বিজ্ঞানীরা লক্ষ করেছেন যে, মস্তিষ্কের প্রকৃতি বদলে গেলে ভালোবাসার প্রকৃতিও বদলে যায়। এরকম একটি কেস স্টাডির কথা আমি সম্প্রতি পড়েছি পল ব্লুমের ‘হাও প্লেসার ওয়ার্ক্স’ বইয়ে। ১৯৩১ সালে নথিবদ্ধ এ ঘটনা থেকে জানা যায় এক মহিলা তার স্বামীকে নিয়ে অহরহ অভিযোগ করতেন–তার সঙ্গী মোটেই পরিশীলিত নয়, কেমন যেন অদক্ষ চাষাভূষা টাইপের। বরদাস্তই করতে পারতেন না তিনি স্বামীকে একেবারে। কিন্তু কিছুদিন পরে কোনো এক রোগে কিংবা দুর্ঘটনায় মহিলাটির মস্তিষ্কের বড় একটা অংশ আহত হয়। দুর্ঘটনার পর স্মৃতিশক্তি ফিরে পাওয়ার পর তার সঙ্গী সম্বন্ধে দৃষ্টিভঙ্গিই বদলে গিয়েছিল। যে লোকটাকে কিছুদিন আগেও অপরিশীলিত চাষাড়ে বলে মহিলার মনে হচ্ছিল, সেই সঙ্গী তার কাছে রাতারাতি আবির্ভূত হলেন “ধনবান, বুদ্ধিদীপ্ত, সুদর্শন এবং বর্ণাঢ্য ব্যক্তি হিসেবে। সত্যি বলতে কী যৌনাকর্ষণ এবং রোমান্টিক প্রেমের ব্যাপারগুলো রয়ে যায় মস্তিষ্কের খুব গভীরে, মনের গহীন কোণে। মস্তিষ্কের আঘাত সেই মহিলাটিকে সুযোগ করে দিয়েছিল একেবারে নতুনভাবে শুরু করতে, ফলে তার চিরচেনা সঙ্গী তার কাছে আবির্ভূত হয়েছিল একেবারে নতুন মানুষ হিসেবে, অনেক পছন্দনীয় হিসেবে। অর্থাৎ, মস্তিষ্কের প্রকৃতি বদলে যাওয়ায় মহিলাটির ভালোবাসার প্রকৃতিও বদলে গিয়েছিল।
‘A Midsummer Night’s Dream’ নাটিকায় শেক্সপিয়র উচ্চারণ করেছিলেন, ‘Love looks not with the eyes but with the mind’। শেক্সপিয়র মিথ্যে বলেননি। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথও তার একটি গানে যে কথাটি বলেছিলেন, ‘চোখের আলোয় দেখেছিলেম চোখের বাহিরে’; সেই কথাটিকেই সামান্য বদলে দিয়ে বিবর্তন মনোবিজ্ঞানের দৃষ্টিকোণ থেকে বললে বলা যায়–
চোখের আলোয় দেখেছিলেম মনের গভীরে।
অন্তরে আজ দেখব, যখন আলোক নাহি রে।
আশা করছি রবীন্দ্রনাথের গানে বিবর্তন মনোবিজ্ঞানের কাঁচি চালানোয় রবীন্দ্রভক্তরা মনঃক্ষুণ্ণ হয়ে যাবেন না। ভালোবাসার দাবি বলে কথা!
০৫. নারী ও পুরুষ : দুই ভুবনের দুই বাসিন্দা?
আধুনিক বিবর্তনীয় মনোবিজ্ঞানীরা আরও বলেন, ডারউইনের ‘সেক্সুয়াল সিলেকশন’ বা ‘যৌনতার নির্বাচন’ বিবর্তন প্রক্রিয়ায় মূল ভূমিকা রেখে থাকে তবে এর একটি প্রভাব আমাদের দীর্ঘদিনের মানসপট নির্মাণেও অবশ্যম্ভাবীরূপে পড়বে। যৌনতার উদ্ভবের কারণে সভ্যতার ঊষালগ্ন থেকে নারী-পুরুষ একই মানবপ্রকৃতির অংশ হওয়া সত্ত্বেও তাদের মধ্যে প্রাকৃতিকভাবেই তৈরি হয়েছে এক ধরনের মনোদৈহিক পার্থক্য জৈববৈজ্ঞানিক পথেই। নারীদের জননতন্ত্রের প্রকৃতি পুরুষদের জননতন্ত্র থেকে আলাদা। মেয়েদেরকে যে ঋতুচক্র, নয়মাসব্যাপী গর্ভধারণসহ হাজারো ঝুট-ঝামেলা পোহাতে হয়–পুরুষদের সেগুলো কোনোটিই করতে হয় না। একটি পুরুষ, তাত্ত্বিকভাবে হলেও যে কোনো সময়ে এই পৃথিবীর বুকে অসংখ্য নারীর গর্ভে অসংখ্য সন্তানের জন্ম দিতে পারে (কুখ্যাত চেঙ্গিস খানের মতো কেউ কেউ সেটা করে দেখিয়েছেও)। কিন্তু একটি মেয়ে এক বছরে শুধু একটি পুরুষের শুক্রাণু দিয়েই গর্ভ নিশ্চিত করতে পারে–এর বেশি নয়। আসলে কেউ যদি বলেন, জৈববৈজ্ঞানিক দিক থেকে বিচার করলে যৌনতার উদ্ভবই হয়েছে আসলে নারী-পুরুষে পার্থক্য করার জন্য এটা বললে মোটেই অত্যুক্তি হবে না। এই পার্থক্যের প্রভাব ছেলে মেয়েদের মানস জগতেও পড়েছে, পড়েছে সমাজেও। কোনো গবেষকই এখন অস্বীকার করেন না যে যৌনতার বিভাজন নারী পুরুষে গড়ে দিয়েছে বিস্তর পার্থক্য শুধু দেহ কাঠামোতে নয়, তার অর্জিত ব্যবহারেও। সেজন্যই গবেষক ডোনাল্ড সিমন্স বলেন,
‘Men and women differ in sexual natures because throughout the immensely long haunting and gathering phase of evolutionary history of sexual desires and dispositions that were adaptive for either sex were for either sex were for the other tickets to reproductive oblivion.’
