অবশ্য সেক্স ম্যানিয়্যাক জীব কেবল ইসলামেই আছে তা মনে করলে বেজায় ভুল হবে। সব ধর্মেই সেটা কমে বেশি আছে বলাই বাহুল্য। ভারতে পরলোকগত সাইবাবার সেক্স স্ক্যান্ডাল পত্রপত্রিকায় এসেছে। “ভগবান রজনীশের’ যৌনউন্মত্ততার কথাও সর্বজনবিদিত ছিল। চার্চের বিভিন্ন পাদ্রী প্রায়ই শিশু যৌন নিপীড়ন এবং ব্যভিচারের কারণে নিত্যদিনই পত্রপত্রিকার শিরোনাম হন, তা তো আমরা এখনও হর-হামেশাই দেখছি। আসলে যেখানেই মাত্রাতিরিক্ত বাধার প্রাচীর তুলে দিয়ে যৌনতাকে নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করা হয়েছে, সেখানেই তৈরি হয়েছে নানা ধরনের আসক্তি এবং আস্ফালন। আমরা অবশ্য মনে করি যৌনতা বিবর্তনেরই ফসল। যৌনতাকে পাপ, ব্যভিচার, পশ্চিমের বেলাল্লাপনা বলে কৃত্রিম উপায়ে যে নিয়ন্ত্রণ করা যায় না, যায় না দমন করা কেবল হিজাব কিংবা বুরকার বুলি কপচিয়ে, সেটা মরহুম ওসামা বিন লাদেন লুকিয়ে লুকিয়ে পর্নো দেখে এবং অন্যান্য (অ)কাজ কুকাজের মাধ্যমে বিবর্তন মনোবিজ্ঞানের সত্যতাই পুনর্বার প্রমাণ করে দিলেন, নয় কি?
.
আমাদের সৌন্দর্যবোধ আর শিল্পবোধগুলো তৈরি হয়েছে বিবর্তনের পথ ধরে
সুদক্ষ শিল্পীর নয়নাভিরাম শিল্পকর্ম কে না ভালোবাসে! পিকাসোর গুয়েরনিকা, অগস্ত রদ্যার ‘থিঙ্কার কিংবা মাইকেলএঞ্জেলোর ‘ডেভিড’ দেখে আমরা মুগ্ধ হই, ঠিক তেমনি আমরা উদ্বেলিত হই শামীম শিকদারের ‘স্বোপার্জিত স্বাধীনতার পাশে দাঁড়িয়ে, কিংবা নিতুন কুণ্ডুর ‘সাবাস বাংলাদেশ প্রত্যক্ষ করে। কিন্তু কেন আমাদের ভাস্কর্য দেখতে ভালো লাগে? কখনো কি আমরা ভেবেছি কেন ভাস্করদের নিপুণ কাজ আমাদের মনোমুগ্ধকর বলে মনে হয়, তাদের ব্যক্তিত্বকে কাঙ্ক্ষিত মনে হয়? অনেক বিবর্তন মনোবিজ্ঞানীই মনে করছেন ব্যাপারটির উৎস আসলে বিবর্তনমনোসঞ্জাত। আমাদের পূর্বপুরুষেরাও এমনিভাবে পাথুরে হাতিয়ার, প্রবালের নেকলেস প্রভৃতি বানিয়ে জয় করতে পেরেছিল বিপরীত লিঙ্গের আকর্ষণ, জাগাতে পেরেছিল অন্যদের চিত্তচাঞ্চল্য। প্রায় দের মিলিয়ন বছর আগে হোমো ইরেক্টাসরা শুরু করেছিল পাতলা পাথরের ফালি বানানো। এগুলো দেখতে ডিম্বাকৃতির, কখনোবা ত্রিভুজাকৃতির পাতার মতোন বা ‘টিয়ার ড্রপ’ আকারের[১৭৯]। এশিয়া, ইউরোপ এবং আফ্রিকাসহ পৃথিবীর যেখানেই হোমো ইরেক্টাস আর হোমো ইরগাস্টারদের যাতায়াত ছিল, সেখানেই পাওয়া গেছে হাজার হাজার একুলিয়ান হ্যান্ড অ্যাক্স। সবচেয়ে পুরনো ‘অ্যাকুলিয়ান হ্যান্ড অ্যাক্স’-এর অস্তিত্ব পাওয়া গেছে ১.৮ মিলিয়ন বছর আগেকার।
