পাশ্চাত্যের মতো আমাদের দেশেও মেয়েদের মধ্যে গয়নাগাটি পছন্দ করার চল আছে। শুধু চল বললে ভুল হবে, বিয়ের সময় কতভরি সোনার গয়না দিয়ে বৌকে কেমনভাবে সাজানো হলো সেটা সবসময়ই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠে। একটা সুযোগ পেলে অনেক মেয়েই বিয়ের সময় শ্বশুরবাড়ি থেকে পাওয়া গয়নাগাটি বন্ধুবান্ধব-আত্মীয়স্বজনদের দেখিয়ে কিংবা কোনো বিয়ে বাড়িতে বা বড় কোনো পার্টিতে গলা কিংবা কানে স্বর্ণালঙ্কারের ঝলক দেখিয়ে সবার মাঝে বাহবা কুড়াতে পছন্দ করে এগুলো আমরা হর-হামেশাই দেখি। কেন পাশ্চাত্যে হীরের আংটি কিংবা আমাদের দেশে সোনার গয়না মেয়েদের এত পছন্দের? এই প্রশ্নটা আমার বরাবরই মনে খচখচ করত। হীরার অঙ্গুরি সোনার গয়নার কোনো ব্যবহারিক উপযোগিতা নেই। ভাত, মাংস, পোলাও-কোরমা খেয়ে যেমন উদরপূর্তি করা যায়, বিলাসবহুল বাড়িতে থেকে গা এলিয়ে দিয়ে আরাম-আয়েশ করা যায়, মার্সিডিস কিংবা রোলস রয়েসে বসে রাজার হালে ঘুরে বেড়ানো যায়, আই ফোনে যেমন সেকেন্ডে সেকেন্ডে কথা বলা যায়, আই প্যাডে যেমন রেস্তোরাঁয় বসে কফির পেয়ালা হাতে নিয়ে ব্রাউস করা যায় হীরা কিংবা সোনার সেরকম কোনো ব্যবহারিক উপযোগিতা কেউ কখনোই খুঁজে পায়নি। অথচ তারপরেও হীরা বা সোনার গয়নার জন্য সুযোগ পেলেই হামলে পড়ে মেয়েরা। আর ছেলেরাও ভালোবাসার প্রমাণ হিসেবে রাজ-রাজ্য চষে হাজির করে প্রায়োগিকভাবে মূল্যহীন কিন্তু নারীর কাছে অমূল্য সেই সব রত্ন পাথর আর সোনা দানা। কিন্তু কেন?
উত্তরটা খুঁজে পেয়েছিলাম অনেক পরে। ডারউইনের সেক্সয়াল সিলেকশন তথা যৌনতার নির্বাচনের মধ্যেই যে এই জটিল প্রশ্নের উত্তর লুকিয়ে ছিল সেটা কি আর আমি তখন জানতাম?
প্রাণিজগৎ থেকেই শুরু করি। যৌনতার নির্বাচনের বহুল প্রচলিত ময়ুরের পেখমের উদাহরণটি আবারো এখানে চলে আসবে। আমরা জানি, ময়ূরের দীর্ঘ পেখম টিকে আছে মূলত নারী ময়ূর বা ময়ূরীর পছন্দ তথা যৌনতার নির্বাচনকে প্রাধান্য দিয়ে। কীভাবে? ১৯৭৫ সালে ইসরাইলি জীববিজ্ঞানী অ্যামোজ জাহাভি (Amtoz Zahavi) প্রস্তাব করলেন যে, ময়ূরীর এই দীর্ঘ পেখম ময়ূরের কাছে প্রতিভাত হয় এক ধরনের ফিটনেস ইন্ডিকেটর’ বা সুস্বাস্থ্যের মাপকাঠি হিসেবে। জাহাবির মতে, সতোর সাথে সুস্বাস্থ্যের বিজ্ঞাপন দিতে গেলে এমন একটা কিছুর মাধ্যমে সেটা প্রকাশ করতে হবে যাতে খরচের প্রাচুর্যটা এমনকি সাদা চোখেও ধরা পড়ে। সোজা ভাষায় সেই বিজ্ঞপ্তি অঙ্গটিকে নিঃসন্দেহে হতে হবে ‘কস্টলি অর্নামেন্ট। ঠিক এজন্যই যৌনতার অলংকারগুলো প্রায় সবসময়ই হয় বেঢপ আকারে বিবর্ধিত, ব্যয়বহুল, অপব্যয়ী কিংবা জবরজং ধরনের জটিল কিছু।
