তবে চুম্বনের রসায়নে নারী পুরুষে কিছুটা পার্থক্য লক্ষ করা গেছে। ২০০৭ সালের সেপ্টেম্বর মাসে অধ্যাপক গ্যালোপ এবং তার সহকর্মীরা ১০৪১ জন কলেজ ছাত্র-ছাত্রীর উপর গবেষণা চালান। তাদের গবেষণা থেকে পাওয়া গেছে, তীব্র চুম্বন পুরুষদের জন্য আবির্ভূত হয় যৌনসম্পর্ক সূচিত করার পরবর্তী ধাপ হিসেবে। কিন্তু অন্য দিকে মেয়েরা চুম্বনকে গ্রহণ করে সম্পর্কের মানসিক উন্নয়নের একটি সুস্থিত পর্যায় হিসেবে[১০২]।
গ্যালপের গবেষণায় আরও দেখা গেছে চুম্বনের ব্যাপারটা ছেলেদের চেয়ে মেয়েদের কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে প্রতিভাত হয়। মেয়েদের কাছে ব্যাপারটা গুরুত্বপূর্ণই শুধু নয়, অধিকাংশ মেয়েরা চুম্বন ছাড়া এমনকি সঙ্গীর সাথে যৌনসম্ভোগে অস্বীকৃত হয়। কিন্তু ছেলেদের ক্ষেত্রে ব্যাপারটা এতখানি প্রকট নয়। ছেলেদের কাছে একটা সময় পর চুমু খাওয়া না খাওয়া তেমন বড় হয়ে উঠে না– চুমুটুমু না খেয়ে হলেও কোনো আকর্ষণীয় মেয়ের সাথে যৌনসম্ভোগ করতে পারলে ছেলেদের জন্য তাতেই সই! সমীক্ষায় দেখা গেছে কেউ “গুড কিসার’ না হওয়া সত্ত্বেও মেয়েদের চেয়ে অধিক সংখ্যক ছেলেরা তার সাথে যৌনসম্পর্ক স্থাপনে আগ্রহী হয়।
মেয়েদের জন্য চুম্বন বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠার পেছনে কিছু বিবর্তনীয় কারণ রয়েছে বলে মনে করা হয়। বিবর্তনের পথিকৃত চার্লস ডারউইন যৌনতার নির্বাচন তত্ত্বনিয়ে গবেষণা করতে গিয়ে খেয়াল করেছিলেন যে, প্রকৃতিতে প্রায় সর্বত্রই মেয়েরা সঙ্গী নির্বাচনের ব্যাপারে খুব বেশি হিসেবি, সাবধানী আর খুঁতখুঁতে হয়ে থাকে। এই ব্যাপারটি জীববিজ্ঞানে পরিচিত ‘নারী অভিরুচি (female choice) হিসেবে। ডারউইনের সময়ে ডারউইন ব্যাপারটি পর্যবেক্ষণ করলেও এই নারী অভিরুচির পেছনের কারণ সম্পর্কে তিনি কিংবা তার সমসাময়িক কেউ ভালোভাবে অবহিত ছিলেন না। কিন্তু পরবর্তীকালের জীববিজ্ঞানী এবং বিবর্তন মনোবিজ্ঞানীদের গবেষণায় এর পেছনের কারণটি আরও স্পষ্টভাবে বোঝা যেতে শুরু করে। বিশেষত বিখ্যাত সামাজিক জীববিজ্ঞানী রবার্ট ট্রাইভার্সের ১৯৭২ সালের গবেষণা এ ব্যাপারে একটি মাইলফলক[১০৩]। ট্রাইভার্স তার গবেষণায় দেখান যে, প্রকৃতিতে (বিশেষতঃ স্তন্যপায়ী জীবের ক্ষেত্রে) সন্তানের জন্ম এবং লালন পালনের ক্ষেত্রে পুরুষের চেয়ে নারীরাই বেশি শক্তি বিনিয়োগ করে। গর্ভধারণ, সন্তানের জন্ম দেয়া, স্তন্যপান করানো সহ বহু কিছুতে মেয়েদেরকেই সার্বিকভাবে জড়িত হতে হয় বলে মেয়েদের তুলনামূলকভাবে অধিকতর বেশি শক্তি