আমরা সবাই একেকটি টিকে থাকার যন্ত্র (survival machine)- অন্ধভাবে প্রোগ্রাম করা একটি নিয়ন্ত্রিত যান্ত্রিক বাহন মাত্র যার উদ্দেশ্য কেবল স্বার্থপরভাবে এক ধরনের জৈবঅণুকে সংরক্ষণ করা। … তারা আমার ভেতরে আছে, তারা রয়েছে আপনার ভেতরেও; তারাই আমাদের সৃষ্টি করেছে, আমাদের দেহ আর আমাদের মন; আর। তাদের সংরক্ষণশীলতাই আমাদের অস্তিত্বের চূড়ান্ত মৌলিকত্ব। ওই অনুলিপিকারকেরা এক দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়েছে। এখন তাদেরকে জিন বলে ডাকা হয়, আর আমরা হলাম তাদের উত্তরজীবীতার যন্ত্র।
কাজেই জৈব যন্ত্র যে স্বার্থপর তাতে বিস্ময়ের কিছু নেই। জিনগত স্তরে স্বার্থপরতা থাকার কারণেই অনেকটা ‘টিকে থাকার যন্ত্র’ হিসেবে কাজ করে যায়। কিন্তু বিস্ময়কর যে ব্যাপারটি গবেষণায় বেরিয়ে এল তা হলো–জিনের এই স্বার্থপরতা থেকেই পরার্থিতার মতো এক ধরনের বিপরীতমুখি অভিব্যক্তির উদ্ভব ঘটতে পারে। ‘দ্য অ্যান্ট এন্ড দ্য পিকক’ গ্রন্থের লেখিকা জীববিজ্ঞানী হেলেনা নিন তার ‘দ্য বেটেল অব সেক্সেস রিভিসিটেড’ নামের প্রবন্ধে বলেন?[২৮৩]–
Among genes all is selfishness, every gene out for its own replication. But from conflict can come forth harmony; the very selfishness of genes can give rise to cooperation. For among the potential resources, that genes can exploit is the potential for cooperation with other genes. And if it pays to cooperate, natural selection will favor genes that do so.
স্বার্থপর প্রতিযোগিতার মাধ্যমে পরার্থিতার উদ্ভবের ব্যাপারটি শিক্ষায়তনে গবেষণার মাধ্যমে প্রথমবারের মতো তুলে ধরেন বিজ্ঞানী জর্জ উইলিয়ামস এবং উইলিয়াম হ্যামিলটন[২৮৪]। পরবর্তীতে ধারণাটিকে জনপ্রিয় করে তোলেন রিচার্ড ডকিন্স তার উপরে উল্লিখিত ‘সেলফিশ জিন’ বইয়ের মাধ্যমে[২৮৫]। তারা দেখালেন, স্বার্থপর জিন যেমন আত্মত্যাগ কিংবা পরার্থিতা তৈরি করে, ঠিক তেমনি আবার প্রতিযোগিতামূলক জীবন সংগ্রাম থেকেই জীবজগতে তৈরি হয় বিভিন্ন ধরনের পারস্পরিক সহযোগিতা, মিথোজীবীতা কিংবা সহ-বিবর্তন। টিকে থাকার প্রয়োজনেই কিন্তু এগুলো ঘটে।
চিত্র। পেজ ২৪৬
চিত্র : ক্লাউন মাছ আর এনিমোনের সহবিবর্তন গড়ে উঠে তাদের নিজেদের স্বার্থের কারণেই।
এমনি একটি চমৎকার উদাহরণ হচ্ছে ‘কালারফুল ক্লাউন’ মাছের সাথে এনিমোনের সহবিবর্তন। এ ধরনের মাছ তার গাঢ় রঙের কারণে সহজেই অন্যের শিকারে পরিণত হতে পারে, আত্মরক্ষার জন্য গাঢ় রঙের সামুদ্রিক এনিমোনের শুড়ের ভিতর প্রায়শই আত্মগোপন করে। এভাবে ক্লাউন মাছগুলো শিকারি মাছের দৃষ্টি এড়িয়ে যেতে সমর্থ হয়। আবার অন্যদিকে এনিমোনগুলোও ক্লাউন মাছের কারণে উপকৃত