আমি তোমার বন্ধু, তুমি আমার স্বামী
খোদার পরে তোমার আসন বড় বলে জানি …
পরকীয়া তো দূরের কথা, কোনো ধরনের অবিশ্বস্ততার আলামত পেলে খুন জখম কিংবা চোখ খুবলে নেওয়ার শাস্তিও সামাজিকভাবে লঘু হয়ে যায়। কারণ পুরুষেরা স্ত্রীদের অবিশ্বস্ততাকে প্রজননগতভাবে অধিকতর মূল্যবান বলে মনে করে। যেহেতু পিতৃতন্ত্রের মূল লক্ষ্য থাকে ‘সুনিশ্চিত পিতৃত্বে সন্তান উৎপাদন’ সেজন্য, পিতৃতান্ত্রিক সমাজে জৈবিক এবং সামাজিক কারণেই স্ত্রীর পরকীয়াকে ‘হুমকি। হিসেবে দেখা হয়। স্ত্রী পরকীয়ার ঘটনা প্রকাশিত হয়ে গেলে স্বামী ক্ষতিগ্রস্ত হয় মান সম্মান, সামাজিক পদপর্যাদা সহ বহু কিছুতেই। তিনি সমাজে পরিণত হন ইয়ার্কি ফাজলামোর বিষয়ে। এটা শুধু আমাদের দেশে নয়, অনেক দেশের জন্যই সত্য। এমনকি পাঠকেরা জেনে অবাক হবেন যে, ১৯৭৪ সাল পর্যন্ত আমেরিকার টেক্সাসে এমন আইন চালু ছিল যে, অবিশ্বস্ততার আলামত পেয়ে স্বামী যদি স্ত্রীকে হত্যা করে তবে সেটি কোনো অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হবে না। প্রাচীন রোমে এমন আইন চালু ছিল যে, যদি স্বামীর নিজ গৃহে পরকীয়া বা ব্যাভিচারের ঘটনা ঘটে, তবে স্বামী তার অবিশ্বস্ত স্ত্রী এবং তার প্রেমিকাকে হত্যা করতে পারবেন; ইউরোপের অনেক দেশে এখনও সেসব আইনের কিছু প্রতিফলন দেখা যায়[১৩৬]। তিভ, সোগা, গিসু, নয়োরো, লুয়িয়া, লুয়ো প্রভৃতি আফ্রিকান রাজ্যে হত্যাকাণ্ডের উপর গবেষণা চালিয়ে দেখা গেছে যে, সেখানে ৪৬ শতাংশ হত্যাকাণ্ডই সংগঠিত হয় যৌনতার প্রতারণা, অবিশ্বস্ততা প্রভৃতিকে কেন্দ্র করে। একইভাবে, সুদান উগান্ডা এবং ভারতেও যৌন ঈর্ষা বা ‘সেক্সুয়াল জেলাসি’ হত্যাকাণ্ড সংগঠিত হবার মূল কারণ বলে জানা গেছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই দেখা গেছে, যখনই স্বামী কোনো পরকীয়ার আলামত পেয়েছে, কিংবা স্ত্রী যখন স্বামীকে ত্যাগ করার হুমকি দিয়েছে তখনই সেই হত্যাকাণ্ডগুলো সংগঠিত হয়েছে। সাঈদের ক্ষেত্রেও আমরা দেখেছি স্বামীর সাথে বেশ কিছুদিন ধরেই রুমানার ঝগড়াঝাটি চলছিলে। কলহের এক পর্যায়ে রুমানা উত্তেজিত হয়ে স্বামীর সঙ্গে সংসার করতে অপারগতা প্রকাশ করেছিলেন। এরপর থেকেই মূলত রুমানাকে হত্যার পরিকল্পনা করে সাঈদ। ২১শে মে বেধড়ক মারধরের পর গলা টিপে রুমানাকে হত্যার ব্যর্থ চেষ্টা চালায়। এ সময় রুমানার চিল্কারে বাড়ির সবাই এগিয়ে গেলে সে যাত্রা পরিকল্পনা ব্যর্থ হয়। পরে পরিবারের হস্তক্ষেপে তা মিটমাট হয়। তারপর কিছুদিন পরে রুমানার মা মেহেরপুরে গ্রামের বাড়ি বেড়াতে গেলে ৫ই জুন আবারো হত্যার চেষ্টা চালায়। সে দিন সাঈদ রুমানাকে ঘরে ডেকে নিয়ে দরজা বন্ধ করে দেয়। এ সময় উভয়ের মধ্যে কথা কাটাকাটির এক পর্যায়ে রুমানার গলা টিপে ধরে। রুমানা সজোরে আঘাত করে নিজেকে মুক্ত করে ফেলেন। এ সময় সাঈদের চোখের চশমা পড়ে যায়। এমন পরিস্থিতিতে রুমানাকে বীভৎসভাবে হত্যার উদ্দেশ্যে তার গাল, নাক, মুখসহ স্পর্শকাতর স্থানে কামড়াতে থাকে। সাঈদ রুমানার নাকে কামড় দিয়ে ছিঁড়ে ফেলে। চোখে আঙুল ঢুকিয়ে চোখ উপড়ে ফেলার চেষ্টা করে …
হ্যাঁ, আমরা সবাই সাঈদের কৃতকর্মের শাস্তি চাই। কোনো সুস্থ মাথার মানুষই প্রত্যাশা করবেন না যে, এ ধরনের নৃশংস ঘটনা ঘটিয়ে সাঈদ অবলীলায় মুক্তি পেয়ে যাক, আর তৈরি করুক আরেকটি ভবিষ্যৎ-অপরাধের সুস্থিত ক্ষেত্র। বরং, তার দুষ্টান্তমুলক শাস্তিই কাম্য। কিন্তু সমাজে যখন নারী নির্যাতন প্রকট আকার ধারণ করে, যখন নৃশংসভাবে একটি নারীর গাল নাক কামড়ে জখম করা হয়, রাতারাতি চোখ খুবলে নেওয়া হয়, এর পেছনের মনস্তাত্বিক কারণগুলোও আমাদের খুঁজে বের করা জরুরি। আমাদের বোঝা দরকার কোনো পরিস্থিতিতে সাঈদের মতো লোকজনের আচরণ এরকম বিপজ্জনক এবং নৃশংস হয়ে উঠতে পারে। আমাদের অস্তিত্বের জন্যই কিন্তু সেগুলো জেনে রাখা প্রয়োজন। ভবিষ্যতে একটি সুন্দর পৃথিবী তৈরির প্রত্যাশাতেই এটা দরকার।
.
