চিত্র: ইকনিউমেন প্রজাতির বোলতা শুয়োপোকাকে হুল ফুটিয়ে দৈহিকভাবে অবশ করে দিয়ে সেই শিকারের দেহের ভেতরে ডিম পাড়ে, আর তার দেহকে খাদ্য হিসেবে ব্যবহার করে।
প্রকৃতির এই ঢালাও নিষ্ঠুরতা দেখে এক সময় বিচলিত হয়েছিলেন ডারউইনও। তিনি প্যারাসিটোয়েড বোলতাগুলোর বীভৎসতা দেখে পরম করুণাময় ঈশ্বরের অস্তিত্ব নিয়েই সন্দিহান হয়ে পড়েন; তিনি মন্তব্য করতে বাধ্য হয়েছিলেন[২৮০]–
আমি ভাবতেই পারি না, একজন পরম করুণাময় এবং সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী কোনো ঈশ্বর এইভাবে ডিজাইন করে তার সৃষ্টি তৈরি করেছেন যে, ইকনিউমেনগুলোর খেয়ে-পরে বেঁচে থাকার জন্য একটি জীবন্ত কিন্তু প্যারালাইজড শুয়োপোকার প্রয়োজন হয়।
ঈশ্বরের ‘ভুল ডিজাইনের’ কথা না হয় বাদ থাকুক। আমরা বরং বৈজ্ঞানিকভাবেই খুঁজে দেখার চেষ্টা করি কেন প্রকৃতিতে এই ঢালাও নিষ্ঠুরতা এমনিভাবে টিকে আছে! বলা বাহুল্য, এই প্রশ্নের একটি সর্বজনগ্রাহ্য বিজ্ঞানভিত্তিক উত্তর খুঁজে পেয়েছিলেন চার্লস ডারউইনই, ১৮৫৯ সালে প্রস্তাবিত বিবর্তন তত্ত্বের মাধ্যমে। ডারউইন বুঝেছিলেন যে, প্রকৃতিতে প্রতিটি জীবের বংশবৃদ্ধির ক্ষমতা যত, সে পরিমাণ খাদ্যের যোগান প্রকৃতিতে কখনোই থাকে না। শুধু খাদ্য নয়, আশ্রয়, নাসস্থান এমনকি প্রজনন সঙ্গীরও ঘাটতি থাকে। এ সব নিয়ে প্রতিনিয়ত অন্তঃপ্রজাতি (intra-species) এবং আন্তঃপ্রজাতি (inter-species) প্রতিযোগিতা চলে। জীবজগতে সবাইকেই বেঁচে থাকার, অধঃবংশ রেখে যাওয়ার অর্থাৎ এক কথায় টিকে থাকার জন্য সংগ্রাম চলে। তিনি এর নাম দেন জীবনের জন্য সংগ্রাম বা জীবন-সংগ্রাম (struggle of existence)। ডারউইন বুঝতে পেরেছিলেন– জীবন সংগ্রামের কারণেই প্রকৃতির জীবজগৎকে কিছু ক্ষেত্রে চরম নিষ্ঠুর হতে হয়েছে।
এখন ডারউইন প্রস্তাবিত বিবর্তনীয় পটভুমিকায় প্যারাসিটোয়েড বোলতার নিষ্ঠুরতার ব্যাপারটা আরেকবার চিন্তা করা যাক। উত্তর খুঁজে পাওয়া খুব একটা কঠিন হবে না। শুয়োপোকার জীবন্ত দেহ নিঃসন্দেহে শূককীটের জন্য খুব ভালো আশ্রয় এবং নিরাপদ খাদ্যের যোগান। কাজেই বিবর্তনের দীর্ঘ পথপরিক্রমায় এমন কোনো জীব খুঁজে পেলে নিশ্চয় আমরা অবাক হব না যে কি না খাদ্যের চালান এবং আশ্রয় বজায় রাখার জন্য শুয়োপোকাকে নিস্তেজ করে তার দেহকে ব্যবহার করার সুযোগ নিতে চাইবে। প্যারাসিটোয়েড বোলতাগুলো সেই সুযোগেরই সফল সদ্ব্যবহারকারী মাত্র।
ডারউইইন যখন বিবর্তন তত্ত্ব প্রস্তাব করেছিলেন তখন তিনি জিনের ব্যাপার স্যাপারগুলো মোটেই জানতেন না। জানবেনই বা কী করে? জেনেটিক্সের তখন জন্মই হয়নি। এমনকি মেন্ডেলের সমসাময়িক হওয়া সত্ত্বেও মেন্ডেলের জিন নিয়ে প্রাথমিক কাজগুলো তার দৃষ্টির অগোচরে থেকে গিয়েছিল। শুধু ডারউইনই নন, সেসময়কার সমসাময়িক কোনো বিজ্ঞানীই মেন্ডেলের কাজের গুরুত্ব অনুধাবন করতে পারেন নি, তার কাজ মূলত হারিয়েই গিয়েছিল বিস্মৃতির অন্তরালে। মেন্ডেলের