আবার ছেলেরা গড়পড়তা যে সব ক্ষেত্রে মেয়েদের চেয়ে দুর্বল–বিশেষত সামাজিক যোগাযোগের ক্ষেত্রে কিংবা সহমর্মিতা আর সহযোগিতার ক্ষেত্রগুলোতে সম্মিলিত চর্চার মাধযমে সেগুলোর অব্যাহতভাবে উন্নতি করা সম্ভব হয়েছে অনেক ছেলেরই। কাজেই উপযুক্ত পরিবেশ পেলে এবং সঠিক প্রচেষ্টা থাকলে নারী পুরুষ সবার পক্ষেই কাঙ্ক্ষিত ফলাফল অর্জন সম্ভব। পাথরের গায়ে কখনোই খোদাই করে লেখা নেই নারীরা ‘ইহা পারিবে’, আর পুরুষেরা ‘উহা’। বরং অভিন্ন মানববৈশিষ্টের বহু কিছুই আমরা নারী পুরুষ নির্বিশেষে আমাদের মধ্যে ধারণ করি, এবং নিজ নিজ পছন্দ, অভিরুচি এবং আগ্রহকে প্রাধান্য দিয়ে সেগুলোর পরিস্ফুটন ঘটাই।
চিত্র। পেজ ১৬৭
চিত্র : ছেলেরা গড়পড়তা যে সব ক্ষেত্রে মেয়েদের চেয়ে দুর্বল বলে চিহ্নিত– বিশেষতঃ সামাজিক যোগাযোগের ক্ষেত্রে কিংবা সমবেদনা বা সহমর্মিতা প্রদর্শন কিংবা সহযোগিতার ক্ষেত্রগুলোতে– সম্মিলিত চর্চার মাধ্যমে সেগুলোর অব্যাহতভাবে উন্নতি করা সম্ভব হয়েছে অনেক ক্ষেত্রেই। যেমন, ছেলেদের তার বোন, সাথী কিংবা সমরূপ কারো সাথে ছোটবেলা থেকেই পুতুল খেলার সাথে পরিচয় করিয়ে দিয়ে দেখা গেছে, তাদের মধ্যে সামাজিক যোগাযোগের এবং পরিচর্যামূলক দক্ষতাগুলো বাড়িয়ে নেওয়া সম্ভব হয়েছে যথেষ্ট পরিমাণেই।
এই জায়গায় আমার মতে, নারীদের নিয়ে একটু বেশি বলা দরকার, যেহেতু সামাজিক স্টেরিওটাইপিং এর ব্যাপারগুলো মূলত নারীদের ঘিরেই, এবং সেগুলো নারীদের অবদমনের কাজেই বেশি ব্যবহৃত হয়। একটা সময় ছিল যখন নারীদের পুরুষের সমকক্ষ হওয়া তো দুরের কথা মানুষ হিসেবেই গণ্য করা হতো না। অথচ উন্নত বিশ্বের দিকে তাকালে আজ দেখা যাবে, নারীরা জ্ঞান বিজ্ঞানের প্রতিটি ক্ষেত্রেই পুরুষদের সাথে পাল্লা দিয়ে অংশগ্রহণ করেছে। যেমন, সবচেয়ে দুর্গম, এবং মেধাশীল ক্ষেত্র বলে চিহ্নিত মহাকাশযাত্রায় নারীদের অবদানের কথাই বলা যাক। সোভিয়েত নারী ভ্যালেন্টিনা তেরেস্কোভা ছিলেন প্রথম মহাকাশ বিজয়ী নারী, এ কথা আমরা সবাই জানি। কিন্তু অনেকেই হয়তো জানি না, বর্তমানে নাসার বহু। উল্লেখযোগ্য মহাকাশ মিশনের নেতৃত্ব দিচ্ছেন সুদক্ষ নারীরা। যেমন, আইলিন কলিনস ১৯৯৯ সালের স্পেস শাটলের প্রথম মহিলা কমান্ডার হিসেবে কলাম্বিয়া মিশনের সময় নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। এর আগে তিনি মার্কিন বিমান বাহিনির সি-১৪১ বিমানের প্রধানের দায়িত্বেও ছিলেন। ২০০৭ সালের স্পেস শাটল ডিস্কভারি এবং আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনের মিলনের সময় উভয়েরই প্রধান ছিলেন নারী। ডিস্কভারির নেতৃত্বে ছিলেন পামেলা মেলরয় আর আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনের দায়িত্বে ছিলেন পেগি হুইটুন। নাসায় কর্মরত ভারতীয় উপমহাদেশের প্রয়াত ড, কল্পনা চাওলাও কলম্বিয়া মিশনে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত মহাকাশচারণায় যথেস্ট কৃতিত্ব দেখিয়েছিলেন; এরোস্পেস ইঞ্জিনিয়ারিং এ পিএইচডি ডিগ্রি ছিল তার। আরেকজন পিএইচডি ডিগ্রিধারী মার্কিন নভোচারী শ্যানন লুসিড একসময় মহাকাশে