যখন একজন জীববিজ্ঞানী দেখেন কোনো প্রাণী অন্য কারো উপকার করে চলেছে, তিনি সহজাত নিয়মেই ধরে নেন যে, প্রাণীটিকে উপকারের নামে আসলে তাকে
কাজে লাগানো হচ্ছে, কিংবা এর পেছনে রয়েছে কোনো প্রচ্ছন্ন স্বার্থপরতা। একই ব্যাপার চোখে পড়েছিল বিজ্ঞানী হ্যামিলটানেরও। তিনি পিঁপড়ে, মৌমাছি সহ বিভিন্ন সামাজিক কীট-পতঙ্গের কাজ এবং আচারব্যবহার বহুদিন ধরে পর্যবেক্ষণ করে সিদ্ধান্তে আসেন যে, তাদের পরার্থিতামূলক কাজগুলো আসলে ঢালাওভাবে পরার্থিতামূলক নয়, বরং তাদের বিভিন্ন কাজের পেছনে আসল অভিসন্ধি হচ্ছে খুব স্বার্থপরভাবে জিনের রক্ষা আর বহুপ্রতিলিপি রেখে যাওয়ার পথ সুগম করা। পিঁপড়েরা একসাথে খাদ্যের অন্বেষণ করে, সঙ্ঘবদ্ধভাবে বিরাট কলোনি গড়ে তুলে। মৌমাছিরাও তাই। তাদের মধ্যে আছে এমনকি বন্ধ্যা সৈন্যের (sterile worker) উপস্থিতিও, যারা পুরো জীবন বয্য করে দেয় রানির সেবা যত্নে, নয়তো গোত্রকে রক্ষা করে শত্রুর আক্রমণ থেকে। জৈবিকভাবে চিন্তা করলে এরা তো পরার্থিতার চূড়ান্ত! কারণ নপুংসক এই বন্ধ্যা সৈন্যদের কখনো কোনো সন্তান হয় না। তারা কেবল খোঁজা প্রহরীর মতো হেরেম পাহারা দেয়! সাদা চোখে দেখলে জৈবিকভাবে এদের নিজের জিন রক্ষার তাগিদ একেবারে শূন্য। তাহলে? কলুর বলদের মতো বেগার খাটা এই সৈন্যরা বিদ্রোহ করছে না কেন?
এই ধাঁধাই সমাধান করলেন ব্রিটিশ জীববিজ্ঞানী উইলিয়াম ডোনাল্ড হ্যামিলটন। তিনি তার গবেষণায় দেখালেন যে মৌমাছি কিংবা পিঁপড়েদের সমাজ খুব জটিল। সেখানে রানি মৌমাছির সাথে কর্মী মৌমাছির (যার অধিকাংশই নিজের সন্তান) সম্পর্কের এক জটিল টানাপোড়েন চলে প্রতিনিয়ত। দেখা গেছে, রানি মৌমাছি দিনে প্রায় আড়াই হাজার ডিম পাড়ে। ফলে কয়েকদিনের মধ্যেই কলোনিতে ডিমের সংখ্যা তিন লক্ষ ছাড়িয়ে যায়। সেই ডিমের কিছু অংশকে রানি নিষেক ঘটায় পুরুষ মৌমাছির শুক্রাণু দিয়ে, আবার বহুসংখ্যক ডিম নিষেক ছাড়াই পড়ে থাকে। নিষেক ঘটানো ডিমগুলো থেকে জন্ম হয় কেবল নারী মৌমাছির। এরা ডিপ্লয়েড। এদের ক্রোমজোম থাকে যুগল বন্ধন। এই যুগল সেটটির অর্ধেক আসে বাবার কাছ থেকে আর অর্ধেক মায়ের। কিন্তু অন্যদিকে পুরুষ মৌমাছিরা হ্যাপ্লয়েড, তাদের জন্ম হয় অনিষিক্ত ডিম থেকে জন্ম। এদের কেবল একটিই ক্রোমোজম থাকে, যা সরাসরি তাদের মায়ের কাছ থেকে পাওয়া। ফলে কর্মী নারী মৌমাছিরা তাদের বোনদের সাথে এমনকি শতকরা ৭৫ ভাগ সদৃশ জিনের অংশ বিনিময় করে, যেখানে তার মার সাথে কিংবা তার নিজের সন্তানের সাথে জিনের সাদৃশ্য তাকে শতকরা ৫০ ভাগ, এবং তার ভাইদের সাথে মাত্র ২৫ ভাগ। অর্থাৎ, একটি কর্মী মৌমাছি যদি নিজের বংশ রক্ষার চেয়ে