চিত্র। পেজ ৯০
চিত্র: যারা অ্যাকুরিয়ামে গোরামি মাছ পালেন, তারা প্রায়শই এধরনের চুম্বনলীলা দেখতে পান। এই আচরণের জন্য এধরনের মাছদের ‘কিসিং গোরামি’ নামে ডাকা হয়।
তবে কিসিং গোরামিদের চুম্বন আসলে ‘সত্যিকার চুম্বন নয়। এদের চুম্বন আসলে এক ধরনের দ্বন্দ্বযুদ্ধের স্বরূপ, যার মাধ্যমে তারা প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার চেষ্টা করে; আর সাধারণ মানুষের কাছে ব্যাপারটা চুম্বন হিসেবে প্রতিভাত হয়। কুকুর, বিড়াল এবং পাখিদের মধ্যে মুখ দিয়ে অবলেহন (licking) এবং পরিচ্ছন্নতা (grooming) নির্দেশক অনেক কিছু করতে দেখা যায়, যা অনেক সময়ই অনেকের কাছে ভুলভাবে চুম্বন বলে মনে হতে পারে। সেই দিক থেকে চিন্তা করলে মানুষের মধ্যে চুম্বনের ক্ষেত্র অনেকটাই ভিন্ন।
চিত্র। পেজ ৯১
চিত্র : ফরাসি স্থপতি অগুস্ত রদ্যাঁর (Auguste Rodin) একটি বিখ্যাত স্থাপত্যকর্ম– The Kiss। আমি আর বন্যা প্রথমবার ২০০২ সালে। প্যারিসে গিয়ে রদ্যাঁর এই অদ্ভুত সুন্দর স্থাপত্যকর্মটি দেখে নির্বাক হয়ে তাকিয়ে ছিলাম অনেকক্ষণ!
তাহলে মানবসমাজে চুম্বনের শুরুটা কোথায়, আর কীভাবে? বলা আসলেই মুশকিল। তবে, ১৯৬০ সালে ইংরেজ প্রাণিবিজ্ঞানী ডেসম মরিস প্রথম প্রস্তাব করেন যে, চুম্বন সম্ভবত উদ্ভূত হয়েছে আমাদের পূর্বপুরুষ প্রাইমেট মায়েদের খাবার চিবানো আর সেই খাবার অপরিণত সন্তানকে খাওয়ানোর মাধ্যমে। শিম্পাঞ্জি মায়েরা এখনও এভাবে সন্তানদের খাওয়ায়, আমাদের পূর্বপুরুষদের মধ্যেও ব্যাপারটা ঠিক এভাবেই এবং এ কারণেই তৈরি হয়েছিল। মনে করা হয় খাদ্যস্বল্পতার সময়গুলোতে যখন সন্তানকে খাবার যোগাতে পারত না, তখন অসহায় সন্তানকে প্রবোধ দিতে এভাবে মুখ দিয়ে খাবার খাওয়ানোর ভান করে সান্ত্বনা দিত স্নেহবৎসল মায়েরা। এভাবেই একটা সময় চুম্বন মানব বিবর্তনের একটি অংশ হয়ে উঠে, এর পরিধি বৃদ্ধি পায় সন্তানের প্রতি ভালোবাসা থেকে প্রেমিক প্রেমিকার রোমান্টিকতায়, যার বহুবিধ অভিব্যক্তি আমরা লক্ষ্য করি মানবসমাজের বিভিন্ন সংস্কৃতিতে আনাচে কানাচে, নানাভাবে।
তবে আজকের দিনের চিরচেনা তীব্র রোমান্টিক প্রেমের সাথে চুম্বনের জৈববৈজ্ঞানিক তথা বিবর্তনীয় উৎস খুঁজতে গেলে আমাদের বের করতে হবে চুমু খাওয়ার এই মাধ্যমটি সম্পর্ক তৈরি এবং টিকিয়ে রাখার ব্যাপারে কোন ধরনের বাড়তি উপযোগিতা কখনো দিয়েছিল কি না, এবং এখনও দেয় কি না। এ নিয়ে গবেষণা করতে গিয়ে বিজ্ঞানীরা বেশ কিছু চাঞ্চল্যকর তথ্য পেয়েছেন। যেমন, নিউইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয়ের বিবর্তনীয় মনোবিজ্ঞানী গর্ডন জি গ্যালোপের (Gordon G. Gallup) গবেষণা থেকে জানা গেছে, চুম্বন মানবসমাজে মেটিং সিলেকশন বা যৌনসঙ্গী নির্বাচনে এক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে[১০০]। বিশেষ করে প্রথম চুম্বন ব্যাপারটা রোমান্টিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে খুব গুরুত্বপূর্ণ সমীকরণ হিসেবে অনেকের জীবনেই উঠে আসে বলে মনে করা হয়। সাধারণত প্রথম প্রেম কিংবা প্রথম যৌনসঙ্গমের মতো প্রথম চুম্বনের ঘটনাও প্রায় সবাই হাজারো ঘটনার ভিড়ে মনের স্মৃতিকোঠায় সযত্নে জমিয়ে রাখে স্থায়ীভাবে। মহাকবি কায়কোবাদের একটা চমৎকার কবিতা আছে প্রথম চুম্বন নিয়ে–
মনে কি পড়ে গো সেই প্রথম চুম্বন!
