‘স্বজাতি নির্বাচন’ প্রকৃতিতে খুব চমৎকারভাবে কাজ করে বলেই আমরা দেখি কোনো হিংস্র শিকারি পাখি যখন কোনো ছোট পাখিকে লক্ষ্য করে আক্রমণ করে, তখন অনেক সময় দেখা যায় যে, গোত্রের অন্য পাখি চিৎকার করে ডেকে উঠে তাকে সতর্ক করে দেয়। এর ফলশ্রুতিতে সেই শিকারি পাখি আর তার আদি লক্ষ্যকে তাড়া না করে ওই চিষ্কার করা পাখিটিকে আক্রমণ শুরু করে। এই ধরনের পরার্থিতা এবং আত্মত্যাগ কিন্তু প্রকৃতিতে খুব স্বাভাবিকভাবেই দেখা যায়। এই ব্যাপারগুলো স্বজাতি নির্বাচনের মাধ্যমেই উদ্ভূত হয়েছে। হ্যামিলটন বা মায়নার্ড স্মিথের গবেষণার অনেক আগে থেকেই জীববিজ্ঞানীরা ‘কমন সেন্স’ হিসেবে জানতেন। যেমন ১৯৩০ সালে একবার বিজ্ঞানী জে বি এস হালডেনকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল, তিনি তার ভাইয়ের জন্য জীবন বিপন্ন করবেন কি না। তিনি রসিকতা করে উত্তর দিয়েছিলেন, না একটিমাত্র ভাইয়ের জন্য নয়; কিন্তু দুটি ভাই কিংবা আটটি কাজিনের জন্য হলে আমি আছি’। বলা বাহুল্য, হালডেন মনে মনে স্বজাতির নৈকট্য হিসেব করেই তার এই বিখ্যাত উক্তিটি করেছিলেন।
এবারে আরেকটু গভীরে ঢুকি। হ্যামিলটন-স্মিথের প্রস্তাবিত স্বজাতি নির্বাচনের ব্যাপারটা না হয় বোঝা গেল। কিন্তু আমাদের ব্যাখ্যা করতে হবে স্বজাতি নির্বাচন ব্যাপারটা সার্বিকভাবে জীবজগতে কাজ করে কীভাবে। এখানে বলে রাখা প্রয়োজন, স্বজাতি নির্বাচনের মাধ্যমে পরার্থিতা এমনি-এমনি কোথাও কাজ করে না, এটি মূলত কাজ করে হয় বিবর্তনের ক্রীড়াতত্ত্ব বা গেম থিওরির মাধ্যমে ঘটা স্থিতিশীল কৌশল রাজত্ব করার কারণে।
ক্রীড়াতত্ত্ব বা গেম থিওরির যাত্রা শুরু হয়েছিল হাঙ্গেরির প্রতিভাধর গণিতবিদ জন ফন নিউম্যানের হাত দিয়ে ১৯৪৪ সালের দিকে। পরে ১৯৫১ সালের দিকে আরও শক্ত গাঁথুনি দেন প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয়ের গণিতবিদ জন ন্যাশ[২৮৯], তৈরি করেন ন্যাশ স্থিতাবস্থার মডেল (Nash Equilibrium)। প্রথমদিকে অর্থনীতির ভিন্ন। স্ট্র্যাটিজির ব্যাখ্যায় গেম তত্ত্ব ব্যবহৃত হলেও পরে দেখা গেল জীববিজ্ঞানেও এটি সমানভাবে কার্যকরী। জন মায়নার্ড স্মিথসহ অন্যান্য বিজ্ঞানীই গেম তত্ত্বের সাহায্যে দেখিয়েছেন যে, শুধু প্রতিযোগিতা কিংবা স্বার্থপরতা দেখালে জিনপুলকে সর্বোচ্চ দক্ষতায় বাঁচিয়ে রাখা যায় না, সাথে আনতে হয় সহযোগিতা এবং পরার্থিতার কৌশলও।
কিন্তু কথা হচ্ছে, কতকগুলো ভারি ভারি কথা বলে দিলেই তো হলো না। কীভাবে বিবর্তনের গেম থিওরি জীবজগতের উপর কাজ করে সেটা পরিষ্কারভাবে বোঝা চাই। এটি বুঝতে হলে আমাদের সবার প্রথমে তাকাতে হবে জেলখানায় বন্দি আসামিদের উভয়-সংকটের দিকে।
.
