প্লাস্টিক সার্জারির কথা বাদ দেই, সারা পৃথিবী জুড়ে স্নো, পাউডার লিপস্টিকের কী রমরমা ব্যাবসা। এই সব প্রসাধনসামগ্রীর মূল ক্রেতা কিন্তু মেয়েরাই। পরিসংখ্যানে দেখা গেছে শুধুমাত্র আমেরিকাতেই প্রতি মিনিটে ১৪৮৪টি লিপস্টিকের টিউব এবং ২০৫৫ জার ‘স্কিন কেয়ার প্রোডাক্ট বিক্রি হয়। আমরা এগুলোর যত সামাজিক ব্যাখ্যা প্রতিব্যখ্যা করি না কেন, কিংবা যত ইচ্ছে মিডিয়াকে দোষারোপ করি না কেন, এইধরনের ইন্ডাস্ট্রি টিকে থাকার হিসেব খুব সহজ সরল পুরুষেরা মেয়েদের কাছ থেকে যথাসম্ভব তারুণ্য এবং সৌন্দর্য আদায় করে নিতে চায়। আবার মেয়েরাও বিপরীত লিঙ্গের সেই সঙ্গমী মননকে প্রাধান্য দিয়ে অব্যাহতভাবে সৌন্দর্যচর্চা করে যায়, তারা ত্বককে রাখতে চায় যথাসম্ভব মাখনের মতোন পেলব, ঠোঁটকে গোলাপের মতো প্রস্ফুটিত; কারণ তারা দেখেছে এর মাধ্যমে স্টিকেলব্যাকের ডামি মাছগুলোর মতোই অনেক ক্ষেত্রে স্ট্র্যাটিজিগতভাবে সঙ্গী নির্বাচন আর ধরে রাখায় সফল হওয়া যাচ্ছে।
চিত্র। পেজ ১৩০
চিত্র : পরিসংখ্যানে দেখা গেছে শুধুমাত্র আমেরিকাতেই প্রতি মিনিটে ১৪৮৪টি লিপস্টিকের টিউব এবং ২০৫৫ জার ‘স্কিন কেয়ার প্রোডাক্ট’ বিক্রি হয়।
এ তো গেল মেয়েদের সঙ্গমী মননের স্ট্র্যাটিজি। অন্যদিকে পুরুষদের ক্ষেত্রে প্রায় আট বিলিয়ন ডলারের গড়ে ওঠা পর্নোগ্রাফিক ইন্ডাস্ট্রি পুরুষদের ‘সেক্সবম্ব’ চাহিদার চরমতম রূপ বললে অত্যুক্তি হবে না। সারা দুনিয়া জুড়ে আট বিলিয়ন ডলারের পর্নোগ্রাফি ব্যবসা টিকে আছে পুরুষের লালসা আর জৈবিক চাহিদাকে মূল্য দিয়ে। মেয়েরা কিন্তু কখনোই পর্নোগ্রাফির মূল ক্রেতা নয়, ছিলও না কখনো। ব্রেস্ট ইমপ্ল্যান্ট করা সিলিকোনো গার্লদের নিখুঁত দেহবল্লরী আর যৌনাবেদনময়ী মায়াবী নারীদের আকর্ষণে পুরুষেরা নিশিরাত জেগে থাকে কম্পিউটারের সামনে। পর্নোগ্রাফি দেখা কোনো সত্যিকার যৌনসঙ্গম নয়, তারপরেও পর্নোভিডিও পুরুষদের নিয়ত উত্তেজিত করে তুলে অনেকটা স্টিকেলব্যাক মাছের মতোই যেন। স্টিকেলব্যাক মাছের পুরুষ মাছেরা যেমনিভাবে লালাভ পেটওয়ালা ডামি মাছ থেকে কামার্ত হয়ে পড়েছিল ডকিন্সের ল্যাবে একুরিয়ামের ভেতর, ঠিক তেমনি মানবসমাজের ‘পুরুষ মাছেরা একইভাবে কামার্ত হয়ে পড়ে কম্পিউটারের ভেতর ডামি মডেলদের নগ্নদৃশ্য দেখে! তার মানে, নিজেদের আমরা ‘আশরাফুল মাখলুকাৎ’ বা সৃষ্টির সেরা জীব ভেবে যতই আত্মপ্রসাদ লাভের চেষ্টা করি না কেন, আমরা প্রাণিজগতের বাইরে নই, আমাদের মানসজগৎও তৈরি হয়েছে অন্য প্রাণীদের মতোই যৌনতার নির্বাচনের পথ ধরে, পর্নোগ্রাফি এবং সেক্সবম্বদের প্রতি পুরুষদের উদগ্র আগ্রহ সেই আদিম সত্যকে স্পষ্ট করে তুলে।
.
ছেলেদের পুরুষাঙ্গের আকার এবং প্রকৃতি কি তবে মেয়েদের যৌনতার নির্বাচনের ফল?
