বিবর্তন মনোবিজ্ঞানী জিওফ্রি মিলার মনে করেন, আমাদের এই শৈল্পিক রুচিবোধগুলো কোনো অদৃশ্য সৃষ্টিকর্তার সুনিপুণ ডিজাইনের মাধ্যমে যেমন হয়নি, ঠিক তেমনি পুরোটুকু তৈরি হয়নি অন্ধ এবং নির্বিচারী এবং প্রাকৃতিক নির্বাচনের মাধ্যমেও। বরং আমাদের মানসপটের বিবর্তন হয়েছে আমাদের পূর্বপুরুষদের দীর্ঘদিনের চাহিদাকে মূল্য দিয়ে, তাদের বুদ্ধিবৃত্তির উপর ভর করে এবং তাদের সতর্ক সঙ্গী নির্বাচনের মাধ্যমে। আমরা তাদের কাছ থেকে উত্তরাধিকার সূত্রে অর্জন করেছি তাদের নানারকম পছন্দ-উদ্যম, সৃজনশীলতা, কৌতুকপ্রিয়তা, বুদ্ধিমত্তা এবং শিল্পবোধসহ বিভিন্ন নৈর্ব্যক্তিক বিষয়ের প্রতি আকর্ষণ। তারা সঙ্গী নির্বাচনের সময় সচেতনভাবেই গুরুত্ব দিয়েছে কিছু বৈশিষ্ট্যের প্রতি, সে সমস্ত বৈশিষ্ট্য গুলো সংরক্ষিত থেকেছে আমাদের জনপুঞ্জে। সে সমস্ত বৈশিষ্ট্য কারো মধ্যে খুঁজে পেলে আমাদের মস্তিষ্ক স্বভাবতই আমোদিত হয়, প্রলুব্ধ হয় ঠিক যেমন ময়ূরী প্রলুব্ধ হয় দীর্ঘ পেখমওয়ালা ময়ূরকে খুঁজে পেলে। আমরা মূলত আমাদের পূর্বপুরুষদের লক্ষ বছরের বংশগতীয় পরীক্ষানিরীক্ষার সফল পরিণতি।
.
নারী পুরুষ শেষ পর্যন্ত অভিন্ন মানব সত্তারই অংশ
পুরো অধ্যায়টিতে মূলত জৈববৈজ্ঞানিক দৃষ্টিকোণ থেকে নারী পুরুষের পার্থক্য উল্লেখ করা হলেও এটা মনে রাখতে হবে যে, নারী পুরুষ কোনো আলাদা প্রজাতির জীব নয়, নয় কোনো ভিন্ন ভুবনের দুই বাসিন্দা, বরং তারা শেষ পর্যন্ত তারা অভিন্ন মানবপ্রকৃতিরই অংশ। হ্যাঁ নারীপুরুষের মধ্যে শারীরবৃত্তীয় দিক থেকে এবং আচরণগত বিভিন্ন দিক থেকে পার্থক্য আছেই, সেটার কারণ বহুবিধ। বিবর্তন মনোবিজ্ঞানীদের মতে, নারী এবং পুরুষকে বিবর্তনের যাত্রাপথে ভিন্ন ধরনের অভিযোজনগত সমস্যা মোকাবেলা করতে হয়েছে, তারা ভিন্ন ভিন্ন ভাবে সমস্যাগুলোর সমাধান করেছে, যেগুলোর প্রকাশ আজও তাদের মানসপটে রয়ে গিয়েছে। যেমন, গর্ভধারণ, শিশুকে স্তন্যপান করানো সহ বহুকিছুর অভিযোজনগত সমাধান জৈবিকভাবে করতে হয়েছে কেবলমাত্র নারীকেই। আবার অন্য দিকে অনাগত সন্তানের পিতৃত্বের নিশ্চয়তার সংশয় সংক্রান্ত ঈর্ষা নিয়ে জুঝতে হয়েছে মূলত পুরুষকেই, নারীকে নয়। এগুলোর পার্থক্য সূচক প্রভাব নারী পুরুষের শরীরে এবং মনোজগতে পড়বে এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু সেটাই শেষ কথা নয়।
