বিজ্ঞানীরা বলেন, বিবর্তনের যাত্রাপথে নারী অভিরুচির ব্যাপারটা গুরুত্বপূর্ণ। নারী অভিরুচির কারণেই পুরুষ ময়ূরের পেখম দীর্ঘ হয়েছে। পুরুষ কোকিলের গলা সুরেলা হয়েছে। পুরুষ বাবুই পাখি শিখেছে মনোরম বাসা বানাতে। নীচে একটি টেবিলের সাহায্যে দেখানোর চেষ্টা করা হলো, কীভাবে নারী অভিরুচিকে প্রাধান্য দিতে গিয়ে বিভিন্ন প্রজাতিতে ব্যয়বহুল অঙ্গপ্রত্যঙ্গ কিংবা নানা অপব্যয়ী বৈশিষ্ট্যের উদ্ভব ঘটেছে[১০৬]—
চিত্র। পেজ ১০১
মানবসমাজেও কি আমরা এরকমের অপব্যয়িতার হাজারো প্রমাণ পাই না? যাদের বেশি টাকা পয়সা আছে, তারা দামি অট্টালিকা বানায়, বনেদি এলাকায় থাকে, রোলস রয়েস কিংবা পাজেরো গাড়ি হাঁকিয়ে বেড়ায়, সৌখিন এবং দামি ডিজাইনার ব্র্যান্ডের পোশাক-আশাক কিংবা জুতো পরে ঘুরে বেড়ায়। বৈষয়িক দিক থেকে চিন্তা করলে এগুলোর কোনোটারই কিন্তু দরকার ছিল না। বরং দামি গাড়ি কিংবা পোশাক-আশাকের পেছনে নিয়মিত অর্থ ব্যয় না করে টাকাগুলো ব্যাংকে তুলে রাখলে অপব্যয়িতার হাত থেকে মুক্ত থাকা যেত, পয়সা কড়িও একটু বেশি জমতো। কিন্তু তাই কি হয়? কোনো পয়সাওয়ালাই কেবল সুইস ব্যাংকে তার সব টাকা পয়সা তুলে রেখে ছেঁড়া গেঞ্জি, পায়জামা আর ছেঁড়া স্যান্ডেল পরে টো-টো করে ঘুরে বেড়ায় না। বরং উলটো নিজের অর্জিত সম্পদের সংকেতকে বস্তুনিষ্ঠভাবে অন্যের কাছে তুলে ধরতে চায় আর রাজপ্রাসাদোপম বাড়ি কিংবা দামি গাড়ি, জুতো জামাকেন্দ্রিক অপব্যয়িতা গুলোই হচ্ছে তাদের জন্য সর্বসাধারণের কাছে সম্পদ প্রকাশের ‘ফিটনেস মার্কার’!
নিজের সম্পদকে তথা ব্যয়বহুল অলংকারগুলোকে সতোর সাথে প্রকাশ করে। নিজের ‘ফিটনেস’কে বিজ্ঞাপিতকরতে চায় সকলেই। সম্পদ বলতে কেবলশুধু বাড়ি গাড়ি, টাকা-পয়সা, জুতো-জামার কথাই আমি বোঝাচ্ছি না, সেই সাথে আমাদের বিজ্ঞাপিত সম্পদের তালিকায় চলে আসবে শিক্ষা, বুদ্ধিবৃত্তি, জ্ঞান, সাহস, দৈহিক শক্তি, সংগীতপ্রতিভা বাকচাতুর্য, সুদর্শন চেহারা, কৃষ্টি, নৃত্যপটুতা, প্রগতিশীলতা, অধিকার সচেতনতা, উদ্ভাবনীশক্তি, দৈহিক সৌন্দর্য, সততা, নৈতিকতা, দয়াপরবশতা, রসিকতা, হাস্যরসপ্রিয়তাসহঅনেক কিছুই। কারণ দীর্ঘদিনের বিবর্তনীয় যাত্রাপথে মানুষ শিখেছে যে এই দৃষ্টিনন্দন গুণাবলিগুলোর প্রতিটিইবিপরীতলিঙ্গের কাছেহয়ে উঠে আকর্ষণের বস্তু, আর সম্ভবত যৌনতার নির্বাচনের পথ ধরেই সেগুলো মানবসমাজেবিকশিত হয়েছে বিপরীত লিঙ্গের বিভিন্ন চাহিদাকে প্রাধান্য দিয়ে। কিন্তু তার পরেও বলতে বাধ্য হচ্ছি এর কোনোটিই বিয়ের সময় হীরার আংটির মতো গুরুত্বপূর্ণ “ভালোবাসারউপঢৌকন হিসেবে উঠে আসেনা। কিন্তু কেন?
চিত্র। পেজ ১০২
চিত্র : যৌনতার নির্বাচন যদি সঠিক হয়ে থাকে তবে, প্রকৃতিতে দৃষ্টিকটু রকমের অপব্যয়িতাই হচ্ছে সতোর সাথে নিজের সম্পদকে অন্যের সামনে তুলে ধরার একমাত্র সহজ মাধ্যম। সেজন্যই কি হীরার আংটি মানবসমাজে এত পছন্দনীয় ‘নাপশাল গিফট’?
