এই গবেষণার উপসংহার থেকে জানা যায়, যদিও একজন পঞ্চাশ বছর বয়স্ক ব্যক্তি একজন পঁচিশ বছর বয়স্ক ব্যক্তির চেয়ে কম সহিংস এবং কম অপরাধপ্রবণ (বয়স বনাম অপরাধপ্রবণতার রেখচিত্রটি স্মরণ করুন), কিন্তু পঞ্চাশ বছর বয়সি ব্যক্তি যদি পঁচিশ বছর বয়স্ক নারীকে বিয়ে করেন, তার স্ত্রীকে প্রহার, নির্যাতন এবং হত্যার সম্ভাবনা একজন পঁচিশ বছর বয়সি স্বামীর চেয়ে (যার সমবয়সি স্ত্রী রয়েছে) বেশি। যৌনতার ঈর্ষা তাদের বেশি থাকার কারণেই এটি ঘটে বলে মনে করা হয়।
.
কেন সারা পৃথিবী জুড়ে জাতিবিদ্বেষ এবং সংখ্যালঘুদের ওপর অত্যাচার রয়েই যাচ্ছে?
সংখ্যালঘুরা সর্বত্রই সংখ্যালঘু। হিন্দুরা বাংলাদেশে যে যন্ত্রণায় থাকেন, ঠিক একই ধরনের যন্ত্রণা হয়তো একটি মুসলিমও ভোগ করেন অন্য কোনো রাষ্ট্রে। ৯/১১ এর ঘটনার পরে নির্বিচারে মুসলিমদের গায়ে সন্ত্রাসের ট্যাগ লাগিয়ে হেনস্থা করা হয়েছে আমেরিকা সহ অনেক রাষ্ট্রেই। অনেক নিরপরাধীকেও জেল-জরিমানা খাটতে হয়েছে প্রমাণ ছাড়াই, কেবল সন্দেহের ফলশ্রুতিতে। বাংলাদেশেও সংখ্যালঘুদের উপর আগ্রাসন প্রবল। ২০০১ সালের নির্বাচনের পর নির্বাচন পরবর্তী সময়ে বেছে বেছে হিন্দুবাড়িগুলোতে আক্রমণ চালানো হয়। পূর্ণিমা রানির মতো বহু কিশোরীকে ধর্ষণ করা হয়। নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবার প্রথম ৯২ দিনের মধ্যে ২২৮টি ধর্ষণের ঘটনা, এবং পরবর্তী তিনমাসে প্রায় ১০০০টি ধর্ষণের ঘটনা ঘটে, যার মধ্যে শতকরা ৯৮ ভাগ ছিল হিন্দু কিংবা সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের অন্তর্গত। ২০০১ সালের ঘটনা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছিল না, বাংলাদেশে ১৯৪১ সালে হিন্দু জনসংখ্যা ছিল শতকরা ২৮ ভাগ। ১৯৪৭ সালে ভারত ভাগের অব্যবহিত পরে তা শতকরা ২২ ভাগে এসে দাঁড়ায়। এরপর থেকেই সংখ্যালঘুদের উপর ক্রমাগত অত্যাচার এবং নিপীড়নের ধারাবাহিকতায় দেশটিতে ক্রমশ হিন্দুদের সংখ্যা কমতে থাকে। ১৯৬১ সালে ১৮.৫%, ১৯৭৪ সালে কমে দাঁড়ায় ১৩.৫%, ১৯৮১ সালে ১২.১% এবং ১৯৯১ সালে ১০% এ এসে দাঁড়ায়। সাম্প্রতিক সময়গুলোতে হিন্দুদের শতকরা হার কমে ৮ ভাগের নীচে নেমে এসেছে বলে অনুমিত হয়।
শুধু হিন্দুদের ওপরেই নয়, বাঙালিরা আবার একজোট হয়ে চাকমা এবং অন্যান্য ক্ষুদ্ৰজাতিসত্তাগুলোর উপর আগ্রাসন এবং নিপীড়ন চালিয়েছে নিজ দেশে। স্বাধীনতার পরপরই আমাদের বাংলাদেশের স্থপতি শেখমুজিব পাহাড়িদের উদ্দেশ্যে বলেছিলেন— ‘তোরা সব বাঙালি হইয়া যা’। যে দেশটি দীর্ঘ নয় মাসের সাম্রাজ্যবাদী শোষণ তুচ্ছ করে স্বাধীন হয়েছিল, তার নির্বাচিত প্রতিনধি, স্বাধীন রাষ্ট্রের কর্ণধার মুজিব সেই একই পাকিস্তানি কায়দায় সাম্রাজ্যবাদের জোয়াল তুলে দিলেন। সংখ্যালঘু পাহাড়িদের উপর, অস্বীকার করলেন আদিবাসীদের স্বতন্ত্র সাংস্কৃতিক পরিচয়টুকু। তার পরে জেনারেল জিয়া তার রাজত্বকালে পার্বত্য চট্টগ্রামে ৪ লাখ বাঙালিকে পুনর্বাসনের জন্য নিয়ে গিয়েছিলেন। তাদের কিছু অংশকে খাগড়াছড়ি জেলা শহরের ৩ মাইল দক্ষিণে ভুয়াছড়ি মৌজায় একটি চাকমা গ্রামের পাশে বসান হয়েছিল। সেই থেকে শুরু হয়েছিল পাকিস্তানি কায়দায় পাহাড়িদের সংস্কৃতির উপর বাঙালি আগ্রাসন। ২০০৩ সালের ১৯ এপ্রিল গভীর রাতে সেই গ্রামের সেটেলার বলে কথিত উদ্বাস্তু বাঙালিরা সেনা ক্যাম্পের কিছু সেনা সদস্যকে সঙ্গে নিয়ে পাশের চাকমা গ্রামে গিয়ে লুটপাট কর, এরপর করে অগ্নিসংযোগ। সেই একই বছর আগাস্ট মাসে খাগড়াছড়ি জেলার মহালছড়ি উপজেলার মহালছড়ি বাজারের দোকানি এবং মহালছড়ি ইউনিয়নের উদ্বাস্তু বাঙালিরা আবারো আদিবাসিদের বাড়িঘরে লুটপাট চালায়, এরপর বাড়িঘরে অগ্নিসংযোগ করে। এতে ৯টি গ্রামের ৩৫০টির ও অধিক বাড়ি পুড়ে ছাই হয়ে যায়। মহালছড়ি ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান বিনোদ বিহারী খীসা যিনি সন্ত্রাসীদের নিবৃত্ত করতে চেয়েছিলেন তাকে পিটিয়ে হত্যা করে। এছাড়া সন্ত্রাসীরা ২টি বৌদ্ধ মন্দির পুড়িয়ে দেয়, ২টি বৌদ্ধ মন্দির তছনছ করে এবং মুল্যবান ধাতুর তৈরি ৪টি বুদ্ধ মূর্তি লুট করে নিয়ে যায়; মা-মেয়ে সহ ৮ জন মহিলা এবং একজন অপ্রাপ্তবয়স্ক বালিকাকে ধর্ষণ করে। এদের মধ্যে কয়েকজন গণধর্ষণের শিকার হয়। ২০০৭ সালের মার্চ থেকে ৩ ডিসেম্বর পর্যন্ত খাগড়াছড়ি সদর থানার ২টি ইউনিয়নে এবং মহালছড়ি উপজেলার ২টি ইউনিয়নে মোট ১৪টি গ্রামের ১৩৩ ব্যক্তির এবং একটি স্কুলের ৩৯৯.২২ একর জমি সেটেলার বাঙালিরা ইতিমধ্যে দখল করে নিয়েছে। তাছাড়া রাঙামাটির বুড়িঘাটে ১০জন আদিবাসির ২৫ একর জমি সন্ত্রাসী বাঙালিরা দখল করে নিয়েছে। এগুলো পত্রিকাতেই এসেছে। তবে পত্রিকায় যা এসেছে তা মহাসমুদ্রের মাঝে এক দু-ফোঁটা জলবিন্দু ছাড়া কিছু নয়। হাজারো কান্না, কষ্ট আর হতাশ্বাসের কথা হারিয়ে গেছে। বিস্মৃতির অন্তরালে। কেন এই জাতিসত্তার বিরোধ? কেন এই অন্তহীন সংঘাত?
সংখ্যালঘুত্ব, জাতিসত্তার সংঘাত প্রভৃতি নিয়ে তো সামাজিক, অর্থনৈতিক এবং রাজনৈতিক ব্যাখ্যা অনেক দেয়া হয়েছে। আমি এই বইয়ে বিবর্তনীয় মনোবিজ্ঞানের দৃষ্টিকোণ থেকে কিছু মতামত দেয়ার প্রচেদষ্টা নিব। এ ব্যাখ্যাগুলো এরকমভাবে আগে কোথাও দেয়া হয়নি। হয়তো পাঠকেরা কিছু নতুনত্ব খুঁজে পেতে পারেন।
