নারীর পুলক হচ্ছে নারী অভিরুচি বাস্তবায়নের এক চূড়ান্ত অভিব্যক্তি। … এটা নারীর মতো করে গোপন বিতর্কের নিয়ন্ত্রণ নিজ হাতে তুলে নেওয়ার একটি সচেতন প্রক্রিয়া।
নারীর পুলকের সময় জরায়ুসহ বিভিন্ন মাংশপেশীর অবিরত সংকোচন ঘটে চলে। বিজ্ঞানীরা বলেন এই সংকোচন ঘটার পেছনে সুনির্দিষ্ট কিছু কারণ আছে। এই জরায়ুর মাংশপেশী সংকোচনের মাধ্যমে একটি নারী নিশ্চিত করে যে, জরায়ুর গ্রীবাদেশীয় শ্লৈষ্মিক ঝিল্লি (cervical mucus barrier) অতিক্রম করে সে যেন শুক্রাণুকে নিজের দেহভ্যন্তরে পুরোপুরি টেনে নিতে পারে। আমি একটি প্রকাশিত কেস স্টাডি থেকে এমন ঘটনার সন্ধানও পেয়েছি যে, অর্গাজমের চাপে একটি পুরুষের কন্ডম পর্যন্ত ভিতরে শুষে নিয়েছিল একটি নারীর দেহ, পরবর্তী অনুসন্ধানে কন্ডমটি পাওয়া গিয়েছিল নারীটির সার্ভিকাল ক্যানালের সরু পথে আটকে যাওয়া অবস্থায়[১৫৯]। এ থেকে অনুমান করা যায় যে, অর্গাজম বা নারী পুলকের মূল লক্ষ্য থাকে শুক্রাণুকে যতদূর সম্ভব ডিম্বাণুর কাছাকাছি পৌঁছে দেয়া, এর ফলে বৃদ্ধি পায় গর্ভধারণের সম্ভাবনা।
বিজ্ঞানীরা এটাও দেখেছেন যে, নারীর অর্গাজম হলে সে যে পরিমাণ শুক্রাণু নিজের অভ্যন্তরে ধারণ করে, অর্গাজম না হলে তার চেয়ে অনেক কম শুক্রাণু সে তার মধ্যে ধারণ করতে পারে। অর্থাৎ অর্গাজম হলে নারীর নিজের অভ্যন্তরে শুক্রাণুর ধারণ ক্ষমতা নাটকীয়ভাবে বেড়ে যায়[১৬০]। যেমন, দেখা গিয়েছে। স্বাভাবিক অবস্থায় একটি নারী সাধারণত সঙ্গমের পর মোটামুটি ৩৫ ভাগ শুক্রাণু নিজ দেহ থেকে বের করে দেয়। কিন্তু নারীর অর্গাজম হলে সে প্রায় সত্তর ভাগ স্পার্ম নিজের মধ্যে ধারণ করে, আর বের করে দেয় ৩০ ভাগ। তার মানে চরম পুলক না হবার অর্থ হলো, অধিকতর বেশি শুক্রাণুর বর্জন। এই সাক্ষ্যগুলো সেই ‘স্পার্ম রিটেনশন’ তত্ত্বকেই সমর্থন করে যার মাধ্যমে নারী অধিক সংখ্যক শুক্রাণুকে যোনি থেকে জরায়ু এবং ডিম্বাশয়ের দিকে টেনে নিয়ে প্রকারান্তরে নিশ্চিত করতে চায় সঠিক পুরুষকে দিয়ে নিজের গর্ভধারণের সম্ভাবনা।
এখন কথা হচ্ছে সঠিক পুরুষটি কেমন হতে পারে যে কি না নারীকে নিয়মিত অর্গাজম উপহার দেবে? কোনো কিছু চিন্তা না করেই বলা যায় যে পুরুষটির একটি গুণ হতে পারে—সে দেখতে শুনতে হবে সুদর্শন। জীববিজ্ঞানের ভাষায় সুদর্শন পুরুষের মানে হচ্ছে প্রতিসম (symmetrical) চেহারা আর দেহের অধিকারী পুরুষ। কারণ বিবর্তনীয় পথপরিক্রমায় নারীরা বুঝে নিয়েছে যে, প্রতিসম চেহারা এবং দেহসৌষ্ঠবের অধিকারী পুরুষেরা স্বাস্থ্যবান, তাদের দেহ রোগ জীবাণুর আবাসস্থল নয়, অর্থাৎ মোটা দাগে তারা ‘সুপেরিয়র জেনেটিক কোয়ালিটি’র অধিকারী। রান্ডি থর্নহিল স্টিভেন গেংস্টাডের গবেষণা থেকে দেখা গেছে, নারীদের পুলকের পৌনঃপুনিকতা এবং চরম পুলকানুভূতি আনয়নের ক্ষেত্রে সুদর্শন পুরুষেরাই অধিকতর বেশি সফল হয়ে থাকে[১৬১]।
সুদর্শন পুরুষেরাও আবার সে ব্যাপারটি ভালো করেই জানে এবং বুঝে। সমীক্ষায় দেখা গেছে, সুদর্শন পুরুষেরা খুব কম সময়ের মধ্যেই (shortest courtship) যে কোনো ভালোবাসার সম্পর্ককে যৌনসম্পর্কের দিকে নিয়ে যেতে পারে। এও দেখা গেছে, পশ্চিমা দেশে সুদর্শন পুরুষেরা ডেট করার সময় গড়পড়তা প্রতি নারীর পেছনে কম সময় এবং অর্থ ব্যয় করে। শুধু তাই নয় সুদর্শন স্বামীরা অনেক বেশি হারে স্ত্রীদের প্রতারণা করে অন্য সম্পর্কে জড়ায়[১৬২]।