সেক্সবম্ব
নীচের ছবি দুটো লক্ষ করুন।
কোন্ ছবিটিকে আপনার কাছে অধিকতর ‘প্রিয়দর্শিনী’ বলে মনে হয়? জরিপে অংশ নেওয়া অধিকাংশ পুরুষ এবং নারীই অভিমত দিয়েছেন ডান পাশেরটি অর্থাৎ ২য় ছবিটিকে। এবারে আরেকটু ভালো করে ছবি দুটো লক্ষ করুন। দেখবেন যে ছবি দুটো আসলে একই নারীর। আসলে আরও স্পষ্ট করে বললে একটি ছবি থেকেই পরের ছবিটি তৈরি করা হয়ছে, কম্পিউটারে একটি বিশেষ সফটওয়্যার ব্যবহার করে। আর এটি প্রোগ্রাম করেছেন আইরিশ বংশদ্ভূত বিবর্তন মনোবিজ্ঞানী ড. ভিক্টর জনস্টন[১৩৭]। গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যাবে, ১ম ছবির সাথে ২য় ছবির পার্থক্য আসলে সামান্যই। প্রথম ছবিটির নারীর চিকন ঠোঁটকে একটু পুরু করা হয়েছে ২য় ছবিতে, চিবুকের আকার সামান্য কমিয়ে দেয়া হয়েছে, চোখের গভীরতা একটু বাড়িয়ে দেয়া হয়েছে। আর তাতেই অধিকাংশ পুরুষের কাছে ছবিটি আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছে। কিন্তু কেন?
বিজ্ঞানী ভিক্টর জনস্টন সহ অন্যান্য গবেষকদের মতে, পুরু ঠোঁট আসলে অধিক এস্ট্রোজেন জমা হয়ে মুখমণ্ডল নমনীয় থাকার লক্ষণ, আর অন্য দিকে সরু এবং চিকোনো চিবুক ‘লো টেস্টোস্টেরন’ মার্কার। এ ব্যাপারটা পুরুষদের কাছে। পছন্দনীয় কারণ এ বৈশিষ্ট্যগুলো মোটা দাগে নারীর উর্বরাশক্তির বহিঃপ্রকাশ[১৩৮]। এ অধ্যায়ের প্রথম দিকে উল্লেখ করেছিলাম সৌন্দর্য্যের উপলব্ধি কোনো বিমূর্ত ব্যাপার নয়। এর সাথে যৌন আকর্ষণ এবং সর্বোপরি গর্ভধারণক্ষমতার একটা গভীর সম্পর্ক আছে, আর আছে আমাদের দীর্ঘদিনের বিবর্তনীয় পথপরিক্রমার সুস্পষ্ট ছাপ। আমরা যখন কাউকে প্রিয়দর্শিনী বলে ভাবি, আমাদের অজান্তে আসলে সেই চিরন্তন উপলব্ধিটাই কাজ করে। আমাদের আদিম পূর্বপুরুষেরা যৌনসঙ্গী নির্বাচনের সময় এস্ট্রোজেনের মাত্রা নির্ণয়ের কোনো আধুনিক যন্ত্রপাতি খুঁজে পায়নি, তাদের কাছে সঙ্গীর পরিষ্কার চামড়া, ঘন চুল, কমনীয় মুখশ্রী, প্রতিসাম্যময় দেহ, পিনোন্নত স্তন, সুডৌল নিতম্ব আর ক্ষীণ কটিদেশ ছিল গর্ভধারণ ক্ষমতা তথা উর্বরতার প্রতীক। তাদের কাছে এই বৈশিষ্ট্যগুলোই ছিল আদরণীয়। তারা যৌনসঙ্গী নির্বাচনের ক্ষেত্রে গুরুত্ব দিয়েছে বিপরীত লিঙ্গের এ সমস্ত দেহজ বৈশিষ্টেরই। যাদের এ বৈশিষ্ট্যগুলো ছিল তারাই সঙ্গী হিসেবে অধিকহারে নির্বাচিত হয়েছে, আর তারা প্রকারন্তরে অর্জন করেছে প্রজননগত সফলতা, আমরা তাদেরই বংশধর। তাই সঙ্গী নির্বাচনের সময় আমাদের মনেও খেলা করে যায় সেই একই ধরনের অভিব্যক্তিগুলো, যেগুলোর প্রকাশ ঘটেছিল আসলে অনেক অনেক আগে প্লেইস্টোসিন যুগে আমাদের পূর্বপুরুষদের সঠিক সঙ্গী নির্বাচনের তাগিদে।
