তার সফল এবং বিখ্যাত আবিষ্কারগুলো তরুণ বয়সেই (চব্বিশ বছরের মধ্যেই। করে ফেললেও এটি উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, তার প্রতিভা কিন্তু লোপ পায়নি। ত্রিশ বছর বয়সে রিফ্লেক্টিং টেলিস্কোপ আবিষ্কার করেন, ৪৪ বছর বয়েসের সময় তিনি বিখ্যাত গ্রন্থ প্রিন্সিপিয়া প্রকাশের জন্য রয়েল সোসাইটিতে পাঠিয়েছিলেন। (সেখানেই তিনি মাধ্যাকর্ষণ সূত্র এবং তিনটি গতিসূত্রের ব্যাখ্যা প্রথমবারের মতো হাজির করেছিলেন), ৬২ বছর বয়সে প্রকাশ করেন অপটিক্স। অপ্টিক্সের তৃতীয় সংস্করণ নিউটন প্রকাশ করেছিলেন ৮৪ বছর বয়সে, মৃত্যুর মাত্র এক বছর আগে। পঁচাশি বছর বয়সে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত অর্থাৎ পুরো জীবনকাল জুড়েই নিউটন কর্মক্ষম ছিলেন গণিত, পদার্থবিজ্ঞান, রসায়ন, এমনকি জীববিজ্ঞানসহ এমন কোনো শাখা নেই নিউটনের পাদস্পর্শে ধন্য হয়নি। নিউটন যে এত কর্মক্ষম একটা সময় অতিবাহিত করতে পেরেছিলেন-এর একটা কারণ অনেকেই মনে করেন তিনি। অবিবাহিত ছিলেন; ফলে ‘প্রকারান্তরে মৃত’ হবার হাত থেকে বেঁচে গেছেন।
ব্যাপারটি কিন্তু কেবল নিউটনের ক্ষেত্রেই সত্য বলে ভাবলে ভুল হবে। গবেষকেরা দেখেছেন যে, অন্তত শতকরা পঞ্চাশভাগ (৫০%) ক্ষেত্রে অবিবাহিত বিজ্ঞানীরা তাদের সবচেয়ে বড় আবিষ্কারগুলো যেমন জীবনের প্রাথমিক সময়ে (বিশ বছর বয়সের দিকে) করেন, ঠিক তেমনি পুনর্বার সেরকম কিছু করে দেখাতে পারেন যখন বয়স পঞ্চাশ পেরোয়, কিন্তু বিবাহিত বিজ্ঞানীদের মধ্যে সে ধরনের সফলতার হার শতকরা মাত্র ৪.২ ভাগ[২৬৮]। নীচে গবেষণাপত্র থেকে বিবাহিত এবং অবিবাহিত বিজ্ঞানীদের সফলতার একটা তুলনামূলক চিত্র দেয়া হলো–
চিত্র। পেজ ২২৭
চিত্র- বিবাহিত এবং অবিবাহিত বিজ্ঞানীদের প্রতিভা ক্ষুরনের তুলনামূলক রেখচিত্র।
গ্রাফগুলোর ট্রেন্ড দেখলে সবাই একবাক্যে স্বীকার করবেন যে, বিবাহিত বিজ্ঞানীরা আসলে ‘প্রকারান্তরে মৃত’!
অবশ্য এ ধরনের ট্রেন্ডের ফলাফল যাই হোক এর কারণ নিয়ে বিতর্ক করার সুযোগ আছে পুরোমাত্রায়। কমন সেন্স’ থেকেই বোঝা যায় যে, পেশার বাইরেও বিবাহিত বিজ্ঞানীদের বড় একটা সময় সংসার, বাচ্চাকাচ্চা মানুষ-করাসহ আনুষঙ্গিক পার্থিব কাজে ব্যয় করতে হয়। আর আধুনিক বিশ্বে পুরুষদের পাশাপাশি মেয়েদেরও কিন্তু নিজস্ব ক্যারিয়ার থাকে। ফলে গৃহস্থালির কাজগুলো প্রায়শই স্বামী-স্ত্রীতে ভাগাভাগি করে নিতে হয়; আর এগুলো করতে গিয়ে তাদের একাডেমিক গবেষণার সময় কমে আসে। অবিবাহিত বিজ্ঞানীরা যেহেতু পুরোটা সময় এসমস্ত ঝুটঝামেলা থেকে মুক্ত থাকেন সেহেতু তারা গবেষণায় প্রতিভা ফুরণের সুযোগ এবং সময় পান। বেশি। কাজেই প্রতিভা লোপের ব্যাপারটা কতটা জৈবিক আর কতটা সামাজিকতা নিয়ে সন্দেহ কিংবা বিতর্ক করার যথেষ্টই অবকাশ আছে। তারপরেও বিবর্তনীয় মনোবিজ্ঞান নিয়ে গবেষণারত কিছু গবেষক দেখিয়েছেন যে, সত্তুরের দশকে কিংবা তার আগে মেয়েদের খুব একটা নিজস্ব ক্যারিয়ার ছিল না। সে সময় গৃহস্থালির কাজগুলো মূলত মেয়েরাই করত। ফলে বিবাহিত পুরুষ বিজ্ঞানীদের তেমন একটা বাচ্চাকাচ্চা ঘর-সংসার নিয়ে মাথা ঘামাতে হতো না। কিন্তু তারপরেও বিবাহিত বিজ্ঞানীদের প্রতিভার স্ফুরণে কোন উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন পাওয়া যায়নি। ভিক্টোরীয় পুরুষতান্ত্রিক সমাজ হোক, আর আধুনিক জেন্ডার সচেতন সমাজ হোক, ট্রেন্ড একটাই–বিয়ের পর একইভাবে প্রতিভার স্ফুরণ কমে আসে প্রায় একই ধারায়।
.