প্রেম ভালোবাসা এবং যৌনতায় পুরুষের পুরুষাঙ্গ যে একটা আলাদা জায়গা দখল করে আছে, তা আর নতুন করে বলে দেবার বোধ হয় দরকার নেই। কিন্তু যেটা অনেকের কাছেই অজানা তা হলো, বহু নারী গবেষকই তাদের অভিজ্ঞতা এবং গবেষণা থেকে ইঙ্গিত করেছেন ভালো যৌনসম্ভোগের জন্য পুরুষাঙ্গের আকার সম্ভবত খুব বেশি গুরুত্বপূর্ণ কিছু নয়[১৪২]। কিন্তু তারপরেও বেশ কিছু সমীক্ষায় দেখা গেছে পৃথিবীতে অধিকাংশ পুরুষই তার পুরুষাঙ্গের আকার ‘ছোট’ ভেবে হীনম্মন্যতায় ভুগে থাকে। যেমন, গবেষক জে. লিভার ২০০৬ সালে ৫২৩১ জন পুরুষের উপর গবেষণা চালিয়ে দেখেন[১৪৩], প্রায় সকল পুরুষই প্রত্যাশা করে যে, তার পুরুষাঙ্গ আরেকটু বড় হলেই ভালো হতো। প্রতি এক হাজার জনে মাত্র দুজন অভিমত দিয়েছে পুরুষাঙ্গ ছোট হবার পক্ষে। আরেক গবেষক বি.ই. ডিলন এবং তার দলবল ২০০৮ সালে গবেষণায় দেখান যে, কৈশোর থেকে শুরু করে প্রৌঢ়ত্ব পর্যন্ত সবসময়ই পুরুষদের জন্য পুরুষাঙ্গের ক্ষুদ্র আকার একটি বিশাল উদ্বেগের কারণ[১৪৪]। অনেক পুরুষই আছেন যারা সঙ্গীর সাথে প্রথম যৌন সম্পর্কের আগে এই ভেবে উদ্বিগ্ন থাকে যে, নগ্ন অবস্থায় তার ক্ষুদ্র পুরুষাঙ্গ দেখতে পেয়ে তার সঙ্গীনিশ্চয় যারপরনাই মনঃক্ষুণ্ণ হবে। কিন্তু পুরুষেরা তার নিজের যন্ত্রটি নিয়ে যাই ভাবুন না কেন, মজার ব্যাপার হচ্ছে প্রায় ৮৫ ভাগ নারী মনে করে তার সঙ্গীর পুরুষাঙ্গের আকার তার প্রত্যাশা এবং মাপমতোই আছে[১৪৫]?
সত্যি কথা হলো পুরুষদের পুরুষাঙ্গের “ক্ষুদ্র” আকার নিয়ে হীনম্মন্যতায় ভোগার আসলে কোনো কারণ নেই। মানবসমাজে পুরুষদের পুরুষাঙ্গের গড়পড়তা আকার অন্যান্য প্রাইমেটদের চেয়ে ঢের বড় সুপার সাইজ বলা যায়। আর এই ব্যাপারটা তৈরি হয়েছে নারীর যৌন অভিরুচিকে প্রাধান্য দিয়ে। জিওফ্রি মিলার তার ‘সঙ্গমী মনন’ গ্রন্থের size mattered অংশে পুরুষাঙ্গের আকার নিয়ে নারী বিজ্ঞানীদের সনাতন কিছু ধারণাখণ্ডনকরে অভিমতদিয়েছেন, তারা যেভাবে পুরুষাঙ্গের আকারকেহিসেবের বাইরে রাখতে চেয়েছেন, ব্যাপারটা আসলে এতোটা তুচ্ছ করার মতোনয়। যৌনতার নির্বাচনের মূল জায়গাটিতে আবারো ফেরত যাই। আমরা আগের একটি অংশে দেখেছিলাম নারীর পিনোন্নত স্তন, সুডৌল নিতম্ব আর ক্ষীণ কটিদেশের প্রতি পুরুষদের সার্বজনীন আকর্ষণের কথা, আমরা দেখেছি কীভাবে যৌনতার নির্বাচনের মাধ্যমে পুরুষেরা মেয়েদের দেহের বিভিন্ন বৈশিষ্ট্যকে নির্বাচিত করেছিল, কারণ সে বৈশিষ্ট্যগুলোই হয়ে উঠেছিল তাদের চোখে প্রজনন ক্ষমতা এবং সুস্বাস্থ্যের প্রতীক। এই যৌনতার নির্বাচন কিন্তু একতরফাভাবে হয়নি। আমরা আগেই বলেছি, যৌনতার নির্বাচনকে পুঁজি করে পুরুষ যেমন গড়েছে নারীকে, তেমনি নারীও গড়েছে পুরুষের মানসপটকে এবং তার দেহজ বিভিন্ন বৈশিষ্ট্যকে। এক লৈঙ্গিক বৈশিষ্ট্যগুলোর আবেদন তৈরি করেছে আরেক লিঙ্গের চাহিদা।