বিভিন্ন সমস্যা নারী পুরুষ যেমন ভিন্নভাবে যেমন সমাধান করেছে, তেমনি আবার অতীতের পৃথিবীতে বহু অভিযোজনগত সমস্যাই ছিল যেগুলো আবার তারা সমাধান করেছে প্রায় একই রকমভাবে, একই পদ্ধতিতেই। যেমন, নারী পুরুষ উভয়েরই দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্কের জন্য সঠিক সঙ্গী খুঁজে নিতে হয়েছে, তাদেরকে বুঝতে হয়েছে তার সঙ্গী তাদের সম্পর্কের ব্যাপারে বিশ্বস্ত থাকবে কিনা, সন্তানকে বড় করলে তুলার ব্যাপারে শতভাগ নিয়োজিত থাকবে কি না ইত্যাদি। ভালোবাসা, সম্পর্কের স্থায়িত্ব, সুস্থ জীবনযাপনের আকাঙ্ক্ষা, নিজেদের সুখ স্বাচ্ছন্দ বৃদ্ধি প্রভৃতি বহু ব্যাপারে নারীপুরুষের চাহিদাগুলো নির্বিশেষে একইরকমই হয়[১৮২]। নারী পুরুষ উভয়েই চায় নিজেরা সুখী হতে, নিজেদের সন্তানদের প্রতিষ্ঠিত এবং সুখী দেখে যেতে। আত্মীয়স্বজন, বন্ধুবান্ধব, প্রতিবেশীদের প্রতি ভালোবাসা, দায়িত্ব প্রভৃতির ব্যাপারে কারো অবদানই কম নয়। বিজ্ঞানী জেনেট শিবলী হাইড তার একটি গবেষণাপত্রে দেখিয়েছেন, নারীপুরুষের পার্থক্যসূচক অভিব্যক্তিগুলোর চেয়ে তাদের মধ্যে জেন্ডারগত সাম্যই বেশি পরিলক্ষিত হয়[১৮৩]। নারীবাদী বিজ্ঞানীরা দেখিয়েছেন যে, যৌনতার বৈচিত্র্য এবং শারীরিক আগ্রাসনসহ কিছু ক্ষেত্রে একটি নারীর সাথে একটি পুরুষের পার্থক্য রয়েছে সত্য[১৮৪], কিন্তু সেটা জেন্ডারগত সাম্যকে লঙ্ঘন করে না, বরং আন্তঃযৌনতা প্রতিযোগিতা (intrasexual competition) দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায়[১৮৫]। রোজালিন ফ্র্যাঙ্কলিন বিশ্ববিদ্যালয়ের (শিকাগো মেডিকাল স্কুল) বিজ্ঞানী লিসি এলিয়ট তার গবেষণায় দেখিয়েছেন, নারী পুরুষের মধ্যে শারীরিক এবং জৈবিক দিক থেকে পার্থক্য আছে, কিন্তু সেই পার্থক্যগুলো এমন কিছু বড় নয়। বহুক্ষেত্রেই ছেলেদের বাচনক্ষমতা, সহমর্মিতা যেমন চেষ্টা করলে বাড়ানো যায়, ঠিক তেমনি আবার মেয়েদের গাণিতিক কিংবা ত্রিমাত্রিক প্রক্ষেপণের ক্ষমতাগুলোও বাড়িয়ে নেওয়া যেতে পারে[১৮৬]। যেমন, দেখা গেছে, গণিত বা বিজ্ঞানের বিষয়গুলোতে চেষ্টা করলে নারীরা শুধু পুরুষদের সমান নয়, এমনকি ছাড়িয়েও যেতে পারে। আসলে জগতের বহু বিষয় যেগুলো একসময় কেবল ‘পুরুষদের এলাকা’ বলে চিহ্নিত করা হতো, সেগুলোতে নারীরা কেবল পদার্পণই করেনি, ছাড়িয়েও গিয়েছে। যেমন, সারা পৃথিবীতে গণিতকে ঢালাওভাবে পুরুষদের আধিপত্যময় বিষয় বলে বিবেচনা করা হলেও দেখা গেছে আইসল্যান্ডে মেয়েরা গড়পড়তা ছেলেদের চেয়ে অনেক ভালো ফলাফল করেছে[১৮৭]।
চিত্র। পেজ ১৬৬
চিত্র :গণিত এবং বিজ্ঞানে পুরুষদের তুলনায় নারীদের অনাগ্রহ এবং অসফলতার কথা ঢালাওভাবে মিডিয়ায় বলা হলেও আইসল্যান্ডে গণিতে গড়পড়তা নারীরাই পুরুষদের চেয়ে অনেক ভালো ফলাফল করছে।
