চুম্বনের রসায়নে নারী পুরুষে কিছুটা পার্থক্য থাকলেও একটি বিষয়ে মিল পাওয়া গেছে। চুম্বন মানসিক চাপ কমাতে সাহায্য করে নারী পুরুষ উভয়েরই। মনোবিজ্ঞানী উইন্ডি হিল এবং তার ছাত্রী কেরি উইলসনের গবেষণা থেকে জানা গেছে চুম্বনের পরে দেহের কর্টিসল (cortisol) হরমোন, যার পরিমাণ মানসিক চাপের মধ্যে থাকলে বৃদ্ধি পায় বলে মনে করা হয়, তার স্তর লক্ষণীয়ভাবে কমে আসে। এর থেকে বোঝা যায় যে, রোমান্টিক চুম্বন আমাদের মানসিকভাবে চাপমুক্ত থাকতে সহায়তা করে।
.
কেন হীরার আংটি কিংবা সোনার গয়না হয়ে উঠে ভালোবাসার উপঢৌকন?
চিত্র। পেজ ৯৬
আমি যখন এই অংশটি বইয়ের জন্য লিখছিলাম তখন প্রিন্স উইলিয়াম এবং কেট সবে বিয়ে করেছেন। মিডিয়ার গরম খবর। এটি তখন। এই একবিংশ শতাব্দীর আধুনিক এবং গণতান্ত্রিক বিশ্বের নাগরিক হিসেবে আমার অবশ্য এই সব অথর্ব রাজা রানি আর তাদের সুপুত্র কিংবা কুপুত্রদের বিয়ে কোনো আগ্রহ ছিল না কখনই। কেবল বিনোদন হিসেবে মাঝে মধ্যে এ ধরনের খবরে চোখ বোলানোই সার হতো। কিন্তু সেসময় গত কয়েকদিন ধরে এইকেট উইলিয়ামের বিয়ে নিয়ে মিডিয়াযাশুরুকরেছিল তাতে আমি রীতিমতো হতভম্ব। সে সময় এই মিডিয়া কাঁপানো বিয়ের একদিন আগে আমেরিকার ওপর দিয়ে বয়ে গেছেসময়কালের ভয়ঙ্করীপ্রলঙ্করী এক ঘূর্ণিঝড়। চারশ’র মতো লোক মারা গিয়েছিল। আলাবামার অবস্থা তো যাচ্ছেতাই, এমনকি আমি যে জর্জিয়াস্টেটেথাকি সেখানকার আশেপাশের বেশকিছুবাড়িঘড় ভেঙেছে, মানুষও মারা গেছে কম বেশি। অথচ সিএনএন-এর মতো সংবাদমাধ্যম সে সময় সেসব কিছু বাদ দিয়ে কেবল কেটআর উইলিয়ামের বিয়ের আয়োজন প্রচার করে চলছিল সারাদিন ধরে যেন পৃথিবীতে এটাই এই মুহূর্তে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু! কেট কোন রাস্তা দিয়ে হেঁটে গেছেন, কীরকম পোশাক পড়েছেন, বিয়ের পরে কীভাবে ব্যালকনিতে পরস্পরকে চুম্বন করলেন, আটটি স্তরের কত বড় আয়তনের কেক ছিল বিয়েতে, কীভাবে তারা জনতার উদ্দেশ্যে হাত নাড়লেন–এগুলো নিয়ে বিশ্লেষণের পর বিশ্লেষণ চলছে। অবশ্য মিডিয়ার আর কী দোষ। আমার মতো আদার ব্যাপারীর এই রাজকীয় বিয়ে নিয়ে আগ্রহ না থাকলেও সাড়া বিশ্বের মানুষের আগ্রহের কমতি দেখছি না! ৫০০০ পুলিশ অফিসারসহ আর্মি নেভি আর এয়ারফোর্সের নিয়োগদান সহ কেবল নিরাপত্তা রক্ষার জন্যই নাকি খরচ হয়েছে প্রায় ৩৫ মিলিয়ন ডলার। কাজেই পুরো বিয়ের আয়োজনের খরচ কত হতে পারে সহজেই অনুমেয়। নিঃসন্দেহে এই বিশাল খরচের বড় একটা অংশের ব্যয়ভার বহন করতে হয় সেই জনগণকেই। তাতেও যে কারো কোনো আপত্তি আছে তা মনে হচ্ছে না। খোদ বাকিংহাম প্যালেসের বাইরেই নাকি প্রায় ৫০০,০০০ মানুষ জমায়েত হয়েছিল বর-বধূকে একনজর দেখার জন্য। কাজেই এই অপব্যয়িতাকে সাদরে গ্রহণ করার ব্যাপারে নিরাসক্ত হলে আপনিও আমার মতো বিবর্তনীয়ভাবে ‘মিসফিট’ বলে বিবেচিত হয়ে যাবেন!