যদি তার সহোদর বোনদের প্রজননে পরোক্ষভাবে সুবিধা করে দেয়, কিংবা তার রানি মৌমাছির সন্তানদের রক্ষা করায় সচেষ্ট হয়, তবেই তার অধিকতর জেনেটিক সাফল্য থাকবে। হিসেব কষলে কিন্তু তাই পাওয়া যাচ্ছে। পিঁপড়া, মৌমাছি কিংবা উইপোকা যাদের এ ধরনের জটিল সামাজিক সম্পর্ক রয়েছে, তাদের সবার মধ্যেই এ ধরনের জটিল সহযোগিতার সম্পর্ক গড়ে ওঠে। কিন্তু এই সহযোগিতা পরের কারণে স্বার্থ দিয়ে বলি’ টাইপের সহযোগিতা নয়, বরং এই সহযোগিতার মূলে থাকে সেই একই স্বার্থপরতাই জিনের আত্মপরায়ণতা। সেজন্যই ম্যাট রিডলী তার ‘দ্য অরিজিন অব ভার্চু’ বইয়ে বলেন[২৮৭]—
In the world of biology, an ant slaves away celibate on behalf of its sisters not out of goodness of its little heart, but out of the selfishness of genes.
চিত্র। পেজ ২৪৯
চিত্র : পিঁপড়েদের মধ্যে বিদ্যমান জটিল জেনেটিক সম্পর্কের কারণেই তাদের মধ্যে এক ধরনের সামাজিক সহযগিতা গড়ে উঠে। বিজ্ঞানী হ্যামিলটন দেখিয়েছেন এই সহযোগিতার মূলে থাকে জিনকেন্দ্রিক স্বার্থপরতাই।
কীভাবে পরার্থিতামূলক অভিব্যক্তি গড়ে উঠে তা নির্ণয়ের জন্য হ্যামিলটন একটি নিয়ম প্রস্তাব করেন, যা জীববিজ্ঞানে এখন হ্যামিলটনের সূত্র হিসেবে পরিচিত। সূত্রটির গাণিতিক সংজ্ঞায়ন এরকম[২৮৮]—
B > c/r
যেখানে,
c হচ্ছে পরার্থিতার ব্যয় (cost of altruism)
bহচ্ছে গ্রাহকের পাওয়া উপযোগিতা (benefit received by recipient)
r হচ্ছে সম্পর্কের গুণাঙ্ক (coefficient of relationship)
অর্থাৎ, সোজা বাংলায়, যখন কোনো প্রজাতির মধ্যে সহযোগিতার উপযোগিতা তার ব্যয়কে অতিক্রম করে যায় তখনই পরার্থিতা উদ্ভূত হবে। হ্যামিলটনের এই নীতিটিকেই বিখ্যাত জীববিজ্ঞানী মায়নার্ড স্মিথ নামকরণ করেছিলেন স্বজাতি নির্বাচন (kin selection) হিসেবে। স্বজাতি নির্বাচনের মোদ্দা কথা হলো, জিনের নৈকট্য (অর্থাৎ হ্যামিলটনের সূত্রে এর মান) যত বেশি হবে, তত বেশি হবে পরার্থিতাসূচক মনোভাব। সেজন্যই দেখা যায় সবাই নিজের সন্তান এবং পরিবারের প্রতি সবার আগে পরার্থিতা প্রদর্শন করে। পরিবারের কেউ বিপদে পড়লে সবার আগে চিন্তিত হয় সবচেয়ে কাছের জেনেটিক সদস্যরাই, তারপরে একটু দূরের আত্মীয়-স্বজন, পরে পাড়া-পড়শী, বন্ধুবান্ধব। সেজন্যই সন্তানের প্রতি বাবা মার আত্মত্যাগের ব্যাপারটি সব সংস্কৃতিতেই পাওয়া যায়, আসলে যা কি না জীববিজ্ঞানীদের চোখে স্বজাতি নির্বাচনের মাধ্যমে জিনপুল রক্ষার প্রয়াস। একইভাবে ছোট ভাইকে ছিনতাইকারীর হাত থেকে বাঁচাতে গিয়ে বড়ভাইয়ের আত্মত্যাগের নানা ঘটনাও বাংলাদেশের পত্র-পত্রিকাগুলোতে পাওয়া যায়।
