কিন্তু তার মৃত্যুর পর যে খবরটি মিডিয়ায় এল তা আরও চাঞ্চল্যকর। ওসামা বিন লাদেনকে হত্যার পর ওসামার বাড়ি থেকে জব্দ কম্পিউটার থেকে পাওয়া গেল পর্নোগ্রাফির হরেক রকম কালেকশন। যে বিন লাদেন মেয়েদের সম্মান করে শরিয়া মোতাবেক চলাফেরা, হিজাব পরা, পর্দানসীন থাকাকে পশ্চিমা ধাচের অশালীন চলাফেরার চেয়ে অনেক উৎকৃষ্ট বলে মনে করতেন, সেই লাদেন পশ্চিমা মেয়েদের পর্নোগ্রাফি তার কম্পিউটারে সংগ্রহ করে রাখতেন, এবং সম্ভবত উৎসাহের সাথে সেগুলো তারিয়ে তারিয়ে উপভোগ করতেন। এ খবরটি প্রকাশিত হয়েছে রয়টার, সিএনএন, ইয়াহু নিউজ, ফক্স নিউজ, এবিসি নিউজ, গার্ডিয়ান, হাফিংটন পোস্টসহ বহু নিউজ মিডিয়াতেই[১৭১]।
এর মানে হচ্ছে, মরহুম বিন লাদেন চমৎকার একটি ইসলামি জীবন অনুসরণ করেছেন। যেখানে তিনি তার বিপ্লবী আদর্শে বলিয়ান উম্মতদের আত্মঘাতী বোমা হামলায় প্ররোচিত করেছেন, নাইন-ইলেভেনের মতো আরও ঘটনা পুনর্বার। ঘটানোর ডাক দিয়েছেন, কাফির নাসারাদের সমূলে ধ্বংস করে ইসলামি সাম্যবাদের পতাকা তুলে ধরার হাঁকডাক পেরেছেন, সেখানে সেই বিপ্লবের অসংবাদিত নেতা লাদেন ইসলামাবাদের মাত্র ৬০ মেইল দূরে সামরিক বাহিনীর অভয়ারণ্য বলে খ্যাত এবোটাবাদের একটি দূর্গতুল্য প্রাসাদে তিন স্ত্রী এবং এগারোজন সন্তানসন্ততি নিয়ে নিরাপদে জীবনযাপন করতেন, কাফির নাসারাদের বানানো কোকা-কোলা / পেপসি চুক চুক করে পান করতেন, শখ করে দূর্গের বাইরে মারিজুয়ানা বা গঞ্জিকার বাগান করতেন, এবং গভীর রাতে কম্পিউটারে বসে বসে পর্নোগ্রাফি দেখতেন। চমৎকার একজন ইসলামি নেতার মতোই কাজ কারবার।
যদিও হলফ করে বলার উপায় নেই যে, বিন লাদেনই সেই পর্নোগুলো দেখতেন, কিন্তু তারপরেও যখন তার পার্সোনাল কম্পিউটারেই রকমারি ধরনের ঢালাও পর্নের সংগ্রহ আবিস্কৃত হয়েছে, এবং সেই কম্পিউটারটি সুরক্ষিত ছিল কেবল বিন লাদেনের নিত্যদিনের ব্যবহারের জন্যই, তখন মন থেকে জোরালো একটা সন্দেহের তীর প্রক্ষিপ্ত হয় বৈকি! যাহা হাঁসের মতো প্যাঁক প্যাঁক করে আর যার হাঁসের মতো পালক আছে তাহা শেষ পর্যন্ত হাঁসই।
[কেন পর্নোগ্রাফি বহু পুরুষদের উন্মাতাল করে? পর্নোগ্রাফি দেখা কোনো সত্যিকার যৌনসঙ্গম নয়, এটা সবাই জানে। তারপরেও পর্নোভিডিও কেন পুরুষদের উত্তেজিত করে, কামার্ত করে তুলে? বিবর্তনীয় মনোবিজ্ঞানে এর উত্তর পাওয়া গেছে। সাভানা অনুকল্পের কথা আমরা প্রথম অধ্যায়ে জেনেছি; যে কারণে আমরা তেল চর্বিযুক্ত খাবারের প্রতি লালায়িত হই, যে কারণে আমরা সাপ আর বিষধর কীটপতঙ্গ দেখলেই ভয় পাই, পর্নোগ্রাফির প্রতি বহু পুরুষদের আসক্তির কারণও মূলত একই জায়গায়। সাভানা অনুকল্প বলছে, আমরা আধুনিক জীবনযাত্রায় অভ্যস্ত হয়ে উঠলেও আমাদের মস্তিষ্ক রয়ে গেছে প্রস্তর যুগে আমাদের করোটির ভিতর বাস করে আদিম প্রস্তর যুগের মস্তিষ্ক। কারণ মানব মস্তিষ্কের মূল মডিউলগুলো তৈরি হয়ে গিয়েছিল আমরা যখন আফ্রিকার সাভানা তৃণভুমিতে শিকারি সংগ্রাহক হিসেবে জীবন। কাটাতাম। ভিডিও, সিনেমা, এগুলো আধুনিক কারিগরী উৎকর্ষময়তার অবদান, কিন্তু আমাদের মস্তিষ্ক আধুনিক জটিলতার মাঝে সময় অতিক্রম করলেও