সিঙ্গাপুরে থাকাকালীন সময়ের একটা মজার ঘটনা মনে পড়ছে এ প্রসঙ্গে। ১৯৯৯/২০০০ সালের ঘটনা। আমি তখন সবেমাত্র বাংলাদেশ থেকে সিঙ্গাপুরে পাড়ি দিয়ে ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব সিঙ্গাপুরে মাস্টার্স করছি। আমরা কয়েক বন্ধু মিলে সিঙ্গাপুরের ক্লেমেন্টি এলাকায় বাসা ভাড়া করে থাকতাম, আর সেখান থেকে বাস নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে যেতাম। বাসে সিটের তুলনায় যাত্রী উঠতো বেশি, অনেকটা ঢাকা শহরের বাসগুলোর মতোই। বাসের সিট ভরে যাওয়ার পর অনেক যাত্রীকেই দাঁড়িয়ে যেতে হতো তাদের মধ্যে নারী পুরুষ সবাই থাকতেন। স্বভাবতই আমরা যারা বাংলাদেশ থেকে সবেমাত্র এসেছি তাদের জন্য ব্যাপারটা ছিল খুব অস্বস্তিকর। আমরা সব তাগড়া জোয়ানেরা সিট দখল করে বসে আছি, আর হয়তো পাশেই একটি মেয়ে পুরো রাস্তা বাসের রড ধরে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে যাচ্ছে। আমার বন্ধু। সাইফুল ছিল খুব মানবদরদি টাইপের। একদিন ঠিক তার সিটের পাশেই একটি নরমসরম মেয়ে দাঁড়িয়ে যাচ্ছে, দেখে থাকতে না পেরে উঠে দাঁড়িয়ে নিজ সিটে মেয়েটিকে বসতে অনুরোধ করল। কিন্তু মেয়েটি তাতে খুশি হলো না মোটেই, বরং অবাক হয়ে জানতে চাইলেন,
– “আপনার জায়গায় কেন আমি বসব?_অবাক চোখে প্রশ্ন মেয়েটির।
— ‘কারণ, আপনি দাঁড়িয়ে যাচ্ছেন। আর আমি বসে … সাইফুলের জবাব।
— ‘হ্যাঁ, কিন্তু আমি বসলে তো আবার আপনাকে দাঁড়িয়ে যেতে হয়।
–‘তাতে অসুবিধা নেই।
– “আমার আছে। আপনি তো আমার আগে বাসে উঠেছেন, আপনি কেন আমার জন্য সিট ছেড়ে দেবেন? আর দিলেই বা আমি বসব কেন?
— ‘কিন্তু আপনি তো মেয়ে… আমতা আমতা কণ্ঠ সাইফুলের।
— মেয়ে তো কী হয়েছে? আমি তো আর অথর্ব নই। আপনি যেভাবে দাঁড়িয়ে যেতেন, আমি ঠিক একইভাবে দাঁড়িয়ে যাচ্ছি। এতে তো কোনো অসুবিধা হচ্ছে না।‘
-‘তা বটে, কিন্তু …’
— ‘আমরা এখানে কেবল বয়োবৃদ্ধ নাগরিক বা সিনিয়র সিটিজেনদের কিংবা পঙ্গু বা প্রতিবন্ধীদের জন্য আসন ছেড়ে দেই। অন্য কারো জন্যে নয়। আপনাদের দেশে কি নিয়ম আলাদা?
— “হ্যাঁ, আমাদের দেশে বাসে নারীদের জন্য আলাদা আসন থাকে। কোনো নারী দাঁড়িয়ে থাকলে আমরা তাদের জন্য আসন ছেড়ে দেই। নইলে অভদ্রতা করা হয়। আমি ভেবেছিলাম এই ভদ্রতার ব্যাপারটা সব জায়গায় একই রকম হবে…।
— কিন্তু আপনি কি বুঝতে পারছেন, যে এই ভদ্রতার আড়ালে একটি মানসিকতা কাজ করছে যে, নারীরা অথর্ব, তারা আপনাদের মতো দাঁড়িয়ে বাসে করে যেতে পারবেন না…’।
ঘটনার অনেক দিন পার হয়ে গেলেও এই সংলাপগুলো আমার এখনও মনে আছে আমার, সাইফুলের দুজনেরই। এই ভদ্রতার আড়ালে একটি মানসিকতা কাজ করছে যে, নারীরা অথর্ব’ মেয়েটির এই ধাক্কার জের আমাদের বহন করতে হয়েছিল অনেকদিন।
আসল কথা হলো, সভ্যতার বিনির্মাণে কারো অবদানই কম নয়, দুজনেই একে অন্যের পরিপূরক। নারী পুরুষ উভয়েই সভ্যতা তৈরিতে অবদান রেখেছে বিপুলভাবে, এ নিয়ে কারোই কোনো সন্দেহ থাকা উচিত নয়। অধ্যায়টি শেষ করছি কাজী নজরুল ইসলামের ‘নারী’ কবিতাটি থেকে অবিস্মরণীয় কিছু লাইন তুলে দিয়ে
‘বিশ্বের যা কিছু মহান সৃষ্টি চির কল্যাণকর।
অর্ধেক তার করিয়াছে নারী, অর্ধেক তার নর।
বিশ্বে যা কিছু এল পাপ তাপ বেদনা অশ্রুবারি,
অর্ধেক তার আনিয়াছে নর অর্ধেক তার নারী।
…
জগতের যত বড় বড় জয়, বড় বড় অভিযান
মাতা ভগ্নি বধূদের ত্যাগে হইয়াছে মহান।
কোন রণে কত খুন দিল নর, লেখা আছে ইতিহাসে
কত নারী দিল সিঁথির সিঁদুর, লেখা নাই তার পাশে।
…
কত মাতা দিল হৃদয় উপড়ি, কত বোন দিল সেবা
বীর স্মৃতি স্তম্ভের গায়ে লিখিয়া রেখেছে কেবা?