হয়। কারণ ক্লাউন মাছগুলো এনিমোনভোগী ছোট মাছকে তাড়িয়ে দেয়। এনিমোন এবং ক্লাউন মাছের সহবিবর্তনের ফলে উপকৃত হচ্ছে দুই প্রজাতিই। নিঃস্বার্থ ভাবে একে অপরের সেবা করার জন্য তাদের মধ্যে সম্পর্ক গড়ে উঠেনি, বরং বন্ধুর প্রকৃতিতে আত্মরক্ষা আর টিকে থাকার প্রয়োজনেই তাদের মধ্যে গড়ে উঠেছে তাদের মধ্যে সহযোগিতার সম্পর্ক। এ ধরনের অনেক সম্পর্কই প্রকৃতিতে আছে। হামিং বার্ডের সাথে অর্নিথোপথিলাস ফুলের সহবিবর্তন, এরাকোয়িড অর্কিডের সাথে আফ্রিকান মথের সহবিবর্তন এগুলোর প্রত্যক্ষ উদাহরণ। অত্যন্ত স্বার্থপর কারণেই তাদের মধ্যে সহমর্মিতার সম্পর্ক গড়ে উঠেছে; আর সেই নিতান্ত স্বার্থপর কারণটি হলো সফলভাবে টিকে থাকার ইচ্ছে। স্বার্থপরতার কারণেই কীভাবে সহযোগিতার গুণাবলি প্রকৃতিতে বেড়ে উঠে সেটি বিশ্লেষণ করতে গিয়েই বিজ্ঞান লেখক ম্যাট রিডলী তার ‘নৈতিকতার উৎস’ বইয়ে উল্লেখ করেছেন—উই কোঅপারেট ইন অর্ডার তু কম্পিট বেটার। ব্যাপারটা খুব নির্জলাভাবে সত্য।
আমরা ছোটবেলায় কামিনী রায়ের অনেক পরার্থিতামূলক কবিতা পড়েছি–
পরের কারণে স্বার্থ দিয়া বলি, এ জীবন মন সকলই দাও
তার মতো সুখ কোথাও কি আছে? আপনার কথা ভুলিয়া যাও।…
কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত ‘আপনার কথা ভুলিয়া পরের কারণে স্বার্থ বিলিয়ে দেয়ার মতো করে প্রকৃতিতে জীবজগৎ কাজ করে না। ডারউইন অনেক আগেই ধারণা করেছিলেন যে, তার বিবর্তন তত্ত্ব সত্যি হলে, প্রকৃতিতে এমন কোনো জীব পাওয়া যাবে না যে শুধু নিঃস্বার্থভাবে অন্য প্রজাতির সেবা করার জন্য বেঁচে থাকে, প্রাকৃতিক নির্বাচনের নিয়মেই সে বিলুপ্ত হয়ে যেতে বাধ্য। ডারউইন তার “অরিজিন অব স্পিশিজ’ বইতে তার পাঠকদেরকে চ্যালেঞ্জ করেছিলেন এ ধরনের একটা প্রজাতি খুঁজে বের করার জন্য, এবং স্বাভাবিক কারণেই আজ পর্যন্ত কেউ সে চ্যালেঞ্জের উত্তর দিতে পারেনি। এই সহজ ব্যাপারটা আমরা প্রায়ই ভুলে যাই। আমাদের দেহের ভিতরেই অসংখ্য উপকারী ব্যকটেরিয়া বাস করে, এগুলো আমাদের দেহে থাকার ফলে আমরা যেমন তাদের দিয়ে উপকৃত হচ্ছি, তেমনি আবার ব্যাকটেরিয়াগুলোও বেঁচে থাকার নানা রসদ খুঁজে পাচ্ছে আমাদের দেহে। এমন কিন্তু নয় যে, আমরা ব্যাকটেরিয়াগুলোকে সেবা করার পশরা সাজিয়ে বসে আছি তাদের উপকার করার জন্য। কিংবা উল্টোভাবে ব্যাক্টেরিয়াগুলো সাহায্যের দোকান খুলে বসে আছে মানবসমাজকে নিঃস্বার্থ সেবা দেয়ার লক্ষ্যে। বরং দুইপক্ষের স্বার্থসিদ্ধি হচ্ছে বলেই এই সহযোগিতার সম্পর্কগুলো টিকে রয়েছে। অর্থাৎ, পরার্থিতা কিংবা সহযোগিতা যাই বলি না কেন এর মূলে কিন্তু রয়ে যাচ্ছে সেই মোটা দাগে লোভাতুর স্বার্থপরতাই। বিজ্ঞানী জর্জ উইলিয়ামস সেজন্য খুব চাঁছাছোলাভাবেই বলেছেন[২৮৬]–
