স্নাইডারের ঈর্ষাপরায়ণতার মর্মান্তিক বলি হলেন ডরোথি। ভাগ্যের কী নির্মম পরিহাস মৃত্যুর কিছুদিন আগের এক সাক্ষাৎকারে ডরোথি তার সবচেয়ে অপছন্দনীয় বিষয় হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন ঈর্ষাপরায়ণতা! মাত্র বিশ বছর বয়সেই পৃথিবীর সমস্ত রূপ রস ভালোবাসা ছেড়ে অজানার পথে পাড়ি জমাতে হলো ডরোথিকে। স্নাইডার নিজেও আত্মহত্যা করেন ডরোথিকে হত্যার পর পরই। ব্যাপারটিকে সাদা চোখে জিঘাংসার জের বলে মনে হলেও সেটি আরেকটু গভীর বিশ্লেষণের দাবি রাখে। ডরোথি ছিলেন সুন্দরী, কিন্তু নিজের সৌন্দর্য নিয়ে তিনি তেমন সচেতন হয়তো ছিলেন না যখন তিনি ডেইরি কুইন রেস্তরাঁয় পার্ট টাইম কাজ করতেন। প্লেবয় ম্যাগাজিনের বর্ষসেরা প্লে মেট নির্বাচিত হবার পরই তিনি বুঝতে পারেন যে তিনি পরিণত হয়েছেন বহু শিক্ষা দীক্ষা গুণমান সমৃদ্ধ রথী মহারথী পুরুষের হার্টথ্রবে। অর্থাৎ খুব স্বল্প সময়ের মধ্যেই বাজারে ডরোথির ‘মেটিং ভ্যালু’ বেড়ে গিয়েছিল অনেকগুণ। আর অন্যদিকে স্নাইডার ছিলেন চালচুলোহীন, চাকরিবাকরিবিহীন বেকার যুবক। তিনি অর্থবিত্তে বলীয়ান সামাজিক প্রতিপত্তিশালী হেফনার কিংবা পিটার বোগদানোভিচদের সাথে পাল্লা দিয়ে পারবেন কেন? তার মেটিং ভ্যালু ছিল পড়তির দিকে। প্রতিযোগিতায় হেরে যাওয়ার, অর্থাৎ এতদিনের সুন্দরী সঙ্গী ‘হাত ছাড়া হয়ে যাওয়ার আশঙ্কাই ঈর্ষান্বিত করে তুলেছিল স্নাইডারকে। ভিজিলেন্স থেকে তিনি বেছে নিয়েছিলেন ভায়োলেন্সের পথ। বিবর্তন মনোবিজ্ঞানীরা বলেন, বিবর্তনীয় যাত্রাপথে নারীরা পুরুষ সঙ্গীদের এক ধরনের ‘সম্পদ’-এর যোগান হিসেবে চিহ্নিত করে এসেছে[১৩০]। অর্থবিত্ত, ভালো চাকরি, সামাজিক পদমর্যাদা, প্রভাব-প্রতিপত্তি পুরুষদের জন্য খুব বড় ধরনের মেটিং ভ্যালু। কাজেই চাকরি হারানো কিংবা চাকরি না থাকার মানে সম্পদের যোগান বন্ধ। মেয়েরা সঙ্গী নির্বাচনের সময় চাকরিদার এবং সামাজিকভাবে প্রতিপত্তিওয়ালা ছেলেদের পছন্দ করে। এগুলো না থাকলে মেটিং ভ্যালু কমে আসবে। স্নাইডারের ক্ষেত্রে ঠিক এটিই ঘটেছিল। ব্যাপারটাকে সামাজিক স্টেরিওটাইপিং বলে মনে হতে পারে, কিন্তু পুরুষদের জন্য চাকরিবাকরি না করে বেকার বসে থাকাটা কোনো অপশনই নয় বিয়ের বাজারে কিংবা এমনিতেই সামাজিকভাবে, কিন্তু বহু সমাজেই মেয়েদের জন্য তা নয়। আমার ব্যক্তিগত জীবনের উদাহরণ টানি এ প্রসঙ্গে। স্বভাবে আমরা দুজনেই ঘরকুনো হলেও চাপে পড়ে আমাকে আর বন্যাকে মাঝেমধ্যেই কোনো দেশি পার্টিতে যেতে হয় এই আটলান্টায়। অনেক সময়ই নতুন কারো সাথে দেখা হয়, পরিচয়ের এক পর্যায়ে আমাকে জিজ্ঞাসা করা হয়–”ভাই আপনি কোথায় চাকরি করেন?’ বন্যার ক্ষেত্রে ঠিক তা হয় না। তার দিকে প্রশ্ন আসে ‘আপা/ভাবী, আপনি বাসায় থাকেন নাকি চাকরি করছেন?’ এ থেকে বোঝা যায় নারীদের ক্ষেত্রে চাকরি না করাটা একটা অপশন মনে হলেও ‘ভালো স্বামীর ক্ষেত্রে তা হয় না কখনোই, তা তিনি যতই শখের বসে বইপত্তর লিখুন কিংবা ব্লগ করুন! সেজন্যই চাকরি না থাকলে একজন নারী যতটা না পীড়িত হয়, একজন পুরুষকে তার বেকার জীবন পীড়িত করে ঢের বেশি। তারা হয়ে উঠে হতাশাগ্রস্ত এবং সর্বোপরি এই ভঙ্গুর সময়টাতেই তারা সঙ্গী হারানোর ভয়ে হয়ে উঠে চিন্তিত এবং ঈর্ষান্বিত। জীববিজ্ঞানী রবিন বেকার এবং মার্ক বেলিস ইংল্যান্ডে চালানো তাদের একটি গবেষণায় দেখিয়েছেন, একজন বিবাহিত নারী যখন অন্য কোনো পুরুষের সাথে পরকীয়ায় জড়ায়, সেই পুরুষের চাকরির স্ট্যাটাস, প্রতিপত্তি, সামাজিক অবস্থান প্রভৃতি তার বর্তমান স্বামীর চেয়ে সাধারণত বেশি থাকে[১৩১]। অন্য আরেকটি গবেষণায় দেখা গেছে যে, শতকরা ৬৪ ভাগ ক্ষেত্রে একজন পুরুষ তার সঙ্গীকে হত্যা করে যখন সে থাকে চাকরিবাকরিবিহীন একজন বেকার ভ্যাগাবন্ড[১৩২]।
বাংলাদেশের সংবাদপত্র এবং মিডিয়া ছিল আলোচনার তুঙ্গে। ঘটনাটি হলো ব্রিটিশ কলাম্বিয়া ইউনিভার্সিটির গবেষক এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক বিভাগের সহকারী অধ্যাপক রুমানা মঞ্জুর দেশে থাকাকালীন সময়ে তার স্বামী হাসান সাঈদের হাতে রক্তাক্ত হয়েছেন, ক্ষতবিক্ষত হয়েছেন। আঁচড়ে কামড়ে নাক ঠোঁট গালের মাংস খুবলে নেওয়া হয়েছে। চোখে আঙুল ঢুকিয়ে তার চোখ উপড়ে ফেলার চেষ্টা করা হয়েছে। রুমানাকে রক্তাক্ত অবস্থায় উদ্ধার করে বাংলাদেশ এবং ভারতের হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য পাঠিয়েও লাভ হয়নি, রুমানার দুটো চোখই অন্ধ হয়ে গেছে।
হাসান সাঈদের এই ‘পশুসুলভ আচরণে স্তম্ভিত হয়ে গেছে সবাই। কী ভীষণ কুৎসিত মন মানসিকতা থাকলে শুধু সঙ্গীনীকে কেবল মারধোর নয়, রীতিমত নাক কান গাল কামড়ে ছিঁড়ে নেওয়া যায়, আঙুল ঢুকিয়ে চোখ উপড়ে নেওয়ার চেষ্টা করা যায়। পত্রপত্রিকা, ফেসবুক আর ব্লগে চলছিল আলোচনা, প্রতিবাদের ঝড়। কেউ দুষছেন পুরুষতন্ত্রকে, কেউ বা ধর্মকে, কেউ বা আবার দোষারোপ করছেন দেশের আইন-কানুনকে। আবার কিছু মহল থেকে তাকে পাগল প্রতিপন্ন করার চেষ্টাও হয়েছে।
চিত্র। পেজ ১২০
চিত্র : আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের সহকারী অধ্যাপক রুমানা গত ৫ জুন স্বামী হাসান সাঈদের মারাত্মক নির্যাতনের শিকার হন।