মৃত্যুর ১৬ বছর পরে সেগুলো পুনরাবিস্কৃত হয় ইউগো দ্য ফ্রিস, কার্ল করেন্স এবং এরিখ ফন শেরমাখ–সেসেনাগ প্রমুখ বিজ্ঞানীদের দ্বারা। তারপর থেকে বিশেষত আধুনিক বংশগতিবিদ্যার উন্মেষের পর থেকে আমরা জিন সম্বন্ধে সম্যক ধারণা অর্জন করেছি। চল্লিশের দশকে জনপুঞ্জ বংশগতিবিদ্যার অভ্যুদয়ের পর প্রাকৃতিক নির্বাচনের সাথে বংশগতির সম্মিলন ঘটে। জনপুঞ্জে জিন কীভাবে বংশাণুসৃত হয়, তা ব্যাখ্যা করেছিলেন গণিতবিদ জি এইচ হার্ডি এবং জার্মান চিকিৎসক ভিলহেল্ম ওয়েইনবার্গ। পরে পরিসংখ্যানবিদ ইউল দেখিয়েছিলেন যে ডারউইনের অবিচ্ছিন্ন পরিবৃত্তি যে মেন্ডেলবাদের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ, পরিসংখ্যান দিয়ে তা প্রমাণ করা যায়। জীববিদ নিলসনের গবেষণায় ইউলের প্রকল্পের প্রমাণ পাওয়া যায়। তবে সর্বাধিক ইনফ্লুয়েনশিয়াল ছিল ১৯৩৭ সালে ডবজাবস্কির ‘জেনেটিক্স এন্ড অরিজিন অব স্পিশিজ’ নামক বইটির প্রকাশ। এই বইয়ের মাধ্যমেই আসলে আধুনিক বংশগতিবিদ্যার সাথে ডারউইনবাদের সমন্বয় ঘটে। রঙ্গমঞ্চে আসে বিবর্তনের সংশ্লেষণী তত্ত্ব তথা আধুনিক বিবর্তনের তত্ত্ব, যা এখনও বিবর্তনের স্বীকৃত তত্ত্ব হিসেবে জীববিজ্ঞানের পরিমণ্ডলে রাজত্ব করে চলেছে।
সেই আধুনিক বিবর্তন তত্ত্ব আমাদের খুব ভালোভাবে দেখিয়েছে জিনগত স্তরে এক ধরনের স্বার্থপরতাকাজ করে[২৮১]। আমরা সবাই অবগত যে, মানুষসহ যে কোনো প্রাণীর মধ্যেই সন্তানদের প্রতি অপত্য স্নেহ প্রদর্শন কিংবা সন্তানদের রক্ষাকরার জন্য মাবাবারা সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকার করে। অর্থাৎ, নিজের দেহকে বিনষ্ট করে হলেও পরবর্তী জিনকে রক্ষা করে চলতে সচেষ্ট হয় জীবজগতের প্রায় সকল সদস্যরাই। কারণ, ‘পরবর্তী জিন’ রক্ষা না পেলে নিজের দেহ সুন্দর, কিংবা সুরক্ষিত হোক না কেন, বিবর্তনের দিক থেকে কোনো অভিযোজিত মূল্য নেই। সেজন্যই নেকড়ে যখন আক্রমণ করে, গোত্রের ছোট বাচ্চাদের রক্ষা করার জন্য বুনো মোষেরা বাচ্চাদের চারিদিকে ঘিরে শিং উচিয়ে নেকড়ের সামনে দাঁড়িয়ে থাকে, নিজেদের জীবনকে বিপন্ন করে হলেও। এভাবেই জীব নিজেকে বিবর্তনের পথ ধরে এমনভাবে নিয়ে চলে যাতে তার জিন-বিস্তারে কিংবা ভবিষ্যত প্রজন্মকে রক্ষায় উদ্যোগী হয়, টিকে থাকার প্রয়োজনেই। আসলে যার সাথে সে বেশি জিন বিনিময় করবে, যত ঘনিষ্ঠতা বাড়াবে, তত বাড়বে নিজের জিন বিস্তারের সম্ভাবনা, সেজন্যই, জীব নির্বিশেষে সন্তানের প্রতি, পরিবারের প্রতি, নিকটাত্মীয়ের প্রতি এবং গোত্রের প্রতি একধরনের জৈবিক টান উপলব্ধি করে, এবং তাদেরকে রক্ষার চেষ্টা করে। কাজেই জিনের উদ্দেশ্য যদি কেউ বলেন কেবল স্বার্থপরভাবে প্রতিলিপি করা আর ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে রক্ষা করা তাহলে সেটা অত্যুক্তি হবে না মোটেই। সেজন্যই স্বনামখ্যাত বিজ্ঞানী রিচার্ড ডকিন্স তার ‘সেলফিশ জিন’ গ্রন্থে অনুপম কাব্যিক ভঙ্গিমায় বলেন[২৮২]–