ময়ূরের পেখম কেবল ময়ূরীর দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য সস্তা প্রচারণা নয়। ময়ূরের পেখম দীর্ঘ, ভারী আর ভয়ানক বিপদসঙ্কুল। দীর্ঘ পেখম এত অনায়াসে তৈরি করা যায় না, আর এমনকি এই বেয়াক্কেল পেখমের কারণে তার শিকারিদের চোখে পড়ার সম্ভাবনাও বেড়ে যায় অনেক। বেচারা ময়ূরকে কেবল নিজের দেহটিকেই বয়ে বেড়াতে হয় না, টেনে-হিঁচড়ে নিয়ে বেড়াতে হয় তার পশ্চাৎদেশের সাথে জুড়ে থাকা এই অবিশ্বাস্য বড় ধরনের বাড়তি একটা পেখমের ঝাঁপি (জাহাভির মতে এই বিলাসিতা এমনই দৃষ্টিকটু যে এটা প্রায় পঙ্গুত্বের সামিল, তার তত্ত্বের নামই এজন্য Handicap principle)। এজন্য ময়ুরকে হতে হয় স্বাস্থ্যবান এবং নীরোগ। কখনোসখনো কোনো স্বাস্থ্যহীন ময়ুরের দীর্ঘ পেখম গজাতে পারে বটে, কিন্তু সেটা বয়ে নিয়ে বেড়িয়ে খাবার খোঁজা, কিংবা শিকারিরা তাড়া করলে দ্রুত দোঁড়িয়ে পালিয়ে যাওয়া সেই স্বাস্থ্যহীন ময়ূরের পক্ষে দুঃসাধ্যই হবে। কেবল মাত্র প্রচণ্ড শক্তিশালী কিংবা সুস্বাস্থ্যের অধিকারী ময়ূরের পক্ষেই এই সমস্ত প্রতিবন্ধকতা ডিঙ্গিয়ে এ ধরনের পেখমের বিলাসিতা ধারণ করা সম্ভব হয়।
তাই পেখমওয়ালা বিলাসী ময়ূর ময়ূরীর পালের কাছে গিয়ে সোচ্চারে ঘোষণা করতে পারে—
এই যে মহীয়সী ময়ূরী, আমার ন্যাজের দিকে তাকাও; দেখো-আমি সুস্থ, আমি সুন্দর! আমি এমনই স্বাস্থ্যবান আর শক্তিশালী যে, আমি আমার ষাট ইঞ্চি ব্যাসার্ধের পেখম বয়ে বেড়াতে পারি অবলীলায়। আমি আমার খাদ্য আর দৈহিক পুষ্টিকে সাইফন করে আমার পেখমের আকার-আকৃতিকে তোমারই জন্য বর্ণাঢ্য করে রেখেছি। কোন শিকারি আমাকে পেছনে থেকে আক্রমণ করে পরাস্ত করতে পারে না। ভারী লেজ থাকা সত্ত্বেও আমি উসেইন বোল্টের মতো এক দৌড়ে শিকারিকে পেছনে ফেলে দিতে পারি, আমার রোগ-প্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্দান্ত, আমার দেহ কোনো রোগ জীবাণুর আবাসস্থল নয়। তুমি দেখলেই বুঝবে–উজ্জ্বল পেখম আর অন্য সব কিছুমিলিয়ে আমার সঞ্চিত সম্পদ অঢেল ধন সম্পদ আর প্রাচুর্যে আমি ভরপুর। আমাকে সঙ্গী হিসেবে নির্বাচণকরলে তুমি সুখে থাকবে হেনারী…”।
তাই ময়ূরীকে আকর্ষণের জন্য স্বভাবগতভাবেই ময়ূরকে বিলাসী হতে হয়। আমরা যতই অপচয়কারীকে ‘শয়তানের ভাই’ বলে গালমন্দ করি না কেন, অপচয় এবং ব্যয়বাহুল্য জৈবজগতে যৌনসম্পর্ক গঠনের (sexual courtship) এক অত্যাবশকীয় নিয়ামক। একটা পুরুষ কোকিলকে তার অতিরিক্ত বিশ ভাগ শক্তি ব্যয় করতে নিজের গলাকে সুরেলা করে তুলতে। কারণ এই সুরেলা গলাই তার আকর্ষণের হাতিয়ার। ঠিক একই কারণে হরিণের শিংকে হতে হয় বর্ণাঢ্য, তার প্রয়োজনের চেয়ে ঢের বেশি। তার মানে, যৌনতার নির্বাচনেরমাধ্যমেপ্রজাতির বিবর্তন হতে গেলেঅপচয়প্রবণতার প্রকাশ হতে হবে একরকম অবশ্যম্ভাবী। এটা যে কেউই বুঝবে যে, একটাময়ূর তার পেখমনা থাকলে বরং আরও ভালোভাবে চলে ফিরে বেড়াতে পারত। তার এই বেঢপ পেখমের পেছনে এত শক্তি অপচয় না করে খেয়ে দেয়ে আমোদ-ফুর্তি করে বেড়াতে পারত। পেখমের পিছনে শক্তি খরচ না করে শক্তি সঞ্চয়ে মনোনিবেশ করতে পারত। কিন্তু যৌনতার নির্বাচনী চাপ তাদের মানসজগতে অবিরতভাবে কাজ করে যায় বলেই, সে পেখম গঠনের ব্যাপারে নির্লিপ্তভাবে অপব্যয়ী হয়ে ওঠে; উঠতে তাকে হবেই। বিজ্ঞানীরা বলেন, প্রকৃতিতে দৃষ্টিকটু রকমের অপব্যয়িতাই হচ্ছে সততার সাথে নিজের সম্পদকে অন্যের সামনে তুলে ধরার একমাত্র সহজ মাধ্যম।