তবে নারী পুলক নিয়ে সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর ব্যাপারটি বেরিয়ে এসেছে বিজ্ঞানী রবিন বেকার এবং মার্ক বেলিসের সাম্প্রতিক একটি গবেষণা থেকে। তাদের গবেষণা থেকে দেখা গেছে যে সমস্ত নারীরা পরকীয়ায় মত্ত, তাদের অর্গাজম অনেক বেশি হয়। মানে, নিয়মিত সঙ্গীর চেয়ে গোপন প্রেমিকের সাথে সঙ্গমে নারীর চরম পুলকের হার অনেক বেশি থাকে তাদের ক্ষেত্রে। ব্রিটেনের ৩৬৭৯ জন নারীর উপর জরিপ চালিয়ে তারা দেখেছেন যে, তাদের ঋতুচক্রের সবচেয়ে উর্বর সময়গুলোতেই তারা পরকীয়ায় জড়িয়ে পড়ে, যে সময়টাতে তাদের গর্ভধারণ করার সম্ভাবনা থাকে সবচেয়ে বেশি[১৬৩]। এটাও দেখা গেছে যে, পরকীয়ারত নারীরা স্বামীর সাথে অনেক বেশি পুলক জালিয়াতি (fake orgasm) করে স্বামীদের আশ্বস্ত রাখতে চেষ্টা করে সম্ভবত এই ধারণা দিতে যে, সে কেবল তার স্বামীর প্রতিই রয়েছে বিশ্বস্ত[১৬৪]।
নিঃসন্দেহে স্বামীদের জন্য কোনো সুসংবাদ নয় এটি। কিন্তু এ ব্যাপারগুলো থেকে বোঝা যায় যে, মেয়েদের মেটিং স্ট্র্যাটিজি সব সময় স্বামীকে তুষ্ট করে ‘যৌন বিশ্বস্ত হয়ে চলার জন্য বিবর্তিত হয়নি, বরং বিস্তৃত হয়েছে কখনো সখনো উৎকৃষ্ট জিনের সন্ধানে নিজের প্রজনন সফলতাকে বাস্তিবায়িত করার জন্যও। মাথা নেড়ে যতই এটাকে অস্বীকারের চেষ্টা করা হোক না কেন, বিবর্তনের অমসৃণ যাত্রাপথে রয়েছে এর সুস্পষ্ট পদচিহ্ন।
.
চোখের আলোয় দেখেছিলেম মনের গভীরে
ভালোবাসার কথা বললেই আমাদের সামনে সবার আগে হৃদয়ের কথা চলে আসে। বিদগ্ধ প্রেমিক-প্রেমিকারা অহরহ ‘হৃদয়ের কথা বলিতে ব্যাকুল হয়ে ওঠে, সেটা আমরা সবাই জানি। কিন্তু আসল সত্যটা হলো বিজ্ঞানীরা বলেন, ভালোবাসার উৎস হৃদয় নয়, বরং মস্তিষ্ক। শুধু তাই নয়, বিবর্তন মনোবিজ্ঞানী জিওফ্রি মিলারের মতে, মানুষের মস্তিষ্ক বা ব্রেন হচ্ছে এক ‘Magnificent Sexual Ornament, যা যৌনতার নির্বাচনের মাধ্যমে বিবর্তিত হয়েছে আমাদের পছন্দ-অপছন্দ অভিরুচিকে মূল্য দিয়ে। মিলারের মতে মস্তিষ্কের প্রকৃতিও অনেকটা পুরুষাঙ্গের মতোই যৌননির্বাচনের ফসল। আমরা সে সমস্ত সঙ্গীর সাথেই থাকতে পছন্দ করি যাদের সাথে থেকে আমরা সুখী বোধ করি[১৬৫]। আর কার সাথে সুখী বোধ করব, তা নির্ধারণ করে আমাদের মস্তিষ্ক, হৃদয় নয়। আমরা যেমন স্বাস্থ্যবান, সুদর্শন সঙ্গী পছন্দ করি, তেমনি পছন্দ করি এমন কাউকে যে রসিকতা বোঝে, প্রেম-ভালোবাসার ব্যাপারে রোমান্টিক এবং বিশ্বস্ত, শিল্প-সাহিত্য সংগীতের ব্যাপারে সমঝদার। আমরা এ ধরনের গুণাবলিগুলো পছন্দ করি কারণ বিপরীতলিঙ্গের চাহিদাকে মূল্য দিয়ে আমাদের মস্তিষ্ক অভিযোজিত হয়েছে আর আমাদের পছন্দ-অপছন্দ আর ভালোলাগাগুলো বিবর্তিত হয়েছে যৌনতার নির্বাচনের পথ ধরে। যৌনতার নির্বাচনই আমাদের মস্তিষ্কে তৈরি করেছে গান-বাজনা, নৃত্য-গীত, কাব্য, শিল্প-সাহিত্য, স্থাপত্যকর্ম, খেলাধুলা, বাগ্মীতা প্রভৃতির প্রতি অনুরাগ। যাদের মধ্যে এ গুণাবলি আমরা খুঁজে পাই, তারা অনেক সময়ই হয়ে ওঠে আমাদের পছন্দের মানুষজন।
