বিবর্তনীয় মনোবিজ্ঞানের ধারণা অনুযায়ী, আমরা জাতীয়তাবোধে কিংবা দেশপ্রেমে কিংবা জাতিগত ভাতৃত্বে ঐক্যবদ্ধ হই খুব সহজ কারণে, এবং সেই কারণটি নিহিত আছে (রাজনীতি, সংস্কৃতি এবং অর্থনীতির পাশাপাশি) জীববিজ্ঞানে। প্রতিটি মানুষ, যতই উদার হোক না কেন, খুব স্বার্থপরভাবেই প্রথমে নিজের সন্তান এবং পরিবারের ছেলে মেয়ে, ভাই বোন, বউ, বাবা মা) মঙ্গল-অমঙ্গলের ব্যাপারটা অবার আগে দেখে। এটা জানা কথাই। কারণ, জেনেটিকভাবে চিন্তা করলে তারাই একটি মানুষের সবচেয়ে ‘আপন জন’, তাই সবচেয়ে কাছের জিনপুলকে সে রক্ষা করতে চায়, তারপরে একটু দূরের (যেমন, আত্মীয়-স্বজন, বন্ধুবান্ধব, পাড়া প্রতিবেশী) এবং এ ব্যাপারটা জৈবিকভাবেই অঙ্কুরিত। এগুলো আমাদের সমাজে হরহামেশাই দেখি। ঠিক আমরা যে কারণে সন্তান কিংবা পিতামাতা এবং পরিবারের মঙ্গলের জন্য জৈবিক তাড়না অনুভব করি, ঠিক একই কারণে স্বজাতিমোহেও উদ্বুদ্ধ হই। স্বজাতি’ ব্যাপারটা আর কিছুই নয় আমাদের এক্সটেন্ডেড জেনোটাইপের দ্বারা নির্ধারিত ‘এক্সটেন্ডেড পরিবার’ (extended family)। বিবর্তনের মূল কাজই হচ্ছে যত বেশি সংখ্যক প্রতিলিপি তৈরি করা আর ‘নিজস্ব’ জিনপুলকে রক্ষা করে চলা। কাজেই বিবর্তনে আমাদের সেই সমস্ত প্রচেষ্টাই ‘অধিক হারে’ উপযোগিতা পাবে, যেটি সদৃশ কিংবা কিংবা সমরূপ জিনকে রক্ষা করে চলবে। জোসেফ এম হুইটমেয়ার নামের এক বিজ্ঞানী এ নিয়ে গবেষণা করছিলেন বহুদিন ধরেই। তিনি বলেন, গাণিতিকভাবে এটি দেখানো যায় যে, একটি জিন সেই দিকেই ঝুঁকে পড়বে কিংবা টিকে থাকার উপযোগিতা দেখাবে যেখানে এটার বাহক, বা তার সন্তান সন্ততি কিংবা নাতিপুতির সমবৈশিষ্ট্য সম্পন্ন জিনের মধ্যে বৈবাহিক সম্পর্ক স্থাপনের সুযোগ কিংবা সম্ভাবনা থাকবে[২৭০]। হুইটমেয়ারের যুক্তি হলো, এথনিক গ্রুপগুলো আসলে পরষ্পরের সম্পর্কিত বর্ধিত পরিবার’ (extended family) বই কিছু নয়, কারণ তাদের দূরবর্তী সদস্যদের মধ্যে ভবিষ্যতে সম্পর্কের সম্ভাবনা থেকে যাচ্ছে।
ঠিক এই কারণেই সম্ভবত বাঙালি আমেরিকায় পাড়ি দিয়েও বাঙালি কমিউনিটি খুঁজে ফেরে, অফিসেও দেখা যায় ভারতীয়রা একসাথে নিজেরা লাঞ্চে যায়, চৈনিকেরাও তাদের স্বজাতি খুঁজে ফেরে। ব্যাপারটি আর কিছুই নয়, ‘বর্ধিত পরিবার’ হিসেবে বিবেচনা করে জিনপুল রক্ষার প্রচেষ্টা।
এই ব্যাখ্যা অনুযায়ী, মানুষ আসলে জন্মগতভাবেই কিছু না কিছু সাম্প্রদায়িক বা রেসিস্ট মনোভাব নিয়ে জন্মগ্রহণ করে (যতই অস্বস্তি লাগুক না কেন শুনতে)। নিজের সম্প্রদায়কে সবার আগে ভালোবাসা মানুষের মজ্জাগত, তাই স্বভাবগতভাবেই কিছুটা হলেও সাম্প্রদায়িক বলা যেতে পারে। পরবর্তীতে সামাজিকীকরণ, শিক্ষা, সুগুণের চর্চার মাধ্যমে আমরা সাম্প্রদায়িকতার বলয় থেকে বেরিয়ে আসতে পারি, তবে অনেকেই পারেন না সেটাও কিন্তু দেখি। অনেক সময় একভাবে সাম্প্রদায়িকতা অস্বীকার করলেও আবার ভিন্নভাবে সাম্প্রদায়িকতার উদ্গীরণ ঘটে। কিছু উদাহরণ আমাদের হাতের কাছেই আছে। আমরা ১৯৭১ সালে পাকিস্তান থেকে স্বাধীন হয়েছিলাম রক্তাক্ত যুদ্ধের মাধ্যমে। আমরা অস্বীকার করতে পেরেছিলাম জিন্নার দ্বিজাতিতত্ত্বকে। অনেকেই একাত্তুরে বাংলাদেশের অভ্যুদয়কে অসাম্প্রদায়িক চেতনার ফসল হিসেবে দেখেন। ভালো কথা। কিন্তু সেই ‘অসাম্প্রদায়িক’ আমরাই আবার দেশপ্রেমের মোহে উজ্জীবিত হয়ে চাকমাদের উদ্বাস্তু করেছি, গৃহহীন করেছি, তাদের গায়ে পাকিস্তানি কায়দায়’ লেবাস লাগিয়েছি রাষ্ট্রদ্রোহিতার। পাকিস্তানি কায়দায় ধর্ষণ, অত্যাচার কোনো কিছুই বাদ দেইনি। রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিভিন্ন ব্যাখ্যা দেয়া গেলেও জৈববৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা উহ্যই ছিল। এদিক থেকে ব্যাপারটার ব্যাখ্যা খুব সহজ। পাকিস্তানিদের বিরুদ্ধে আমরা সহজেই ঐক্যবদ্ধ হতে পেরেছি, একসাথে যুদ্ধ করতে পেরেছি কারণ আমরা বাঙালি জাতি নিজেদের একটি বর্ধিত পরিবার’ বলে ভাবতে পেরেছি, আমরা বাঙালিরা জেনেটিকভাবে পাকিস্তানিদের তুলনায় অনেক কাছাকাছি। কিন্তু স্বাধীনতার পরে আমরাই আবার চাকমাদের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছি, কারণ চাকমারা আবার জেনেটিকভাবে আমাদের থেকে একটু দূরের। এই ক্ষেত্রে বর্ধিত পরিবার-এর মাধ্যমে তৈরি হওয়া দেশপ্রেমই রূপ নিয়েছিল অন্ধ স্বজাতি মোহে, যা চাকমাদের বিরুদ্ধে আমাদের প্রয়োগ করতে বাধেনি। এ ধরনের অনেক উদাহরণই দেয়া যায়, বইয়ের আকারের কথা মনে রেখে একটি উদাহরণেই আপাতত সীমাবদ্ধ রইলাম।
এখন কথা হচ্ছে, এই সংঘাত দূর করার উপায় কী? যেহেতু আমরা প্রত্যেকেই কিছু না কিছু জাত্যাভিমানী প্রবণতা নিয়ে জন্মাই, এবং বড় হয়ে বিভিন্ন পরিবেশে এবং সময়ে এর পরিস্ফুটন ঘটে, আমরা হয়তো কখনোই এ ধরনের সংঘাত পুরোপুরি দূর করতে পারবো না। কিন্তু পুরোপুরি দূর না করতে পারলেও কমিয়ে আনতে পারি, সেটা কিন্তু ঠিক। শিক্ষা, মানবিকতার চর্চা কিংবা সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড প্রভৃতি মানসজগৎ-কে ঋদ্ধ করতে পারে সেগুলো আমরা জানি। নিজের জগতে কূপমণ্ডূক হয়ে না পড়ে থেকে যদি আমরা ভিন্ন সংস্কৃতি সম্বন্ধে জানতে চেষ্টা করি, নিজেদের মনের দুয়ার উদার করতে পারি অনেক ক্ষেত্রেই আমরা সাম্প্রদায়িকতার বলয় থেকে বেরিয়ে আসতে পারি। তারপরেও ব্যাপারগুলো আরোপিত। জেনেটিক ব্যাপারটায় আসলে কোনো প্রভাব ফেলছে না সেভাবে। জেনেটিকভাবে তৈরি রেসিজম কমাতে হলে একভাবেই আমরা তা কমাতে পারি। জোসেফ এম হুইটমেয়ার-এর গাণিতিক মডেল বলছে সমাধান হচ্ছে ‘ক্রস কালচারাল ইন্টারম্যারেজ’ বা বিভিন্ন জাতিসত্তার মধ্যে বিয়ে। তাদের মতে পারস্পরিক সংঘাতময়তা প্রদর্শনকারী গ্রুপের সদস্যরা যদি স্বজাতিমোহ ছেড়ে অন্য সংস্কৃতির/ধর্মের সদস্যদের বিয়ে করতে শুরু করে, তবেই একমাত্র কনফ্লিক্ট (মজ্জাগত রেসিজম?) কমে আসবে।