এর প্রকৃত বাস্তবতা থেকে অপার বাস্তবতাকে পৃথক করতে অনেক সময়ই থাকে অক্ষম। সেজন্যই গভীর রাতে ভূতের বই পড়লে বা সিনেমা দেখলে আমাদের অনেকেরই গা ছম ছম করে। যে কারণে ভূতের সিনেমা দেখে অনেকে ভয় পায়, একই কারণে পর্নোগ্রাফি দেখেও অনেকে উত্তেজিত হয়। মেয়েদের নগ্ন ছবি কিংবা পর্নোভিডিও দেখলে পুরুষদের মস্তিষ্ক বুঝে উঠতে পারে না যে, এগুলো সত্যি নয়–এগুলো আসলে কৃত্রিমভাবে তৈরি পণ্যমাত্র। এই অত্যাধুনিক পণ্যগুলোর কোনো অস্তিত্ব আমাদের পূর্বপুরুষদের সাভানা পরিবেশে ছিল না। তাদের কাছে সে সময় কোনো নগ্ন মেয়ের সাথে সঙ্গম কিংবা সঙ্গম করার জন্য উত্তেজক পরিস্থিতি তৈরি হওয়া সবসময়ই ছিল সে সময়ের প্রেক্ষাপটে প্রকৃত বাস্তবতার নিয়ামক। কাজেই আধুনিক মানুষ কম্পিউটারে বসে কোনো মেয়ের নগ্ন ছবি দেখলে কিংবা পর্নো ভিডিও দেখলে প্রস্তর যুগে তৈরি পুরুষের মস্তিষ্ক অনুধাবন করতে পারে না যে উপকরণগুলো আসলে কৃত্রিম,বরং মস্তিষ্কে সেই সমস্ত সঙ্কেতই পাওয়া যায় যার মাধ্যমে মনে হয় সত্যি সত্যিই ওই মেয়েদের সাথে যৌনসঙ্গমের একটা সুযোগ তৈরি হয়েছে। এ সময় পুরুষদের জননেন্দ্রিয় শক্ত হয়ে যায়, রক্তচাপ বেড়ে যায়, তাদের দৃষ্টি ফোকাস হয়ে উঠে ভিডিওতে দেখা মেয়ের দেহের বিবিধ যৌনাঙ্গে। ঠিক এগুলোই ঠিক একইভাবে ঘটে সত্যিকার এবং সফল যৌনসঙ্গমের প্রাক্কালে। মস্তিষ্ক যদি বুঝতে পারত ভিডিওতে দেখা কিংবা কম্পিউটারে ব্রাউজ করা মেয়েগুলো ভার্চুয়াল, তাদের সাথে সত্যিকার সঙ্গম করা সম্ভব হবে না, তাহলে সে দৃশ্যগুলো দেখে পুরুষাঙ্গ কখনই সঙ্গমের জন্য উখিত হতে শুরু করত না। কিন্তু মানব মস্তিষ্ক সেটা অনুধাবন করতে পারে না বলেই পর্নোগ্রাফি দেখলে পুরুষেরা উত্তেজিত হয়ে উঠে।
সাভানা অনুকল্পের ব্যাপারটা একইভাবে নারী মস্তিষ্কের জন্যও প্রযোজ্য। নারীদের জন্য পর্নোগ্রাফির আবেদন ভিন্নভাবে তৈরি হয়েছে বিবর্তনের যাত্রাপথে। বিবর্তনীয় পথপরিক্রমায় পুরুষদের মতো ঘন ঘন সঙ্গী বদল মেয়েদের জন্য কোনো প্রজননগত সফলতা নিয়ে আসেনি। নারীরা যৌনসঙ্গী নির্বাচনের ব্যাপারে থাকে অপেক্ষাকৃত খুঁতখুঁতে, ফলে স্বভাবগতভাবেই নারীরা অসতর্ক সঙ্গমে (casual sex) পুরুষদের মতো প্রলুব্ধ হয় না। কারণ, এ ধরনের অসতর্ক সঙ্গমে অনাকাঙ্ক্ষিত গর্ভকালীন ঝামেলা পোহাতে হয়েছে নারীকেই। গবেষণায় দেখা গেছে, গড়পড়তা একটি পুরুষ কোনো নারীর সাথে পরিচয়ের এক সপ্তাহের মাথায় যৌনসঙ্গমে ইচ্ছুক হয়, সেখানে একটি নারী যৌনসম্ভোগের জন্য অপেক্ষা করতে চায় ছয় মাস[১৭২]। ঠিক যে কারণে পুরুষের প্রস্তর যুগের মস্তিষ্ক পর্নো ভিডিও দর্শনে উত্তেজিত হয়ে ওঠে, ঠিক একই কারণে মেয়েরা হয়ে পড়ে এ ব্যাপারে সতর্ক। মেয়েদের প্রস্তর যুগের মস্তিষ্ক ভুল সঙ্কেত পাঠাতে থাকে যে, এই পর্নোগ্রাফির ফলশ্রুতিতে তারা গর্ভবতী হয়ে যেতে পারে। তাই অধিকাংশ মেয়েই পর্নোগ্রাফির প্রতি নিস্পৃহ কিংবা নিরাসক্ত থাকে, এদের মধ্যে অনেকেই দারুণভাবে বীতশ্রদ্ধও। বিবর্তনীয় যাত্রাপথে নারী পুরুষের যৌনতার ভিন্ন স্ট্র্যাটিজির কারণেই পর্নোগ্রাফির প্রতি ভিন্ন আবেদন দেখা যায়।]