মানব সভ্যতার যে কোনো জায়গায় খোঁজ নিলে দেখা যায় ছেলেরা সংস্কৃতি নির্বিশেষে মেয়েদের চেয়ে চরিত্রে বেশি ভায়োলেন্ট’ বা সহিংস হয়ে থাকে, মেয়েরা বাচনিক যোগাযোগে (ভার্বাল কমিউনিকেশন) ছেলেদের চেয়ে বেশি পরিপক্ক হয়। পলিগামি বা বহুগামিত্ব ব্যাপারটা মেয়েদের চেয়ে ছেলেদের মধ্যে অধিকতর প্রবলভাবে দৃশ্যমান। সম্পর্কের মধ্যে প্রতারণা বা ‘চিট’ ব্যাপারটাও কিন্তু মেয়েদের চেয়ে ছেলেরা বেশি করে থাকে। আবার মেয়েরা প্রতারণা ধরতে অধিকতর দক্ষ।
আসলে বৈজ্ঞানিকভাবে চিন্তা করলে ডিম্বাণু এবং শুক্রাণু কিন্তু আলাদা। পুরুষের স্পার্ম বা শুক্রাণু উৎপন্ন হয় হাজার হাজার, আর সে তুলনায় ডিম্বাণু উৎপন্ন হয় কম। ডিম্বাণুর আকার শুক্রাণুর চেয়ে বড় হয় অনেক অর্থাৎ, জৈববৈজ্ঞানিকভাবে চিন্তা করলে স্পার্ম সহজলভ্য, তাই কম দামি, আর সে তুলনায় ডিম্বাণু অনেক মূল্যবান। ‘স্পার্ম অনেক চিপ’ বলেই (সাধারণভাবে) পুরুষদের একটা সহজাত প্রবণতা থাকে বহু সংখ্যক জায়গায় তার প্রতিলিপি ছড়ানোর। সেজন্য তথাকথিত আধুনিক একগামী সমাজেও দেখা যায় পুরুষেরাই বেশি প্রতারণা করে সম্পর্কে, আর আগেকার সময়ে রাজা বাদশাহদের হারেম রাখার কিংবা শক্তিশালী সেনাপতিদের যুদ্ধ জয়ের পর নারী অধিকারের উদাহরণগুলোর কথা না হয় বাদই দিলাম। অপর দিকে ‘এগ ভালুয়েবল’ বলেই প্রকৃতিতে নারীরা যৌনসঙ্গী নির্বাচনের ব্যাপারে থাকে অপেক্ষাকৃত খুঁতখুঁতে, কারণ তারা নিশ্চিত করতে চায় কেবল উৎকৃষ্ট জিনের দ্বারাই যেন তার ডিম্বাণুর নিষেক ঘটে। এ ছাড়া এর আগের অধ্যায়ে আমরা রবার্ট ট্রাইভার্সের ‘অভিভাবকীয় বিনিয়োগ’ (parental investment) অনুকল্পের সাথেও পরিচিত হয়েছি। যেহেতু নারীরা অভিভাবকীয় বিনিয়োগের সিংহভাগে জড়িত থাকে, তারা যৌনসঙ্গী নির্বাচনের ব্যাপারে হয়ে উঠে অধিকতর হিসেবি এবং সাবধানী। সেজন্যই প্রকৃতিতে দেখা যায়, পুরুষ ময়ূর পেখম তুলে দাঁড়িয়ে থাকে, ‘খুঁতখুঁতে ময়ূরী হিসেব নিকেশ করে নির্বাচন করে যোগ্যতম ময়ূরকেই তার সৌন্দর্যের ভিত্তিতে। পুরুষ কোকিল গান গেতে থাকে তাদের সুমধুর গলায়, ফুট ফ্লাইরা নাচতে থাকে স্ত্রী মাছিদের প্রণয় লাভের জন্য, পুরুষ চিত্রল হরিণেরা সম্মোহিত করতে চায় তাদের বর্ণাঢ্য শিং এর যাদুতে, আর স্ত্রীরা নির্বাচন করে তাদের মধ্যে যোগ্য পুরুষটিকে।