এ প্রাচীন হাতিয়ারগুলোই আমাদের মানবেতিহাসের সবচেয়ে পুরনো শিল্প। ব্যবহারিক অস্ত্রের এই বিমুগ্ধকর নান্দনিক রূপান্তর প্রাগৈতিহাসিক মানুষের কারিগরি দক্ষতা তুলে ধরে। ডারউইনীয় দৃষ্টিকোণ থেকে ‘হ্যান্ড এ্যাক্স’ সভ্যতার নতুন এক ধাপের প্রতীক। দেখে মনে হয় এই হাতিয়ারগুলো তৈরিই হয়েছে একধরনের প্রচ্ছন্ন ‘ফিটনেস সিগন্যাল দেয়ার জন্য, যে সিগন্যালের মধ্যে প্রকাশ পায় নির্মাতার বুদ্ধি, কর্মনিপুণতা, সচেতনতা, ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা এবং দূরদর্শিতা। অনেকটা পেখমওয়ালা ময়ূরের মতোই অস্ত্র বানানোয় দক্ষ পুরুষ আকর্ষণ করতে পেরেছিল আদিম সমাজে নারীদের অনুগ্রহ। আমাদের পূর্বপুরুষদের মধ্যে যাদের এ গুণগুলো ছিল তারা আকর্ষণ করেছিল অধিকমাত্রায় বিপরীত লিঙ্গের সান্নিধ্য, তারাই রেখে গেছে অধিক হারে উত্তরসূরী। যারা এই কারিগরিবিদ্যা রপ্ত করতে পারেনি, তারা বিপরীত লিঙ্গের চোখে আকর্ষণীয় হয়ে উঠেনি, তারা প্রজননগতভাবে সফল ছিল না।
চিত্র। পেজ ১৬৩
চিত্রঃ ব্রিটিশ মিউজিয়ামে রক্ষিত তাঞ্জিনিয়ার ওল্ডুভাই গর্জে পাওয়া প্রাচীন অ্যাকুলিয়ান হ্যান্ড অ্যাক্স।
নিউজিল্যান্ডের কেন্টারবেরি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ডেনিস ডাটন (৯ ফেব্রুয়ারি ১৯৪৪-২৮ ডিসেম্বর, ২০১০) একটি বই লিখেছেন ডারউইনীয় দৃষ্টিকোণ থেকে আমাদের সৌন্দর্যপ্রিয়তা এবং শিল্পের প্রতি অনুরাগ বিশ্লেষণ করে[১৮০]। তার একটি চমৎকার লেকচার আছে টেড ডট কম সাইটে এবং ইউটিউবে[১৮১]। তিনি মনে করেন, শিল্প বিষয়ক যে কোনো আধুনিক রুচি সেটা যে কোনো শিল্প মাধ্যমই হোক না কেন, উদ্ভূত হয়েছে বিবর্তনের ক্রমপ্রক্রিয়ায়, ডারউইনের তত্ত্ব দিয়ে যাকে সফলভাবে ব্যাখ্যা করা সম্ভব। একটু খেয়াল করলেই দেখা যাবে পূর্বপুরুষদের চোখে পাথুরে হাতিয়ার তৈরির মতো দক্ষতাগুলো যেমন আকর্ষণীয় হয়ে ধরা দিয়েছিল, সেই একই ধরনের ভালোলাগাগুলো এখনও আমাদের মনে কাজ করে যায় প্রায় একইরকমভাবে। নিপুণ কারিগরি দক্ষতায় সম্পন্ন যে কোনো কাজ বা শিল্প দেখলে আমাদের মন এখনও প্রফুল্ল হয়ে ওঠে, আমরা সেই শিল্পকর্মের প্রতি আকৃষ্ট হই অবচেতনভাবেই। কোনো গয়নার দোকানে টিয়ার ড্রপ আকারের কোনো হীরার অলংকার দেখলে আমাদের মন উদ্বেলিত হয়ে উঠে। এমন মনে করার কারণ নেই যে আমাদের সংস্কৃতিই হঠাৎ করে শিখিয়েছে এগুলোকে সুন্দর ভাবতে। বরং আমাদের সুদূর পূর্বপুরুষরাও ভালোবাসতো এই ধরনের শৈল্পিক আকৃতিগুলো, আর কদর করত এর নির্মাণের পেছনের কর্মকুশলতা আর দক্ষতাকে। আমাদের আধুনিক রুচিবোধগুলো মূলত তৈরি হয়েছে সেই প্লেইস্টোসিন যুগের আদিম পছন্দ অপছন্দগুলোর উপর ভর করেই। বিজ্ঞানীরা বলেন, শিল্প, সাহিত্য, ভাস্কর্য, খেলাধুলা প্রভৃতির প্রতি অনুরাগগুলো তৈরি হয়েছে লৈঙ্গিক আবেদনের মাধ্যমে যৌনতার নির্বাচনের পথ ধরে। প্রাকৃতিক নির্বাচন গড়ে উঠেছে মূলত বেঁচে থাকার প্রতিযোগিতার মাধ্যমে, আর অন্যদিকে যৌনতার নির্বাচন কাজ করেছে প্রজননগত প্রতিযোগিতার মাধ্যমে।
