তুলনামূলক হিসাব মিলে যায়। অর্থাৎ ধানী : আনী = ৫:৭ হয়ে গেলে নির্বাচনে আর কেউই অন্যের তুলনায় সুবিধা পায় না। এই অনুপাতই এক্ষেত্রে বিবর্তনীয় স্থিতিশীল কৌশল।