যবে তুমি মুক্ত কেশে
ফুলরানি বেশে এসে,
করেছিলে মোরে প্রিয় স্নেহ-আলিঙ্গন!
মনে কি পড়ে গো সেই প্রথম চুম্বন?
প্রথম চুম্বন!
মানব জীবনে আহা শান্তি-প্রস্রবণ!
কত প্রেম কত আশা,
কত স্নেহ ভালোবাসা,
বিরাজে তাহায়, সে যে অপার্থিব ধন!
মনে কি পড়ে গো সেই প্রথম চুম্বন!
হায় সে চুম্বনে
কত সুখ দুঃখে কত অশ্রু বরিষণ!
কত হাসি, কত ব্যথা,
আকুলতা, ব্যাকুলতা,
প্রাণে প্রাণে কত কথা, কত সম্ভাষণ!
মনে কি পড়ে গো সেই প্রথম চুম্বন!
সে চুম্বন, আলিঙ্গন, প্রেম-সম্ভাষণ,
অতৃপ্ত হৃদয় মূলে।
ভীষণ ঝটিকা তুলে,
উন্মত্ততা, মাদকতা ভরা অনুক্ষণ,
মনে কি পড়ে গো সেই প্রথম চুম্বন!
তবে কায়কোবাদ প্রথম প্রেমের মাহাত্ম নিয়ে যতই কাব্য করুক না কেন, প্রকৃত বাস্তবতা একটু অন্যরকম। বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্ডারগ্র্যাড ছাত্রদের উপর গবেষণা চালাতে গিয়ে গবেষকেরা দেখেন, অন্তত ৫৯ ভাগ ছাত্র এবং প্রায় ৬৬ ভাগ ছাত্রীরা স্বীকার করেছে যে তাদের জীবনে প্রথম চুম্বন’-এর পর পরেই সঙ্গীর প্রতি আগ্রহ রাতারাতি উবে গেছে। এমন নয় যে সেই সব খারাপ চুমু আসলেই খুব খারাপ ছিল। কিন্তু প্রথমবার চুম্বনের পরেই তাদের সবারই মনে হয়েছিল কোথায় যেন মিলছে না–সামথিং ইজ নট রাইট! গর্ডন জি গ্যালোপের অভিমত এ ক্ষেত্রে প্রণিধানযোগ্য[১০১]–
While many forces lead two people contact romantically, the kiss, particularly the first kiss, can be a deal breaker.
কিন্তু কেন এমন হয়? সেটাই ব্যাখ্যা করছেন বিজ্ঞানীরা। আমরা যে আগের অংশে ফেরোমোন এবং MHC জিনের সাথে পরিচিত হয়েছিলাম, দেহজ গন্ধের মাধ্যমে সেখানকার ভালোবাসার সংকেতগুলো পৌঁছে যায় মস্তিষ্কে। ঠিক এমনটাই ঘটে চুম্বনের ক্ষেত্রেও। অর্থাৎ চুমুর মাধ্যমে সঙ্গীর বংশগতীয় কম্প্যাটিবিলিটির খোঁজ পায় মানব মস্তিষ্ক। অর্থাৎ সোজা বাংলায়, সঠিক চুমু মানসিকভাবে সঠিক যৌনসঙ্গীকে খুঁজে নিতে সহায়তা করে। চুম্বনের পর যদি কায়কোবাদের মতো সেই “আহা শান্তি প্রস্রবণ” কিংবা “ভীষণ ঝটিকা তুলে, উন্মত্ততা, মাদকতা ভরা অনুক্ষণ’ আসে আপনার কাছে তাহলে বুঝতে হবে, আপনার মস্তিষ্ক ইঙ্গিত করছে আপনার সঙ্গী বংশগতীয় ভাবে আপনার জন্য সঠিক। আপনার জৈবিক দেহ আপনার সঙ্গীর দ্বারা নিরুপদ্রুপভাবে গর্ভধারণ করার জন্য নির্বাচিত হয়েছে! আর যদি চুম্বনের পর মনে হয় কোথায় যেন মিলছে না’ তাহলে বুঝতে হবে যে, আপনার সঙ্গীর MHC জিনের বিন্যাস আপনার জন্য কম্পিটেবল নয়।
