না হাসান সাঈদ পাগলছাগল কিছুই নন, বরং বিবর্তন মনোবিজ্ঞানের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে তিনি নারীর কাছে মেটিং ভ্যালু কমে যাওয়া একজন হীনম্মন্য ঈর্ষাপরায়ণ পুরুষ যার শকুনাচরণ ক্রমশ রূপ নিয়েছিল নিষ্ঠুর পুরুষালি সহিংসতায়। সাঈদ দৃষ্টি প্রতিবন্ধী, সে বুয়েটের পড়ালেখা সে শেষ করতে পারেনি, ইটের ভাটি সিএনজি-সহ বিভিন্ন ব্যবসায় হয়েছে ব্যর্থ। সম্প্রতি শেয়ারেও খেয়েছে লোকসান। অন্যদিকে রুমানা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সফল শিক্ষিকা, ব্রিটিশ কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে মাস্টার্সের শেষ পর্যায়ে। সাম্প্রতিক সময়গুলোতে রুমানার মেটিং ভ্যালুর পারদ সাঈদের চেয়ে অনেক উধ্বগামী। সত্য হোক মিথ্যে হোক সাথে যোগ হয়েছিল ইরানি যুবক তাহের বিন নাভিদ কেন্দ্রিক কিছু ‘রসালো’ উপাখ্যান। সঙ্গী হারানোর ভয়ে ভীত এবং ঈর্ষান্বিত সাঈদ ঝগড়া বিবাদ কলহের স্তর পার হয়ে তার দেহ করে ফেলেছে ক্ষতবিক্ষত। মুক্তমনায় লীনা রহমান রুমানা মঞ্জুর ও নরকদর্শন’ শীর্ষক একটি চমৎকার লেখা লিখেছেন।33। লেখাটিতে সামাজিক বিভিন্ন অসঙ্গতির প্রতি দৃষ্টি নিক্ষেপের পাশাপাশি বিভিন্ন ধর্মীয় বিধিনিষেধ যেগুলো নারীকে অবদমনের ক্রীড়নক হিসেবে ব্যবহৃত হয় সেগুলো নিয়েও প্রাণবন্ত আলোচনা ছিল। কিন্তু সেটাই শেষ কথা নয়। বস্তুত লীনার লেখাটির সাথে সামগ্রিকভাবে একমত হয়েও লেখাটির মন্তব্যে বলতে বাধ্য হয়েছিলাম–
রুমানার উপর অত্যাচারের পেছনে ধর্মের ব্যাপারটা কতটুকু জড়িত তা নিয়ে সন্দেহ আছে আমার। ধর্মের কারণে যে অত্যাচার হয় না তা নয়, অনেকই হয়, তবে রুমানার ক্ষেত্রে ধর্মের চেয়েও প্রবলতর ব্যাপারটি হচ্ছে পুরুষালি জিঘাংসা। নারী যখন স্বাবলম্বী হয়ে উঠে,শিক্ষা দীক্ষা, সংস্কৃতি এবং আর্থিক দিক দিয়ে তার সঙ্গীকে ছাড়িয়ে যায়, বহু পুরুষই তা মেনে নিতে পারে না। উচ্চশিক্ষায় রুমানার সফলতা সাঈদের ক্ষেত্রে তৈরি করেছে এক ধরনের হীনম্মন্যতা,ঈর্ষা আর জিঘাংসা। তারই শিকার রুমানা।
আমার বিশ্লেষণ যে ভুল ছিল না, তা দেখা গিয়েছে জনকণ্ঠে (১৮ই জুন ২০১১) প্রকাশিত প্রাথমিক রিপোর্টে। রিমান্ডের প্রথম দিনেই সাঈদ স্বীকারোক্তি দিয়েছিল– ‘নিজ হীনম্মন্যতা থেকেই রুমানার চোখ উপড়ে ফেলতে চেয়েছি’[১৩৪]।
চিত্র। পেজ ১২১
চিত্র: দু চোখ হারানো রুমানা মঞ্জুর সাংবাদিক সম্মেলনে কথা বলছেন।
রুমানা এপিসোডের আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় এই আলোচনায় আসবে। পুলিশের হাতে দশ দিন পর্যন্ত ধরা ছোঁয়ার বাইরে থাকা এই তথাকথিত স্বামী রত্নটি রুমানার চরিত্র হননে নেমেছিল। ফাঁদা হয়েছিল মিথ্যে প্রেমিকের সাথে এক রসালো গল্প। বাংলাদেশের বিভিন্ন পত্র-পত্রিকাগুলো এগুলো রসালো চাটনির মতোই পরিবেশন করেছে। রাতারাতি কিছু মানুষের সমর্থনও কুড়াতে সক্ষম হলেন