ঠিক একইভাবে মেয়েরাও লম্বা চওড়া সুদর্শন পুরুষ পছন্দ করে, যাদের রয়েছে। সুগঠিত চোয়াল, চওড়া কাঁধ আর প্রতিসম সুগঠিত দেহ। যেমন অভিনেতা ব্র্যাড পিট তার সুগঠিত দেহ, চওড়া এবং সুদৃঢ় চোয়ালের জন্য সারা পৃথিবীজুড়েই নারীদের কাছে আকর্ষণীয় এবং সুদর্শন পুরুষ হিসেবে খ্যাত। কারণ, পুরুষের এ পুরুষালি বৈশিষ্ট্যগুলোই দীর্ঘদিন ধরে নারীদের কাছে নির্বাচিত হয়েছে এক ধরনের ‘ফিটনেস মার্কার হিসেবে, শিকারি সংগ্রাহক সমাজে এ ধরনের পুরুষেরা ছিল নারীদের কাছে অতিপ্রিয়, তারা ছিল স্বাস্থ্যবান, উদ্যমী, সাহসী, ক্ষিপ্র এবং গোত্রের নিরাপত্তা প্রদানে সফল। তারা অর্জন করতে পেরেছিল বহু নারীর সান্নিধ্য এবং পেয়েছিল প্রজননগত সফলতা। খুব সুচারুভাবে সেই অভিব্যক্তিগুলো নির্বাচিত হয়েছিল বলেই সেগুলো নারীদের মানসপটে রাজত্ব করে এখনও, তারা সুদর্শন পুরুষ দেখে আমোদিত হয়।
চিত্র। পেজ ১২৬
চিত্র : অভিনেতা ব্র্যাড পিট তার। সুগঠিত দেহ, চওড়া এবং সুদৃঢ় চোয়ালের জন্য সারা পৃথিবী জুড়েই নারীদের কাছে আরাধ্য।
অন্যদিকে প্লেবয়, ভোগ কিংবা কসমোপলিটনের কভার গার্ল (বাংলা করলে বলা যায় ‘মলাট সুন্দরী’)-দের দিকে কিংবা ছবির জগতের নায়িকাদের তাকালে বোঝা যায় কেন পুরুষেরা তাদের দেখলে লালায়িত হয়ে উঠে। তাদের থাকে ক্ষুদ্র নাসিকা, চিকোনো চিবুক, বড় চোখ, পুরুষ্ঠ ঠোঁট। তাদের সবার বয়সই থাকে মোটামুটি ১৭ থেকে ২৫-এর মধ্যে যেটি মেয়েদের জীবনকালের সবচেয়ে উর্বর সময় বলে। সাধারণভাবে মনে করা হয়। তাদের দেহ সৌষ্ঠব থাকে প্রতিসম। তাদের কোমর এবং নিতম্বের অনুপাত থাকে ০.৭ এর কাছাকাছি। শুধু প্লেবয়ের মলাট সুন্দরী নয়, বড় বড় অভিনেত্রী এবং সুপার মডেলদের জন্যও ব্যাপারটা একইভাবে দৃশ্যমান। হলিউড অভিনেত্রী এবং একসময়ের বিশ্বসুন্দরী ঐশ্বরিয়া রাইয়ের দেহের মাপ ৩২ ২৫-৩৪ অর্থাৎ প্রায় ০.৭৩। এঞ্জেলিনা জোলির ০.৭২। জেনিফার লোপেজের ০.৬৭। বিপাশা বসুর ০.৭৬। আর মেরোলিন মনেরোর দেহের মাপ ছিল ৩৬-২৪ ৩৪, মানে একদম খাপে খাপ ০.৭। নারীদেহের এই অনুপাতের একটা আলাদা মাহাত্ম্য আছে পুরুষের কাছে। দেখা গেছে, সারা দুনিয়া জুড়ে শোবিজের সাথে যুক্ত এই কাক্ষিত নারীদের কোমর আর নিতম্বের অনুপাত সবসময়েই ০.৬ থেকে ০.৮ এর মধ্যে, বা আরও স্পষ্ট করে বললে ০.৭ এর কাছাকাছি ঘোরাফেরা করে। আমরা আগে অধ্যাপক দেবেন্দ্র সিংহের একটি গবেষণার কথা উল্লেখ করেছিলাম, যে গবেষণা থেকে জানা গেছে, নারীর কোমর এবং নিতম্বের অনুপাত ০.৬ থেকে ০.৮ মধ্যে থাকলে তা তৈরি করে সেই ‘ক্লাসিক hourglass figure’ যা সার্বজনীনভাবে পুরুষদের কাছে আকর্ষণীয় বলে প্রতীয়মান! অধ্যাপক সিংহ ১৯২০ সাল থেকে শুরু করে ১৯৮০ সাল পর্যন্ত ‘মিস আমেরিকা’দের মধ্যে এবং ১৯৫৫ থেকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত প্লেবয়ের নায়িকাদের মধ্যে জরিপ চালিয়ে দেখেছেন মিস আমেরিকাদের ক্ষেত্রে কোমর-নিতম্বের অনুপাত ছিল ০.৬৯ থেকে ০.৭২ এর মধ্যে, আর প্লেবয়ের নায়িকাদের ক্ষেত্রে ০.৬৮ থেকে ০.৭১ এর মধ্যে[১৩৯]। এ সমস্ত আদর্শ দেহবল্ললরীর অধিকারী নায়িকারা এক একজন সেক্সবম্ব, যাদের যৌনাবেদন পুরুষদের কাছে। আক্ষরিক অর্থেই আকাশ ছোঁয়া। আর, বলা বাহুল্য পুরুষদের মানসপটে এই উদগ্র আগ্রহ তৈরি হয়েছে ডারউইন বর্ণিত যৌনতার নির্বাচনের পথ ধরে।
