আরও কিছু আনুষঙ্গিক মজার বিষয় আলোচনায় আনা যাক। পশ্চিমা বিশ্বে এক সময় ‘প্লেবয়’-এর পাশাপাশি একসময় ‘প্লে গার্ল’ এবং ‘ভিভা’ চালানোর চেষ্টা করা হয়েছিল। চলেনি। মেয়েরা এ ধরনের পত্রিকা কেনেনি, বরং কিনেছে সমকামী পুরুষেরা ঢের বেশি। ছেলেদের প্রেম অধিকাংশ ক্ষেত্রেই খুব যান্ত্রিক। পর্নোগ্রাফি সেজন্যই ছেলেদেরকেই বেশি আকর্ষণ করে। আরও একটি প্রাসঙ্গিক উদাহরণ দেয়া যেতে পারে। ভায়াগ্রা পুরুষের জন্য কাজ করলেও মেয়েদের জন্য করে না। ভায়াগ্রা কাজ করে খুব সাধারণ একটি পদ্ধতিতে। পুরুষাঙ্গে রক্তপ্রবাহ বাড়িয়ে দিয়ে। ঠিক একই পদ্ধতিতে ক্লায়টোরিসে রক্তপ্রবাহ বাড়িয়ে দিয়ে মেয়েদের জন্য ‘পিঙ্ক ভায়াগ্রা’ তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল, সফল হয়নি। একটি বড় কারণ মেয়েদের প্রেম এত যান্ত্রিক নয়, তাদের প্রেম অনেক বর্ণময়, অনেক ধরনের আবেগের সুগ্রন্থিত মিশ্রণ। তাই ছেলেদের ভায়াগ্রার মতো মেয়েদের জন্য ভায়াগ্রা তৈরি করতে গিয়ে বড় বড় কারখানাগুলো চুল ছিঁড়ে ফেলছে কিন্তু পণ্ডশ্রমই সার হয়েছে, সফলতা আসেনি। এদিকে ছেলেরা শুধু কেন বল খেলবে আর মেয়েরা পুতুল–এই শিকল ভাঙার অভিপ্রায়ে ভিন্ন ধরনের খেলনা প্রবর্তনের চেষ্টা হয়েছিল–চলেনি। কারণ কী? কারণ হচ্ছে, আমরা যত আড়াল করার চেষ্টাই করি না কেন, ছেলেমেয়েদের মানসিকতায় পার্থক্য আছে আর সেটা দীর্ঘদিনের বিবর্তনীয় ছাপ থাকার কারণেই। এই ব্যাপারটিই প্রকাশিত হয়েছে ব্রিটিশ পত্রিকা ইন্ডিপেন্ডেন্টে এক মায়ের আর্তিতে। সেই মা পত্রিকায় (নভেম্বর ২, ১৯৯২) তার অভিজ্ঞতা থেকে লিখেছেন–
আমার খুব জানতে ইচ্ছে করে আপনার পত্রিকার বিজ্ঞ পাঠকেরা কী বলতে পারবেন কেন একই রকমভাবে বড় করা সত্ত্বেও যতই সময় গড়াচ্ছে আমার দুই জমজ বাচ্চাদের মধ্যকার নারী-পুরুষজনিত পার্থক্যগুলো প্রকট হয়ে উঠছে? কার্পেটের উপর যখন তাদের খেলনাগুলো একসাথে মিলিয়ে মিশিয়ে ছড়িয়ে রাখা হয়, তখন দেখা যায় ছেলেটা ঠিকই ট্রাক বা বাস হাতে তুলে নিচ্ছে, আর মেয়েটা পুতুল বা টেডি বিয়ার।
শুধু মানব শিশু নয়, মানুষের কাছাকাছি প্রজাতি ‘ভার্ভেট মাঙ্কি’ নিয়ে গবেষণা করেও বিজ্ঞানীরা দেখেছেন তাদের হাতে যদি খেলনা তুলে দেয়া হয়, ছেলে বানরেরা ট্রাক বাস গাড়ি ঘোড়া নিয়ে বেশি সময় কাটায় আর মেয়ে বানরেরা পুতুল কোলে নিয়ে। মানবসমাজে দেখা গেছে খুব অল্প বয়সেই ছেলে আর মেয়েদের মধ্যে খেলনা নিয়ে এক ধরনের পছন্দ তৈরি হয়ে যায়, বাবা-মা’রা সেটা চাপিয়ে দিক বা না দিক। দোকানে