মানবসমাজের দিকে তাকানো যাক। সাধারণভাবে বললে, একজন পুরুষ তার সারা জীবনে অসংখ্য নারীর গর্ভে সন্তানের জন্ম দিতে পারে। ইতিহাসে একজন পুরুষের সবচেয়ে বেশি সংখক সন্তানের হিসেব পাওয়া যায় ব্লাড থাস্টি মৌলে ইসমাইল-এর (১০৪২ জন সন্তান)। তাত্ত্বিকভাবে একজন পুরুষ গর্ভ সঞ্চার করতে পারে প্রতি মুহূর্তেই। অপরদিকে একজন নারী বছরে কেবল একটি সন্তানেরই জন্ম দিতে পারে। সে হিসেবে সাড়া জীবনে তার সন্তান সর্বোচ্চ ২০-২২টির বেশি হবার সম্ভাবনা নেই (যমজ সন্তানের হিসেব গোনায় আনছি না)। বিবর্তনীয় পটভূমিকায় দেখা গেছে নারীরা যদি ক্রমাগত সঙ্গী বদল করতে থাকলে তা আসলে কোনো প্রজননগত উপযোগিতা (reproductive benefit) প্রদান করে না। তার চেয়ে বরং সন্তানের দেখাশোনায় শক্তি বেশি নিয়োজিত করলেই বরং ভবিষ্যৎ জিন টিকে থাকার সম্ভাবনা বৃদ্ধি পায়। সম্ভবত এই কারণেই নারীদের মধ্যে বহুগামিতা থাকে পুরুষদের তুলনায় কম। সমীক্ষা থেকে দেখা গেছে, আদিম কিছু ট্রাইবে ভ্রাতৃয় বহুভ্রাতৃত্ব (fraternal polyandry), যেখানে সহোদর ভাইয়েরা মহাভারতের দ্রৌপদীর মতো একজন পত্নীর অংশীদার– দুচারটি জায়গায় দৃশ্যমান হলেও অভ্রাতৃয় বহুভ্রাতৃত্ব (nonfraternal polyandry) পৃথিবীর কোথাওই সেভাবে দৃশ্যমান নয়।
পর্নোগ্রাফির প্রতি আকর্ষণ মেয়েদের চেয়ে ছেলেদের মধ্যে বেশি, সেটা বোধ হয় না বলে দিলেও চলবে। কিন্তু মেয়েরা আবার ছেলেদের তুলনায় ‘লাভ স্টোরি’র বেশি ভক্ত। সিরিয়াল কিলারের সংখ্যা ছেলেদের মধ্যে বেশি, মেয়েদের মধ্যে খুবই কম। সংস্কৃতি নির্বিশেষে পুরুষদের টাকা পয়সা, স্ট্যাটাস ইত্যাদির মাপকাঠিতে বিচার করা হয়, আর মেয়েদের সৌন্দর্যের। নৃতত্ত্ববিদ মেলভিন কনোর খুব পরিষ্কার করেই বলেন–
ছেলেরা মেয়েদের চেয়ে বেশি সহিংস আর মেয়েরা অনেক বেশি সংবেদনশীল–অন্তত শিশু এবং নাবালকদের প্রতি। এই ব্যাপারটা উল্লেখ করলে একে যদি ‘গতানুগতিক কথাবার্তা’ (cliché) বলে কেউ উড়িয়ে দিতে চান সেটা এ সত্যকে কিছুমাত্র দমন করবে না।
ব্যাপারগুলো সঠিক নাকি ভুল, কিংবা ‘উচিত’ নাকি ‘অনুচিত’ সেটি এখানে বিচার্য নয়, বিচার্য হচ্ছে আমাদের সমাজ কেন এইভাবে গড়ে উঠেছে যে সংখ্যাগরিষ্ঠ মন মানসিকতা একটি নির্দিষ্ট ছকে সবসময় আবদ্ধ থাকে? এখানেই মানবপ্রকৃতি বিশ্লেষণে বিবর্তনীয় মনোবিজ্ঞান যতটা সফল, সমাজবিজ্ঞান ততটা নয়।