কেন বুড়োভামদের মধ্যে স্ত্রী হত্যার প্রকোপ বেশি?
আমরা আগের কিছু অধায়ের আলোচনা থেকে জেনেছি যে, বিবর্তনীয় মনোবিজ্ঞানের অনুকল্প অনুযায়ী যৌনতা সংক্রান্ত হিংসা কিংবা ঈর্ষার ব্যাপারটি আসলে জৈবিকভাবে পুরুষদের মধ্যে অঙ্কুরিত। এর পেছনের কারণটি নিয়ে বইয়ের চতুর্থ অধ্যায়ে (সখি, ভালোবাসা কারে কয়?) কিছুটা আলোচনা করার চেষ্টা করা হয়েছে। এখানেও সঙ্গত কারণে কিছুটা পুনরুল্লেখ করতে হচ্ছে। আমরা জানি যে, পুরুষেরা কেবল সঙ্গম করেই খালাস, আর ওদিকে গর্ভধারণ এবং বাচ্চা প্রসবের পুরো প্রক্রিয়াটা নারীদের নিজেদের মধ্যেই ধারণ করতে হয়, পুরুষদের কোনো ভূমিকা থাকে না। ফলে একটি সন্তান জন্মানোর পরে পুরুষরা নিজেদের পিতৃত্ব নিয়ে কখনোই পুরোপুরি নিশ্চিত হতে পারে না (আধুনিক ডিএনএ টেস্ট আসার আগে সেটা প্রযুক্তিগতও সম্ভব ছিল না। কিন্তু একজন মাকে যেহেতু গর্ভধারণ করতে হয় এবং শারীরিকভাবে বাচ্চার জন্ম দিতে হয়, প্রত্যেক মা-ই জানে যে সেই তার সন্তানের মা। অর্থাৎ, পিতৃত্বের ব্যাপারটা শতভাগ নিশ্চিত না হলেও মাতৃত্বের ব্যাপারটা নিশ্চিত। ফলে বিবর্তন মনোবিজ্ঞানীদের অভিমত হলো–পুরুষেরা মূলত ‘সেক্সয়ালি জেলাস’ হিসেবে বিবর্তনের ধারাবাহিকতায় বেড়ে উঠেছে।
তরুণদের মধ্যে সহিংসতা এমনিতেই বেশি। সাদা চোখে মনে হতে পারে যে তারাই বেশি স্ত্রীদের উপর নির্যাতন করবে, কিংবা রাগের মাথায় স্ত্রীদের হত্যা করবে। অনেক সমাজবিজ্ঞানী এই ভবিষ্যদ্বাণীর সপক্ষে যুক্তিও দিয়েছিলেন। কিন্তু বিবর্তন মনোবিজ্ঞানী মার্গো উইলসন অনেক আগেই অভিমত দিয়েছিলেন, তরুণদের মধ্যে সহিংসতা বেশি হলেও যৌনতার ঈর্ষার কারণে বয়স্ক ব্যক্তিদের ঢের বেশি তরুণী স্ত্রীদের হত্যা করার কথা। কারণ তরুণী স্ত্রীরা প্রজননগতভাবে অনেক বেশি আক্রমণ্য এবং অরক্ষিত থাকে। তারা তাদের স্বামীদের চেয়ে প্রজননগত দিক থেকে অনেক উর্বর, এবং তাদের পরকীয়ার সম্ভাবনাও থাকে বেশি। বয়োবৃদ্ধ স্বামীরাও সেটা খুব ভালো করেই জানে। তাই তারা থাকে স্ত্রীদের প্রতি অতিরিক্ত সন্দেহপ্রবণ। তাদের এই শকুনাচরণ খুব সহজেই সহিংসতায় রূপ নিতে পারে কোনো ধরনের পরকীয়ার আলামত পেলে কিংবা এ সংক্রান্ত আনুষঙ্গিক সন্দেহের বশে। এ নিয়ে পরবর্তী গবেষণায় দেখা গেল সমাজবিজ্ঞানীরা নন, বিবর্তন মনোবিজ্ঞানী মার্গো উইলসনই সঠিক প্রমাণিত হয়েছেন। যেমন ক্যানাডায় গবেষণা চালিয়ে দেখা গেছে, মধ্যবয়সি পুরুষেরা (৪৫ থেকে ৫৪ বছর বয়সের পরিসীমায়) স্বামীরা যদি সদ্য তরুণী নারীকে (১৫ থেকে ২৫ বছরের পরিসীমায়) বিয়ে করে, তবে তাদের জন্য স্ত্রী হত্যার প্রকোপ তরুণ স্বামীদের তরুণী স্ত্রী (যারা উভয়েই ১৫ থেকে ২৫ বছরের পরিসীমায় রয়েছেন) হত্যার চেয়ে ছয়গুণ বেশি পাওয়া গেছে[২৬৯]। বিবর্তন মনোবিজ্ঞানকে যারা মিথ্যা প্রতিপাদনযোগ্য নয় কিংবা পরীক্ষণযোগ্য নয় বলে মনে করেন, তারা এ গবেষণাটির কথা স্মরণ রাখতে পারেন।