নিয়ে গেলে ছেলেরা খেলনা-গাড়ি কিংবা বলের দিকে হাত বাড়াতে শুরু করে, আর মেয়েরা পুতুলের প্রতি। এই মানসিকতার পার্থক্যজনিত প্রভাব পড়েছে খেলনার প্রযুক্তি, বাজার এবং বিপণনে। যে কেউ টয়সেরাসের মতো দোকানে গেলেই ছেলেমেয়েদের জন্য খেলনার হরেক রকম সম্ভার দেখতে পাবেন। কিন্তু খেলনাগুলো দেখলেই বোঝা যাবে–এগুলো যেন দুই ভুবনের দুই বাসিন্দাদের চাহিদাকে মূল্য দিতে গিয়ে আলাদা আলাদা ভাবে বানানো।
চিত্র। পেজ ১৫৬
চিত্র— বিজ্ঞানীরা ছেলে ভার্ভেট মাঙ্কি নিয়ে গবেষণা করে দেখেছেন ছেলে এবং মেয়েদের মধ্যে খেলনার প্রতি পছন্দের প্রকৃতি ভিন্ন হয়, যা আমাদের মানবসমাজের ছেলেমেয়েদের খেলনা নিয়ে ‘স্টেরিওটাইপিং’-এর সাথে মিলে যায় (ছবি- সায়েন্টিফিক আমেরিকানের সৌজন্যে)
শুধু শিশু বয়সে নয়, পরিণত বয়সেও ছেলে মেয়েদের মধ্যকার মানসিকতার। প্রভেদমুলক পার্থক্য বজায় থাকে পুরোমাত্রায়। পুরুষদের একটা বড় অংশ অর্থ, প্রতিপত্তি এবং যৌনতার প্রতি যেভাবে লালায়িত হয়, মেয়েরা গড়পড়তা সেরকম হয় না। বিবর্তনীয় মনোবিজ্ঞান ছেলে মেয়েদের এই মানসিক পার্থক্যকে খুব সহজেই ব্যাখ্যা করতে পারে। ডকিন্সের ‘সেলফিশ জিন’ তত্ত্ব সঠিক হলে, আমাদের দেহ জীবনের উদ্দেশ্য খুঁজে নিতে চাইবে ‘জিন সঞ্চালনে’। পুরুষদের জন্য যেহেতু নয় মাস ধরে গর্ভধারণের ঝামেলা নেই, নেই অন্য আনুষঙ্গিক ঝামেলা মেয়েদের যেগুলো পোহাতে হয় গর্ভধারণের জন্য, সেহেতু তাদের মধ্যে একটা অংশ থাকেই যারা মনে করে যত বেশি জিন সঞ্চালন করা যাবে ততই বেশি থাকবে ভবিষ্যত প্রজন্ম বেঁচে থাকার সম্ভাবনা। তাই ইতিহাসে দেখা যাবে শক্তিশালী পুরুষেরা কিংবা গোত্ৰাধিপতিরা কিংবা রাজা বাদশাহরা হেরেম তৈরি করে সুন্দরী স্ত্রী আর উপপত্নী দিয়ে প্রাসাদ ভর্তি করে রাখত। পর্নোগ্রাফির প্রতি আকর্ষণ পুরুষদেরই বেশি থাকে কিংবা পতিতাপল্লীতে পুরুষেরাই যায় আদিম সেই উদগ্র ‘যৌনস্পৃহা মানসপটে রাজত্ব করার কারণেই।
.
পর্নোগ্রাফি থেকে মুক্ত নয় রক্ষণশীল জিহাদি (অবশ্যই পুরুষ) সৈনিকেরাও
২০১১ সালের মে মাস। আমি যখন বইয়ের এই অংশটুকু লিখছিলাম, তখন পাকিস্তানের এবোটাবাদে ঝটিকা আক্রমণ চালিয়ে ওসামা বিন লাদেনকে সবেমাত্র হত্যা করা হয়েছে। লাদেনকে হত্যার জন্য মার্কিন বাহিনী হঠাৎ করেই পাকিস্তানে অভিযান চালায়। লাদেন তখন ইসলামাবাদ থেকে ৩৫ মাইল দূরে এবোটাবাদ নামক একটি শহরের একটি তিন তলা বাড়িতে অবস্থান করছিল। হেলিকপ্টার দিয়ে পরিচালিত ওই অভিযানে লাদেন, লাদেনের একজন ছেলে এবং তার ২ জন। সহযোগীর মৃত্যু হয়।