কেন সংস্কৃতি-নির্বিশেষে ছেলেরা সম্পর্কের মধ্যে থাকা অবস্থায় তার সঙ্গীর সাথে বেশি প্রতারণা করে কিংবা কেন পর্নোগ্রাফির বেশি ভক্ত–এটি জিজ্ঞাসা করলে সমাজবিজ্ঞানী কিংবা নারীবাদীদের কাছ থেকে নির্ঘাত উত্তর পাওয়া যাবে যে, যুগ যুগ ধরে মেয়েদের সম্পত্তি বানিয়ে রাখা হয়েছে, তারা শোষিত এই মনোবৃত্তি তারই প্রতিফলন। কিন্তু যে সমস্ত সমাজে ছেলেমেয়েদের পার্থক্যসূচক মনোভাবের মাত্রা কম–সেখানে কী তাহলে এ ধরনের ঝোঁক নেই? না তা মোটেও নয়। এর প্রত্যক্ষ প্রমাণ পাওয়া গেছে ইসরায়েলের কিবুজ (Kibbutz) শহরের একটি পরীক্ষামূলক গবেষণায়। সমাজে বিদ্যমান সমস্ত রীতি বা ট্যাবু আসলে জন্মগত নয়, বরং সংস্কৃতি থেকেই উদ্ভূত–এই ধারণা থেকে সেখানকার অধিবাসীরা ঠিক করেছিল সমস্ত যৌনতার প্রভেদমূলক পার্থক্যকে ওই শহর থেকে ঝেটিয়ে বিদায় করা হবে। তার প্রক্রিয়া হিসেবে সেখানকার মেয়েদেরকে ছেলেদের মতো ছোট ছোট চুল রাখতে উৎসাহিত করা হলো, আর ছেলেদেরকে শেখানো হলো সহিংসতা ত্যাগ করে কীভাবে শান্তিপুর্ণভাবে বসবাদ করা যায়! যে সমস্ত মেয়েরা ‘টম বয়’ হয়ে জীবন কাটাতে চায়, তাদের পিঠ চাপড়ে সাধুবাদ জানানো হলো, ছেলেরা যেন ঘরের কাজ আর মেয়েরা যেন বাইরের কাজে দক্ষ হয়ে ওঠে সেজন্য যথাযথ ট্রেনিংয়ের ব্যবস্থা করা হলো। অর্থাৎ সব মিলিয়ে কিবুজ সে সময় গণ্য হয়েছিল আদর্শবাদীদের স্বর্গ হিসেবে যেখানে ছেলেমেয়েদের মধ্যে কোনো বিভেদ নেই। কিন্তু তিন প্রজন্ম পরে দেখা গেল সেই ‘আদর্শ’ কিবুজ পরিণত হয়েছে সবচেয়ে সেক্সিস্ট বা যৌনবৈষম্যবাদী শহর হিসেবে। সেখানকার মানুষজন আদর্শবাদীদের স্বপ্ন ধূলিসাৎ করে ফিরে গিয়েছিল সেই চিরন্তন গত্বাঁধা জীবনে। অভিভাবকদের আদর্শবাদী নীতির বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করল পরবর্তী প্রজন্মের সন্তানেরা। ছেলেরা দেখা গেল, অভিভাবকদের দেখিয়ে দেয়া পথ অস্বীকার করে বেশি পদার্থবিজ্ঞান, ইঞ্জিনিয়ারিং এবং গণিত পড়তে শুরু করেছে, মেয়েরা বেশি যাচ্ছে মেডিকেলে। তারা নার্সিং-এ কিংবা শিক্ষকতাকে পেশা হিসেবে বেছে নিচ্ছে ছেলেদের চেয়ে অনেক বেশি। ছেলেদের ঘরের কাজ করার যে ট্রেনিং দেয়া হয়েছিল, কিন্তু দেখা গেল মেয়েরাই শেষপর্যন্ত ঘরদোর গোছানোর দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিয়েছে। দায়িত্ব তুলে নেওয়ার পেছনে কারণ হিসেবে তারা বলল, “আরে ছেলেরা ঠিকমত বাসাবাড়ি পরিষ্কার রাখতে পারে না। আর অন্যদিকে ছেলেরা বলল, “আরে যত ভালোভাবেই করি না কেন বউয়ের মর্জিমাফিক কিছুতেই হয় না। ব্যাপারটা অপ্রিয় হলেও সত্য যে, এ ধরনের বিভক্তিগুলোকে যতই অস্বীকার করে সাম্যের পথে সমাজকে ঠেলে দেয়া হয়, বিদ্যমান জৈববৈজ্ঞানিক পার্থক্যগুলো সে সমাজে তত প্রকট হয়ে উঠে। ইতিহাস তাই সাক্ষ্য দেয়।