হীরার আংটি দিয়ে প্রস্তাব না করে আপনি আপনার প্রেমিকাকে বাজার থেকে একটা আইদাহ আলু কিনে কিংবা সিলেটি কমলালেবু নিয়ে এসে প্রস্তাব করতে পারতেন। যত হাস্যকরই শোনাক না কেন, আলু কিংবা কমলালেবুর ব্যবহারিক উপযোগিতা কিন্তু হীরা কিংবা সোনাদানার চেয়ে অনেক বেশি। ক্ষুধার সময় আলু খেয়ে কিংবা মনের আনন্দে কমলা চিবিয়ে আপনি খিদে দূর করতে পারেন। কিন্তু হীরার আংটি দিয়ে সেসব কিছুই আপনি করতে পারবেন না। কিন্তু তারপরেও বাগদানের রোমান্টিক সময়ে হীরার বদলে আলু নিয়ে হাজির হলে, আপনার কপালে কী দুর্গতি হবে সেটা বোধ হয় না বলে দিলেও চলবে! আলু পটল তো কোনো ছার, এমনকি দামি গাড়ি-বাড়ি, কম্পিউটার, আইফোন কোনোকিছু দিয়েই আপনি বিয়ের সম্পর্ক তৈরি করতে পারবেন না, যদিও এগুলোর সবগুলোরই কিছু না কিছু। ব্যবহারিক উপযোগিতা আছে। রহস্যটি হলো, জাহাভির হ্যাঁন্ডিক্যাপ প্রিন্সিপল অনুযায়ী, বিয়ের প্রস্তাবের (প্রাণিজগতে অবশ্য যৌনসম্পর্কের) উপহার এমন হতে হবে যার কোনো ব্যবহারিক উপযোগিতা নেই (এমনকি ক্ষেত্রবিশেষে তা হতে পারে ময়ূরের পেখমের অপকারী), কিন্তু বিপরীত লিঙ্গের চোখে তা হতে হবে অমূল্য। জৈববিজ্ঞানের পরিভাষায় একে বলে ‘কোর্টশিপ গিফট’ (courtship gift) বা ‘নাপশাল গিফট (nuptial gift)[১০৭,১০৮]। গাড়ি-বাড়ি, আইদাহ আলু কিংবা আইফোন সবকিছুরই ব্যবহারিক কিছু না কিছু উপযোগিতা আছে পুরুষের কাছে। তাই সেগুলো কখনোই ‘কোর্টশিপ গিফট’ হয়ে উঠার যোগ্য নয়। কোর্টশিপ গিফট হতে পারে কেবল হীরা কিংবা স্বর্ণালঙ্কারের মতো অপদ্রব্য গুলোই, যেগুলোর কোনোই ব্যবহারিক উপযোগিতা নেই পুরুষের কাছে, অথচ নারীর মানসপটে সেটি অমূল্য এক ‘ফিটনেস মার্কার’[১০৯]।
গবেষক পিটার সজু এবং রবার্ট সেইমোর ২০০৫ সালের ‘Costly but worthless gifts facilitate courtship’ নামের একটি গবেষণাপত্রে দেখিয়েছেন যে, সম্পর্ক তৈরির ক্ষেত্রে এ ধরনের ‘কোর্টশিপ গিফট’-ই কার্যকরী যা হবে দৃষ্টিকটুভাবে অপব্যয়ী এবং ব্যবহারিকভাবে মূল্যহীন[১১০]। মানবসমাজের বিবর্তনীয় যাত্রাপথে সেজন্যই হীরার আংটি কিংবা স্বর্ণালঙ্কার খুব চমৎকার একটি কোর্টশিপ গিফট হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। একটি কারণ, এর কোনো ব্যবহারিক মূল্য পুরুষের কাছে নেই। কোনো পুরুষই হীরা কিংবা সোনার জন্য লালায়িত থাকে না। হীরা বা সোনা দোকানে নিয়ে বেচে দেয়া ছাড়া একজন পুরুষ কিছুই করতে পারে না। সেটা নিয়ে সে বাঁচতে পারে না, সেটা খেয়ে উদরপূর্তি করতে পারে না, পারে না আমোদিত হতে। কেবল একটি কাজই সে হীরা দিয়ে করতে পারে নারীকে উপহার দিয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করতে, আর ভালোবাসার সম্পর্কের সূচনা করতে হতে পারে সেই সম্পর্ক স্বল্পমেয়াদি কিংবা দীর্ঘমেয়াদি। শোনা যায়, কেউ কেউ নাকি স্বল্পমেয়াদি সম্পর্ক তৈরি করার ক্ষেত্রে হীরার অলংকারের উপর নির্ভর করতেন। চলচ্চিত্রের নায়িকা, গায়িকা, অভিনেত্রী, মডেল থেকে শুরু করে খবর পাঠিকাসহ শোবিজের সাথে যুক্ত বিভিন্ন সুন্দরী ললনাদের শয্যাসঙ্গী করার অভিপ্রায়ে তাদের পৃথিবীর আধুনিক নামিদামি কোম্পানির জুয়েলারি পাঠাতেন। তাদের স্বল্পমেয়াদি সম্পর্ক বা শর্ট-টার্ম স্ট্র্যাটিজির জন্য যে ধরনের বিনিয়োগ করতেন দেখা গেছে, সে ধরনের বিনিয়োগ একই রকম কার্যকরী লং-টার্ম স্ট্র্যাটিজির ক্ষেত্রেও। সেজন্যই বাংলাদেশের বিয়েতে সোনাদানা কিংবা পাশ্চাত্যে হীরার আংটি বৈবাহিক সম্পর্কের সূচনায় এত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠে।