কোনো কালে একা হয়নি ক জয়ী পুরুষের তরবারী
প্রেরণা দিয়েছে, শক্তি দিয়েছে বিজয় লক্ষ্মী নারী’।
…
সে যুগ হয়েছে বাসি
যে যুগে যে যুগে পুরুষ দাস ছিল না ক, নারীরা আছিল দাসী!
বেদনার যুগ, মানুষের যুগ, সাম্যের যুগ আজি,
কেহ রহিবে না বন্দী কাহারও, উঠিছে ডঙ্কা বাজি!
০৬. জীবন মানে যুদ্ধ যুদ্ধ খেলা
যুদ্ধ মানে শত্রু শত্রু খেলা,
যুদ্ধ মানেই আমার প্রতি তোমার অবহেলা
…. (নির্মলেন্দু গুণ)
মানবিকতার নমুনা
অনেকেই খুব সরল চিন্তাভাবনা থেকে ধরে নেন, মানুষ বোধ হয় খুব শান্তিপ্রিয় একটা জীব, আর সহিংসতাজিনিসটা পুরোটাই কেবল পশুদের প্রবৃত্তি। এই পশুপ্রবৃত্তিকে মানুষ আবার আলাদা করে ‘পাশবিকতা’ বলে ডাকে। এমন একটা ভাব যে, আমরা মানুষেরা তো আর পশু নই, আমরা সৃষ্টির সেরা জীব। আমরা কি আর পশুদের মতো সহিংসতা, খুন ধর্ষণ, হত্যা–এগুলোতে জড়াই? আমরা মানব। পাশুদের কাজ ‘পাশবিক’ আর আমাদের কাজ সব ‘মানবিক’। তো, সৃষ্টির সেরা জীব মানুষের এই খোদ বিংশ শতাব্দিতে ঘটানো কিছু ‘মানবিক কাজের খতিয়ানে নজর দেয়া যাক[১৮৯]—
- প্রথম বিশ্বযুদ্ধে মারা যায় দেড় কোটি লোক, আর দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে প্রায় সাড়ে পাঁচ কোটি লোক।
- পাকিস্তানি বাহিনী ১৯৭১ সালের নয় মাসের মধ্যে ৩০ লক্ষ বাংলাদেশিকে হত্যা করে, ধর্ষণ করে প্রায় ২ লক্ষ নারীকে।
- ল্যান্সেট সার্ভে অনুযায়ী আমেরিকার ইরাক দখল এবং যুদ্ধে এখন পর্যন্ত নিহতের সংখ্যা ৬ লক্ষের উপর।
- খেমাররুজ বাহিনী কম্বোডিয়ায় ১৯৭৫ থেকে ১৯৭৯ সালের মধ্যে হত্যা করে অন্তত ২০ লাখ মানুষকে।
- চীনে চেয়ারম্যান মাও-এর শাসনামলে গৃহযুদ্ধ দুর্ভিক্ষসহ নানা কারণে মারা যায় ৪ কোটি লোক। চীনের সাংস্কৃতিক বিপ্লবের সময়েই মৃত্যুসংখ্যা ছাড়িয়ে যায় ৩০ লক্ষের উপর। এছাড়া সোভিয়েত ইউনিয়নে ২ কোটি লোক, ১০ লাখ লোখ ভিয়েতনামে, ২০ লাখ লোক উত্তর কোরিয়ায়, ২০ লাখ লোক কম্বোডিয়ায়, ১০ লাখ লোক পূর্ব ইউরোপের দেশগুলোতে, দেড় লাখ লোক পূর্ব ইউরোপে, ১৭ লাখ লোক আফ্রিকায়, ১৫ লাখ লোক আফগানিস্তানে কমিউনিস্ট শাসনামলে নিহত হয়।
- বিশ্বযুদ্ধোত্তর পৃথিবীতে আমেরিকার আধিপত্যের ঝান্ডার উদাহরণগুলোও এখানে প্রাসঙ্গিক। মার্কিন আধিপত্যবাদ প্রতিষ্ঠিত করতে গিয়ে শুধু ভিয়েতনাম যুদ্ধের সময়ই উত্তর ও দক্ষিণ ভিয়েতনামের প্রতি বর্গমাইল জায়গার ওপর গড়ে ৭০ টনের বেশি বোমা ফেলেছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। অন্য ভাষায় বললে, মাথাপিছু প্রতিটি লোকের জন্য ৫০০ পাউন্ড বোমা। এমনকি গাছপালা ধ্বংসের রাসায়নিকও ছড়িয়ে দিয়েছিল দেশের অনেক জায়গায়। নিউজ উইকের এক