দীর্ঘতম সময় কাটানোর রেকর্ড সৃস্টি করেছিলেন। এ ছাড়া ড, স্যালী রাইডের কথাও অনেকে জানেন যিনি স্পেস শাটলের প্রথম মহিলা সদস্য হন ১৯৮৩ এ। মহাকাশ জয়ে এখনও অবদান রাখতে না পারলেও বাঙালি মেয়েরা পিছিয়ে নেই যাত্রীবাহী বিমান চালনায়। যেমন, বাংলাদেশ বিমানের ইয়াসমিন রহমান এশিয়ার প্রথম মহিলা ডিসি-১০ বিমানের ক্যাপ্টেন হবার গৌরব অর্জন করেন ১৯৯১ তে। ডিসি-১০ বিমানের ক্যাপ্টেন হয়ে পাঁচ বছর বিমান চালাবার পর রাজনৈতিক কারণে তাকে অবসর গ্রহণে বাধ্য করা হয়েছিল। কিন্তু তারপরেও ইয়াসমিন রহমানের অগ্রযাত্রা থেমে থাকেনি। স্থাপত্যবিজ্ঞানে ডিগ্রি নিয়ে পাঁচ বছর স্থপতির পেশায় নিয়োজিত থেকে আবার সাফল্যের সাথে পরীক্ষা দিয়ে সক্রিয় বিমান চালনায় প্রত্যাবর্তন করে বিমানের এয়ারবাস এর ক্যাপ্টেন হন ২০০১ সালে। নারীদের জন্য তিনি এক উজ্জীবিত উদাহরণ। পাশাপাশি বাংলাদেশের সুলেখক এবং গবেষক সেলিনা হোসেনের কন্যা ফারিয়া লারার কথাও আমরা জানি, যিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগে স্নাতক হওয়ার পাশাপাশি ছিলেন একজন সফল পাইলট। ১৯৯৬ সালে সিভিল এভিয়েশন অথরিটি অফ বাংলাদেশের কাছ থেকে তিনি প্রাইভেট পাইলটের লাইসেন্স অর্জন করেন। এর দু’বছর পরে ১৯৯৮ সালের ১৯ শে মার্চ লারা বাণিজ্যিক পাইলট হওয়ার লাইসেন্স পান। তিনি এরপরই পাইলটদের প্রশিক্ষক হবার প্রশিক্ষণ দেন। তিনি বাংলাদেশের প্রথম নারী যিনি এই পেশায় আসেন। ১৯৯৮ সালের ২৯শে সেপ্টেম্বর একটি বিমান দুর্ঘটনায় মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি সেই পেশায় নিয়োজিত ছিলেন। দুর্ঘটনায় অকাল মৃত্যু না হলে তিনিই হতেন বাংলাদেশের প্রথম নারী পাইলট প্রশিক্ষক।
মুক্তমনা সদস্য অপার্থিব ‘আন্তর্জাতিক নারী দিবস: নারীরা সব পারে’ নামের একটি প্রবন্ধে বাংলাদেশের পাপিয়া নামের এক সাহসী মেয়ের উদাহরণ নিয়ে এসেছিলেন[১৮৮]। ১৯৯৮ সালের দিকে পাপিয়া জীবিকার তাগিদে ঢাকার রাস্তায় রিকশা চালাতে শুরু করে ইতিহাস সুস্টি করেছিলেন। পাপিয়া তার রিক্সায় বাহক নারী নাকি পুরুষ তা বিচার না করে সবাইকে বহন করতেন। কিন্তু দুঃখের বিষয় সেটাই বোধহয় প্রথম আর শেষ উদাহরণ। বাংলাদেশের সামাজিক বাস্তবতা এখনও এরকম দুঃসাহসিক কাজে মেয়েদের গ্রহণ করতে প্রস্তুত নয়। সামাজিক বাস্তবতার জন্য মেয়েরা বাসের ড্রাইভার বা কন্ডাক্টরও হয়তো হতে পারবেন না ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও, যদিও ট্রাফিক ও যাত্রীসংখ্যার দিক দিয়ে সিঙ্গাপুর, ব্যাংকক আর ঢাকার মধ্যে খুব একটা পার্থক্য নেই তবু সিঙ্গাপুর শহরে কিংবা ব্যাংককে মেয়ে বাসকন্ডাক্টর এক অতি পরিচিত দৃশ্য। আমি নিজেই দীর্ঘদিন সিঙ্গাপুরে থেকেছি। বহুবারই বিশ্ববিদ্যালয়ে যাওয়ার পথে এমন বাসে আমার উঠতে হয়েছে যেখানকার চালক পুরুষ নন, নারী। শুধু বাসের চালক বা কন্ডাক্টর হওয়া নয়, রাস্তায় রাস্তায় ফটোকপি মেশিন চালনা, মাল পরবহন, মালামালের ক্রয়বিক্রয় সহ সব ধরনের মানসিক এবং শারীরিক শ্রমসাধ্য কাজে পুরুষের পাশাপাশি নারীরা অংশগ্রহণ করেছে সমান তালে।