চিত্র। পেজ ৯৭
চিত্রঃ ক্যারট হীরার আংটিটি উইলিয়াম কেট কে বাগদানের সময় উপহার দিয়েছেন, তার মূল্যমান। খোলাবাজারে প্রায় আকাশ ছোঁয়া।
তাই আমার মতো বিবর্তনীয়ভাবে মিসফিটহবার হাত থেকে বাঁচতে হলে দুচারটি কথা জেনে রাখতে পারেন। প্রিন্স উইলিয়াম তার হবু বধূ কেট মিডেলটনকে বিয়ের প্রস্তাব দেন আট বছর ধরে প্রেম করার পর ২০১০ সালের নভেম্বরের ১৬ তারিখ। প্রায় ৮ ক্যারট হীরার আংটিটি উইলিয়াম কেট কে সে সময় উপহার দিয়েছেন, সেটি একসময় তার মা প্রিন্স ডায়না পরতেন। কাজেই আংটিটি নিয়ে উইলিয়ামের আবেগ সহজেই অনুমেয়। তিনি সেটা মিডিয়ায় বলেছেনও–এটা আমার মায়ের বিয়ের অঙ্গুরি। কাজেই এটা আমার কাছে অবশ্যই বিশেষ কিছু। আমি চাই যে আমার মার স্মৃতি আমার বিয়ের সময় অক্ষুণ্ণ থাকুক। কাজেই এই আংটির পেছনে এত আবেগময় স্মৃতি জড়িত যে, কখনো যদি এই আংটি নিলামে উঠে, তবে পৃথিবীর সবচেয়ে ধনী ব্যক্তিরাও এই আংটিটি কেনার জন্য দরদাম করতে ভয় পাবেন। এমনকি যদি শুধু হীরার মূল্যমান হিসেবেও বিচার করি, তাহলেও খোলাবাজারে এ ধরনের আংটি ২০০,০০০ থেকে ২৫০,০০০ ডলার পর্যন্ত হতে পারে।
কিন্তু কেন এত ব্যয়বহুল বিনিয়োগ? হয়তো ভাবছেন রাজারাজড়াদের ব্যাপারস্যাপারই আলাদা। তারা যদি হীরার আংটি নিয়ে লালায়িত না হন, তো হবে কে? কিন্তু আপনি খুঁজলেই দেখতে পাবেন, সাধারণদের মধ্যেও হিরের আংটি নিয়ে বিহ্বলতা কম নয়।
আমার অফিসের এক বান্ধবী প্রায় ৩/৪ ক্যারেটের এক ডায়মন্ডের রিং পরে অফিসে আসে (যদিও ওটা সত্যিকারের হীরা কি না আমার কিছুটা সন্দেহ আছে)। হীরকখচিত আঙুল দুলিয়ে দুলিয়ে এমনভাবে কথা বলে যে, হীরার আংটিটার দিকে যে কারো নজর যেতে বাধ্য। আর সুযোগ পেলেই সে সবাইকে শুনিয়ে ফেনিয়ে ফেনিয়ে গল্প শোনায়—কোন সাত সাগর পাড়ি দিয়ে কোন হীরক রাজার দেশ থেকে তার প্রেমিক এই বিশাল এই হীরার আংটি বানিয়ে নিয়ে এসেছিল, আর কত রোমান্টিকভাবে তাকে বিয়ের প্রস্তাব করেছিল!
আমার অফিসের আরেক কলিগ গ্রাজুয়েশন করে নতুন চাকরি শুরু করেছে। কিন্তু বেচারা গার্লফ্রেন্ডকে বিয়ে করতে পারছে না, কারণ গার্লফ্রেন্ডকে তুষ্ট করার মতো হীরের আংটি কেনার সামর্থ নাকি এখনও অর্জন করতে পারেনি। তার গার্লফ্রেন্ড নাকি এমনিতে খুব ভালো, কোনো কিছুই চায় না তার কাছে, কিন্তু একটি কথা নাকি সম্পর্কের প্রথমেই তাকে বলে দিয়েছে বাগদানের সময় যেনতেন হীরের আংটি হলে কিন্তু তার চলবে না। এমন আংটি দিয়ে তাকে প্রপোজ করতে হবে যেন সেটা সবাইকে দেখিয়ে বাহবা কুড়াতে পারে। বেচারা বয়ফ্রেন্ডটি এখন চোখ কান বুজে চাকরি করছে, টাকা জমাচ্ছে। ওভারটাইম করে টু-পাইস একটু বেশি কামানো যায় কি না–তার নানা ফন্দি ফিকির খুঁজে বের করার চেষ্টা করছে। হীরের আংটি দিয়ে প্রেমিকার মন তুষ্ট করতে হবে না!