সাংবাদিক যিনি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ইউরোপে কাজ করতেন, তিনি লিখেছেন নাৎসিরা বিশ্বযুদ্ধের সময় ইহুদিদের উপর যে অত্যাচার চালিয়েছিল, ভিয়েতনামে মার্কিন নির্যাতন তাকেও হার মানিয়েছিল। ভিয়েতনামের মাইলাই হত্যাকাণ্ড মানবসভ্যতার ইতিহাসের এক ঘৃণ্য অধ্যায়। ১৯৬৮ সালের ১৬ই মার্চ সকাল সাড়ে তিনটায় সাম্রাজ্যবাদী মার্কিনবাহিনী দক্ষিণ চীন সাগরের উপকুলে একটি ছোট্ট গ্রাম মাইলাইতে প্রবেশ করে, এবং গ্রামের নিরস্ত্র সাধারণ লোকের উপর হামলা চালিয়ে নারী, শিশু, বৃদ্ধসহ ৩৪৭ জন গ্রামবাসীকে কয়েকঘণ্টার মধ্যে হত্যা করে। নারী আর শিশুদের বিকৃত উপায়ে ধর্ষণ করে ওই আবু-গারিবের কয়েক ডিগ্রি উপরের মাত্রায়। গ্রামের সাধারণ মানুষের উপর নির্যাতন এতই ভয়াবহ ছিল যে, খোদ মার্কিনবাহিনীরই দুই-একজন (হিউ টমসন)-এর বিরোধিতা করে গ্রামবাসীর পক্ষে অস্ত্র হাতে রুখে দাঁড়ায়। অনেকদিন ধরে সারাবিশ্ব এই ঘটনা সম্পর্কে বিন্দুবিসর্গ জানতে পারেনি। এ ধরনের বহু নজিরবিহীন। ধ্বংসলীলা ঘটেছে দেশে-দেশে রক্তলোলুপ মার্কিন সাম্রাজ্যের হাতে এই বিংশ শতাব্দীতে।
- সাড়া বিশ্বে প্রতি বছর পাঁচ হাজার নারী মারা যায় ‘অনর কিলিং’-এর শিকার হয়ে। মুসলিম প্রধান দেশগুলোতে এই মৃত্যুর হার সর্বাধিক।
- সাড়া বিশ্বে প্রতি বছর প্রায় ১৪ লক্ষ নারী ধর্ষণ এবং শারীরিক নির্যাতনের শিকার হয়। হাই স্কুলে গমনরত প্রায় ১৭ ভাগ ছাত্রী কখনো না কখনো শারীরিক নির্যাতনের শিকার হয়, ১২ ভাগ ছাত্রী শিকার হয় যৌন নিগ্রহের।
- আন্তর্জাতিকভাবে প্রতি বছর সামাজিক নিপীড়ন, ধর্ষণ, হেনস্থাসহ বিভিন্ন কারণে আত্মহত্যা করতে বাধ্য হয় দশ লক্ষ লোক।
- সাড়া বিশ্বেই প্রায় ১৬ লক্ষ লোক সহিংসতার শিকার হয়ে মারা যায়। তার অর্ধেকই মারা যায় আত্মহত্যায়, এক তৃতীয়াংশ গণহত্যায় এবং এক পঞ্চমাংশ সশস্ত্র সংঘাতে।
- প্রতি বছর সাড়া দুনিয়া জুড়ে চোদ্দ হাজারেরও বেশি সন্ত্রাসবাদী কর্মকাণ্ড ঘটে, মৃত্যুবরণ করে ২২০০০ লোক।
- দলীয় কোন্দল, অস্ত্রবাজি প্রভৃতির শিকার হয়ে জাপান, অষ্ট্রেলিয়া ইংল্যান্ড প্রভৃতি দেশে প্রতি বছর মারা যায় পনেরো থেকে পচার জন লোক, আর ব্রাজিল, দক্ষিন আফ্রিকা, কলম্বিয়া আর আমেরিকায় এই সংখ্যা বছরে দশ হাজার থেকে শুরু করে চল্লিশ হাজার ছাড়িয়ে যায়।
চিন্তা করে দেখুন–উপরে আমাদের মানবিক’ কীর্তিকলাপগুলোর যে গুটিকয় হিসাব-কিতাব উল্লেখ করেছি তা কেবল এই বিংশ শতাব্দী বা তৎপরবর্তী সময়ের ঘটনা। বিশাল সিন্ধুর বুকে কেবল বিন্দুমাত্র, তাই না? কিন্তু তারপরেও ‘মানবিক বীভৎসতার সামান্য নমুনা দেখেই যে কারো চক্ষু চরকগাছ হতে বাধ্য।