খরচ করতে হয়। ভবিষ্যৎ জিন বা পরবর্তী প্রজন্ম রক্ষায় মেয়েদের এই অতিরিক্ত বেশি শক্তি খরচের ব্যাপারটা স্তন্যপায়ী সকল জীবদের জন্যই কমবেশি প্রযোজ্য। জীববিজ্ঞানের পরিভাষায় একে বলে ‘অভিভাবকীয় বিনিয়োগ’ (parental investment)। মানুষও একটি স্তন্যপায়ী প্রাণী। একবিংশ শতাব্দীর আধুনিক জীবনযাত্রায় অভ্যস্ত হবার পরেও নির্দ্বিধায় বলা যায় মেয়েরাই অভিভাবকীয় বিনিয়োগের সিংহভাগে জড়িত থাকে। যেহেতু পুরুষদের তুলনায় নারীদের অভিভাবকীয় বিনিয়োগের সিংহভাগে জড়িত থাকতে হয়, তারা যৌনসঙ্গী নির্বাচনের ব্যাপারে হয়ে উঠে অধিকতর হিসেবি এবং সাবধানী। বিবর্তনীয় পথপরিক্রমায় মেয়েরা সঙ্গী নির্বাচনের ব্যাপারে অধিকতর সাবধানী হতে বাধ্য হয়েছে, কারণ অসতর্কভাবে দুষ্ট-সঙ্গী নির্বাচন করলে অযাচিত গর্ভধারণ সংক্রান্ত ঝুট-ঝামেলা পোহাতে হয় নারীকেই। ডেভিড বাস তার ‘Human Mating Strategies শীর্ষক গবেষণাপত্রে সেজন্যই লিখেছেন[১০৪]—
বিবর্তনীয় যাত্রাপথে যে সকল মেয়েরা হিসেবি কিংবা সাবধানী ছিল না, তারা খুব কমই প্রজননগত সফলতা (reproductive success) অর্জন করতে পেরেছে। কিন্তু যারা অত্যন্ত সতর্কতার সাথে শয্যাসঙ্গী নির্বাচন করতে পেরেছে, যেমন যৌনসঙ্গী নির্বাচনের সময় গুরুত্ব দিয়ে চিন্তা করেছে তার সঙ্গী সঙ্গমের পরই পালিয়ে না গিয়ে তার সাথেই থাকবে কিনা, বাবা হিসেবে তার ভবিষ্যৎ সন্তানের দেখভাল করবে কিনা, সন্তান এবং পরিবারের পরিচর্যায় বাড়তি বিনিয়োগ করবে কি না ইত্যাদি–সে সমস্ত সতর্ক মেয়েরাই সফলভাবে প্রজননগত উপযোগিতা উপভোগ করতে পেরেছে। কাজেই ট্রাইভার্সের দৃষ্টিকোণ থেকে জীবজগতে প্রজাতির প্রজননগত সাফল্য এবং সফলভাবে প্রজন্ম টিকিয়ে রাখার মূলে রয়েছে সেই প্রজাতির নারীদের সতর্ক সঙ্গী নির্বাচনী অভিরুচি (careful mate choice)।
কাজেই যৌনসঙ্গীর ব্যাপারে নারীদের সতর্ক থাকতে হয়, কারণ ভুল সঙ্গীকে নির্বাচনের মাশুল হতে পারে ভয়াবহ। অন্তত একজন নারীর জন্য চুম্বন হয়ে উঠে সঙ্গী বাছাইয়ের একটি অবচেতন প্রক্রিয়া, যার মাধ্যমে সে নির্ণয় করতে চেষ্টা করে তার সঙ্গী তার ভবিষ্যৎ সন্তানের অভিভাবকীয় বিনিয়োগে অবদান রাখবে কি না কিংবা তাদের সম্পর্কের ব্যাপারে অঙ্গীকারাবদ্ধ (committed) কি না ইত্যাদি[১০৫]। আর আগেই বলা হয়েছে, চুমুর মাধ্যমে MHC জিনের মধ্যকার ভালোবাসার সংকেতগুলো পৌঁছে যায় মস্তিষ্কে। পুরুষের লালাগ্রন্থিতে যে সমস্ত যৌন হরমোনের উপস্থিতি থাকে, সেটার উপাত্তই চুমু বিশ্লেষণের জন্য বয়ে নিয়ে যায় মস্তিষ্কে।