কিন্তু সত্যই সেক্সুয়ালের সিলেকশনের মাধ্যমে সত্যিই সেক্সবম্ব তৈরি হয় নাকি? ব্যাপারটা হাতে কলমে পরীক্ষা করার সিদ্ধান্ত নিলেন জীববিজ্ঞানী রিচার্ড ডকিন্স। তবে মানুষের ক্ষেত্রে নয়, স্টিকেলব্যাক মাছের ক্ষেত্রে[১৪০]। তার পরীক্ষাটি একধরনের অধিপ্রাকৃতিক উদ্দীপনার (supernormal stimuli) পরীক্ষা বলা যায়। অধ্যাপক ডকিন্স সহ অন্যান্য জীববিজ্ঞানীরা জানতেন যে, স্টিকেলব্যাক মাছের ক্ষেত্রে স্ত্রী মাছেরা যখন উর্বর সময় অতিক্রম করে তখন তাদের পেট হয়ে উঠে ডিমে ভর্তি গোলাকার, লালাভ টসটসে। পুরুষ মাছেরা তাদের দেখে লালায়িত হয়। ডকিন্স তার ল্যাবের একুরিয়ামে সাধারণ রূপালি মাছের পেট কৃত্রিমভাবে বড়, গোলাকার আর লালাভ করে দিয়ে কিছু ‘ডামি মাছ’ পানিতে ছেড়ে দিলেন। ব্যাস দেখা গেল পুরুষ স্টিকেলব্যাক মাছেরা পারলে হামলে পড়ছে সে সব মাছের ওপর। যত বেশি নিখুঁত, গোলাকার আর লালাভ পেট বানানো হচ্ছে, তত বাড়ছে পুরুষ মাছদের যৌনোদ্দীপনা। ডকিন্সের ভাষায় সেই ডামি মাছগুলো ছিল স্টিকেলব্যাক মাছের রাজত্বে এক একটি ‘সেক্সবম্ব’।
যে ব্যাপারটা স্টিকেলব্যাক মাছের ক্ষেত্রে সত্য বলে মনে হচ্ছে, মানুষের ক্ষেত্রেও কি সেটার সত্যতা বিভিন্নভাবে পাওয়া যাচ্ছে না? নারীদের সাম্প্রতিক ‘ব্রেস্ট ইমপ্ল্যান্ট সার্জারির হুজুগের কথাই ধরা যাক। এটা এমন এক ধরনের সার্জারি, যার মাধ্যমে নারীরা স্তনের আকার পরিবর্তন করে থাকেন। এ সার্জারিগুলো এক সময় কেবল পর্নোস্টাররাই করতেন, এখন হলিউড বলিউডের অভিনেত্রীদের কাছেও ব্যাপারটা খুবই সাধারণ, এমনকি বাসার গৃহিণীরাও তা করতে শুরু করেছে। আমেরিকান সোসাইটি অব প্লাস্টিক সার্জন (ASPS)-এর তথ্য অনুযায়ী কেবল ২০০৩ সালেই আট মিলিয়ন মহিলা ‘ব্রেস্ট ইম্পল্যান্ট সার্জারি করেছে, যেটা আবার ২০০২ সালের চেয়ে শতকরা ৩২ ভাগ বেশি। খোদ আমেরিকাতে প্রতি বছর এক লক্ষ বিশ হাজার থেকে দেড় লক্ষ নারী ব্রেস্ট ইম্পল্যান্ট করে থাকে[১৪১]। এমন নয় যে ক্ষুদ্র স্তন তাদের কোনো দৈহিক সমস্যা করে। সার্জারির পুরো ব্যাপারটাই কেবল নান্দনিক (aesthetic), পুরুষদের যৌনোদ্দীপনাকে প্রাধান্য দিয়ে নিজেদের দেহকে সুন্দর করে উপস্থাপন, আর সর্বোপরি আত্মবিশ্বাস বাড়ানো। স্টিকেলব্যাক পুরুষ মাছেরা যেমন বড়, গোলাকার আর লালাভ পেটওয়ালা স্ত্রী মাছদের জন্য লালায়িত হয়, ঠিক তেমনি মানবসমাজে দেখা গেছে পুরুষেরা সুদৃঢ়, গোলাকার আর পিনোন্নত স্তন দেখে উদ্দীপ্ত হয়ে উঠে! পুরুষদের এই পছন্দ অপছন্দের প্রভাব পড়ছে আবার নারীদের আচরণে। এগুলো তারই প্রতিফলন। শুধু ব্রেস্ট ইম্পল্যান্টই নয়, সেই সাথে বোটক্স, ফেসলিফট, ঠোঁটের প্রস্থ বাড়ানো, চোখের ভুরু উঁচু করা, বাঁকা দাঁত সোজা করা, নাক খাড়া করা সহ সকল ধরনের প্লাস্টিক সার্জারির ক্রমবদ্ধমান জনপ্রিয়তা তৈরি করছে মানবসমাজে সেক্সবম্বের স্বপ্নীল চাহিদা!
