হয়তো অনেকে ভাবতে পারেন যে, পারমাণবিক অস্ত্র আর আধুনিক অস্ত্র সস্ত্রের ঝনঝনানি বৃদ্ধি পাওয়াতেই বোধ হয় সহিংসতা বিংশ শতাব্দীতে এত মাত্রাতিরিক্ত বেড়েছে। আগেকার পৃথিবীর সময়গুলো নিশ্চয় খুব শান্তিময় ছিল। আমাদের বুড়ো দাদা-দাদি কিংবা বয়োবৃদ্ধদের প্রায়ই সুর করে বলতে শুনি–’তোরা সব গোল্লায় যাচ্ছিস, আমাদের সময়ে আমরা কত ভালো ছিলাম। তো আপনিও যদি আপনার দাদা-দাদি আর বয়োজ্যেষ্ঠদের মতো সেরকমই ভেবে থাকেন যে, ‘দিন যত এগুচ্ছে সমাজ তত অধঃপতিত হচ্ছে, তাহলে আপনার জন্য অপেক্ষা করছে বড়সড় বিস্ময়। স্টিভেন পিঙ্কারের উদ্ধৃতি দিয়েই বলি[১৯০]—
আসলে আমরা আমাদের এই বিংশ শতাব্দীতেই তুলনামুলকভাবে সবচেয়ে শান্তিপূর্ণ এবং সহিষ্ণু সময় অতিক্রম করছি, আমাদের পূর্বপুরুষেরা ছিল আক্ষরিক অর্থেই বর্বর।
হয়তো পিঙ্কারের কথাটা অত্যুক্তি মনে হবে। কিন্তু আপনি যদি নিরপেক্ষভাবে মানব জাতির ইতিহাসের পাঠ নেন, এবং তথ্য বিশ্লেষণ করেন তাহলে আর সেটাকে অবাস্তব কিংবা অত্যুক্তি কোনোটাই মনে হবে না। আসুন, সেটার দিকে একটু নজর দেই।
আমাদের আদিম পূর্বপুরুষ যারা প্লেইস্টোসিন যুগের পুরো সময়টাতে শিকারি সংগ্রাহক হিসেবে জীবনযাপন করত তাদের জীবনযাত্রা থেকে কিছু বাস্তব পরিসংখ্যান হাজির করা যাক। ১৯৭৮ সালে প্রত্নতত্ত্ববিদ ক্যারোল এম্বার তার গবেষণায় দেখান যে, আদিমযুগেশিকারি সংগ্রাহক সমাজের শতকরা ৯০ ভাগ গোত্রই হানাহানি মারামারিতে লিপ্ত থাকত আর এর মধ্যে শতকরা ৬৪ ভাগ ক্ষেত্রে যুদ্ধ সংগঠিত হতো প্রতি দুই বছরের মধ্যেই[১৯১]। প্রত্নতত্ত্ববিদ লরেন্সকিলী (Lawrence Keeley) আধুনিক বিশ্বেবিংশশতাব্দিতে ঘটা ইউরোপ আমেরিকার সহিংসতার সাথে আমাদের পূর্বপুরুষদের সহিংসতার তুলনা করে দেখিয়েছেন যে, বিংশ শতাব্দীতে বিভিন্ন যুদ্ধে যে হারে মানুষ মারা গেছে (দুই বিশ্ব যুদ্ধে নিহতদের সংখ্যা গোনায় ধরেও) সেটা আদিম কালে আমাদের পূর্বপুরুষদের সহিংসতার তুলনায় অত্যন্ত নগণ্য[১৯২]।
চিত্র। পেজ ১৭৫
চিত্র— আদিম কালের শিকারি-সংগ্রাহক সমাজ এবং আধুনিক বিংশ শতাব্দীর সমাজের তুলনামূলক রেখচিত্র (প্রত্নতত্ত্ববিদ লরেন্স কিলীর ‘ওয়ার বিফোর সিভিলাইজেশন’ থেকে সংগৃহিত)।
উপরের গ্রাফটি লক্ষ করুন। উপর থেকে শুরু করে প্রথম আটটি গ্রাফ শিকারি সংগ্রাহক সমাজের। আর শেষটি যেটি ‘প্রায় অদৃশ্যমান’ অবস্থায় কোন রকমে অস্তিত্বের জানান দিচ্ছে, সেটি আধুনিক কালের সহিংসতার নিদর্শন। গ্রাফটি দেখলেই আপনি তুলনামূলক সহিংসতার নমুনাটি বুঝতে পারবেন, আধুনিক কালের তুলনায় আদিমকালে সহিংসতা কি হারে বেশি ছিল। এখনও মানবসমাজে নিউগিনি হাইল্যান্ডস এবং আমাজন এলাকায় কিছু আদিম শিকারি সংগ্রাহক সমাজের অস্তিত্ব দেখা যায়। সেখানকার জিরো (Jivaro) কিংবা ইয়ানোমামোর (Yanomamd) শিকারি সংগ্রাহক সমাজে যে পরিমাণ সহিংসতা হয় তাতে একজন ব্যক্তির অন্তত শতকরা ৬০ ভাগ সম্ভাবনা থাকে আরেজন শিকারির হাতে মারা যাওয়ার, সেখানে গেবুসিতে (Gebusi) সেই সম্ভাবনা শতকরা মাত্র ১৫ ভাগ। আর আধুনিক সমাজে সেটা ২ ভাগেরও কম। আদিম সমাজে যে হারে মারামারি কাটাকাটি চলতো, সেই হারে আধুনিক সমাজ পরিচালিত হলে বিংশ শতাব্দীতে একশ মিলিয়ন নয়, দুই বিলিয়ন মানুষ মারা যেত বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন। সেই হিসেবে আমরা পিছাইনি, বরং এগিয়েছি।