আসামির সংকট
গাণিতিকভাবে গেম থিওরির ব্যুৎপত্তি না ঘটলেও এই ধরনের স্ট্র্যাটিজিক সমস্যাগুলো প্রাচীনকালে দার্শনিক আর রাজনীতিবিদদেরও আকৃষ্ট করেছিল। পুরোমাত্রায়। প্রাচীন কালে রাজাবাদশাহরা নিজেদের সাম্রাজ্য টিকিয়ে রাখতে নানা ধরনের ‘গেম প্ল্যান করতেন। কখন কোন্ রাজার সাথে ভালো সম্পর্ক রাখতে হবে, কখন পাশের রাজ্য আক্রমণ করতে হবে, আর কখন বা আবার আক্রমণ ভুলে দেশ রক্ষায় মনোনিবেশ করতে হবে এগুলো নিয়ে তারা চিন্তিত থাকতেন অহর্নিশি। যারা এ ব্যাপারে ভালো কূটবুদ্ধি দিয়ে রাজাদের সাহায্য করতে পারতেন, তাদেরকে রাজসভায় আপ্যায়ন করে নিয়োগ দেয়া হতো। কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্রের কথা আমরা সবাই জানি কূটবুদ্ধির জাল বুনে কীভাবে রাজাকে সহায়তা করা যায় তার শক্তিশালী দলিল এটি। রাজনীতি আর অর্থনীতির নানা প্যাঁচঘোচ খুঁজে প্রজাদের রোষ থেকে রাজার গদি রক্ষার তল্পিবাহক হিসেবে কৌটিল্যকে এখন অভিযুক্ত করা হলেও কৌটিল্যই সম্ভবত ছিলেন মানবেতিহাসের প্রথম অর্থনীতিবিদ যিনি গেম থিওরির মতো স্ট্র্যাটিজিক প্রক্রিয়ায় রাজনীতির বিদ্যমান সমস্যাগুলোর এক ধরনের যৌক্তিক সমাধান খোঁজার চেষ্টা করেছিলেন। শুধু রাজনীতিবিদেরাই নন, অর্থনীতিবিদ, গণিতবিদ কিংবা দার্শনিক থেকে শুরু করে যে কোনো সাধারণ মানুষই বিভিন্ন স্ট্র্যাটিজি পর্যালোচনা করেই জীবনের নানা সিদ্ধান্ত নেন। হাতে একাধিক ভালো চাকরির অফার থাকলে আমরা নতুন চাকরির বেতন, চাকরির স্টেবিলিটি কিংবা চাপ, সেখানকার পরিবেশ, তেলের খরচ, বাড়ি থেকে যাত্রাপথের দূরত্ব কিংবা সময় প্রভৃতি বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নেই কোন চাকরিতে যোগ দিব। সামাজিকভাবে বন্ধুত্ব কিংবা মেলামিশির ক্ষেত্রেও আগাপাশতলা সব কিছু বিবেচনা করেই নেওয়া হয় কার সাথে বন্ধুত্বের সম্পর্ক গড়ে তোলা হবে, আর প্রতি থেকে যাওয়া হবে নিরপেক্ষ। ফেসবুকে বন্ধু নির্বাচনের ক্ষেত্রে কিংবা বিভিন্ন ব্লগে লেখালেখির ক্ষেত্রেও অনেকে নানা স্ট্রেটেজির আশ্রয় নেন–কাকে সমালোচনা করা হবে, আর কার প্রতি যোগাতে হবে প্রচ্ছন্ন সমর্থন। আসলে আমরা নিজেদের অজান্তেই খেলি ক্রীড়াতত্ত্বের জটিল খেলা। প্রাচীনকালে যখন রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা এখনকার মতো ছিল না, পরিস্থিতি ছিল যুদ্ধংদেহী, তখন প্রাচীন কালের মানুষদের মধ্যে ব্যাপারগুলো আরও স্পষ্ট ছিল। তারা বুঝতে পেরেছিল যে, এমন অনেক পরিস্থিতিই জীবনে আসে যখন নিজের একতরফা জয়লাভ করতে যাওয়ার চেয়ে ভালো কোনো স্ট্র্যাটিজি করে প্রতিপক্ষকে দীর্ঘক্ষণ ঘায়েল করে রাখতে পারলে সুবিধা বেশি। কিংবা কখনো সরাসরি প্রতিযোগিতায় না নেমে তৃতীয় পক্ষের সাথে ঝামেলা তৈরি করে দিতে পারলে বেশি সুফল পাওয়া যেতে পারে। কখনো আবার এগুলো কোনোটাতেই না গিয়ে স্রেফ জনসমর্থন বাড়িয়ে কিংবা কিংবা সাময়িক সহযোগিতার মাধ্যমেও সর্বোচ্চ সুফল আদায় করে নেওয়া সম্ভব।