সাঈদ। অনেকেই ইনিয়ে-বিনিয়ে বলতে শুরু করলেন ‘এক হাতে তালি বাজে না। নিশ্চয়ই কোনো গড়বড় ছিল। পরে অবশ্য সাঈদ নিজেই স্বীকার করেছিল যে, রুমানার পরকীয়ার গল্পগুলো বানানো, মিথ্যা। আমরা আগেও দেখেছি এ ধরনের ক্ষেত্রে পুরুষদের একটাই অস্ত্র থাকে নির্যাতিত মেয়েটিকে যে কোনো ভাবে খারাপ মেয়ে ‘ হিসেবে প্রতিপন্ন করা। সেই যে ইয়াসমিনকে ধর্ষণ করেছিল পুলিশেরা। এর পরদিন পুলিশেরা যুক্তির জাল বুনে বলেছিল ইয়াসমিন বেশ্যা, খারাপ মেয়ে। যেন খারাপ মেয়ে প্রমাণ করতে পারলে খুন ধর্ষণ, চোখ খুবলে নেওয়া সব জায়েজ হয়ে যায়! আসলে সত্য কথা হলো সাঈদ বুঝতে পেরেছিল খারাপ মেয়ে প্রমাণ করতে পারলে ‘পুরুষতন্ত্রকে সহজেই হাতে রাখা যায়। ওটাই ছিল সাঈদের তখনকার ‘সারভাইভাল স্ট্র্যাটিজি’। সেজন্যই আমরা দেখলাম যে, রুমানাকে নিয়ে আগে বলা পরকীয়ার ব্যাপারগুলো সাঈদ নিজ মুখে অস্বীকার করার আগ পর্যন্ত বেশ কিছু মানুষের সহানুভূতি আদায় করে নিতে পেরেছিলেন সাঈদ। বাজারি পত্রিকা পড়ে তৈরি হওয়া জনমতের একটি বড়ো অংশ সাঈদ দোষ স্বীকারের আগ পর্যন্ত ক্রমাগত সন্দেহের তীর হেনেছে রুমানা মঞ্জুরের দিকে। শুধু পুরুষেরা নয়, এমনকি অনেক নারীও রুমানার প্রতি সন্দেহের ‘অনেক আলামত’ পেয়ে গিয়েছিলেন। এ থেকে কিন্তু বোঝা যায় পুরুষতান্ত্রিক চিন্তাভাবনা কেবল পুরুষদেরই আচ্ছন্ন করেনি, দীর্ঘদিনের কালিক পরিক্রমায় এটি অসংখ্য নারীর মানসপটেও রাজত্ব করেছে এবং এখনও করছে।
হ্যাঁ পুরুষতন্ত্রকে কষে গালি দেয়া সহজ, কিন্তু কেন পুরুষতন্ত্রের মানসপট এভাবে বিবর্তিত হয়েছে তা বিশ্লেষণ করা তেমন সহজ নয়। সহজ নয় এটি বিশ্লেষণে আনা যে পরকীয়া শুনলেই কেন জনচেতনার সহানুভূতিতে আঘাত লেগে যায়, সবাই মরিয়া হয়ে উঠে তার বিপরীতটা প্রমাণ করতে। রুমানার কলঙ্কের কাউন্টার হিসেবে রুমানা কত নিষ্কলঙ্ক আর সতী-সাধ্বী মেয়ে সেটা প্রমাণ করতে আবার কিছু পত্রিকা ফলাও করে প্রচার করতে শুরু করল রুমানা কত মৃদুভাষী ছিলেন, তিনি দিনে পাঁচবেলা নামাজ পড়তেন, মাথায় কাপড় দিয়ে কানাডার প্রতিবেশীদের সাথে দেখা করতেন, সেখানে প্রতিবেশীদের সাথে কত মিষ্টি ব্যবহার তিনি করতেন, কত ভালো রান্না করে তাদের খাওয়াতেন, বিদেশ বিভূঁইয়ে কত ভালোভাবে ইসলামি মতাদর্শ অনুযায়ী জীবনযাপন করতেন, অন্য ছেলেদের সাথে তেমন মিশতেন না, বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাস শেষেই কানাডা থেকে স্বামী সন্তানকে ফোন করার জন্য ছুটে আসতেন, বাইরে একদমই বেরুতেন না ইত্যাদি। এ সবকিছুই আসলে সেই চিরচেনা মানসপটকে তুলে ধরে—নারীকে গড়ে উঠতে হবে পুরুষদের বানানো ছকে—কথাবার্তায় হবে মৃদুভাষী,চলনে-বলনে শান্ত-সৌম, মাথায় কাপড় টেনে চলতে হবে, স্বামীহীনম্মন্যকিংবা নপুংসক যাই হোক না কেন, তাকে নিয়েই থাকতে হবে, তার প্রতি থাকতে হবে সদা অনুগত। অনেকটা বাংলা সিনেমার এই গানটার মতো[১৩৫]—