প্রাচীনকালে শুধু যুদ্ধ বিগ্রহ নয়, যুদ্ধের পর যুদ্ধবন্দিদের উপর যেভাবে অত্যাচার করা হতো তা শুনলে আজকের নরম হৃদয়ের মানুষেরা অক্কা পাবেন নিঃসন্দেহে। এক গোত্র আরেক গোত্রের উপর আক্রমণ চালিয়ে শুধু ‘স্পয়েল ওব ওয়ার’ হিসেবে নারীদের ধর্ষণ, উপভোগ কিংবা দাস তো বানাতোই (এগুলো ছিল একেবারেই মামুলি ব্যাপার), যুদ্ধবন্দিদের বসিয়ে রেখে তাড়িয়ে তাড়িয়ে চোখ উপড়ে ফেলা হতো, হাত পা কেটে ফেলা হতো, অনেক সময় আবার আয়েশ করে উপড়ানো মাংস ভক্ষণও করা হতো আনন্দের সাথে[১৯৩, ১৯৪]। পাঠকদের হয়তো বর্ণনাগুলো পড়ে বিকৃত হরর ছায়াছবির মতো মনে হতে পারে, কিন্তু মনে রাখতে হবে আজকের দিনের হরর ছায়াছবিগুলোই ছিল সেসময়ের নির্মম বাস্তবতা। সে সময় যুদ্ধের ব্যাপারে কোনো নিয়মনীতি ছিল না, ছিল না কোনো ‘জেনেভা কনভেনশন’, ছিল না নারী কিংবা শিশুদের প্রতি কোনো বিশেষ সুব্যবহারের নির্দেশ। একতরফাভাবে যুদ্ধ করে প্রতিপক্ষকে কচুকাটা করাই ছিল যুদ্ধের একমাত্র লক্ষ্য।
বিংশ শতাব্দীতে আমরা পারতপক্ষে মারামারি হানাহানি খুনোখুনি একদম বাদ দিতে পারলেও অনেকটাই কমিয়ে এনেছি বলা যায়। এমনকি যুদ্ধের সময়ও কিছু ‘এথিক্স’ পালন করি, যেমন, বেসামরিক জায়গায় হত্যা, লুণ্ঠন, বোমাবাজিকে নিরুৎসাহিত করি, যুদ্ধবন্দিদের উপর যতদূর সম্ভব আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী মানবিক ব্যবহার করার চেষ্টা করি। এর পেছনে গণতান্ত্রিক আইন প্রয়োগ, শিক্ষার বিস্তার, মানবিক অধিকারের প্রতি সচেতনতা বৃদ্ধি প্রভৃতিকে উল্লেখ করা যায়। শুধু তাই নয়, আমাদের সভ্য জীবনযাত্রা লক্ষ করুন। অনেক কিছুতেই আমরা প্রাণপণে ‘পলিটিকালি কারেক্ট’ থাকার চেষ্টা করি। বক্তব্যে কিংবা লেখায় উপজাতির বদলে বলি আদিবাসী, নিগ্রো শব্দের বদলে বলি আফ্রিকান আমেরিকান। সভ্য সমাজে অফিস আদালতে কাজ যারা করেন তারা সচেতন থাকেন আরও একধাপ বেশি লক্ষ রাখেন কারো ধর্ম, বর্ণ, জেন্ডার কিংবা বয়স নিয়ে কোনোক্রমেই যেন বক্রোক্তি যেন প্রকাশিত না হয়ে যায়। আমরা আজ সমবেতভাবে গ্লোবাল ওয়ার্মিং নিয়ে দুশ্চিন্তা করি, বিলুপ্তপ্রায় পান্ডা কিংবা মেরু ভল্লুকদের রক্ষার ব্যাপারে আমাদের মন কেঁদে উঠে অহর্নিশি। অথচ এই ষোড়শ শতকে আমাদের মহা শান্তিপ্রিয়’ পূর্বপুরুষেরাই প্যারিসের রাস্তায় জীবন্ত বিড়াল দড়িতে ঝুলিয়ে দিত, তারপর তাতে তেল ঢেলে আগুন ধরিয়ে দিত। সেই জীবন্ত বিড়াল যখন আগুনে পুড়ে ব্যথায় কোঁকাতে থাকত, সেটা ছিল তাদের বিনোদনের উৎস। বিড়ালের চারপাশে সমবেত জনতা হাততালি দিয়ে চিৎকার করে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করত। তাদের চোখের সামনে। অসহায় বিড়ালটি একদল পাষণ্ড লোকের বিনোদনের খোড়াক যোগাতে পুড়ে অঙ্গার হয়ে যেতো[১৯৫]।
