তবে পাঠকদের নিশ্চয় বুঝতে দেরি হবার কথা নয় যে, কেবল জেনেটিক ম্যাচ বা বংশগতীয় জুড়ির উপর নির্ভর করে সঙ্গী নির্বাচনের চেষ্টা খুব বেশি সফল হওয়ার কথা নয়, কারণ মানব সম্পর্ক এমনিতেই অন্য প্রাণীর চেয়ে অনেক জটিল। মানুষের সম্পর্কের স্থায়িত্ব জিনের বাইরেও অনেক বেশি নির্ভরশীল পরিবেশ এবং সম্পর্কের সামাজিকীরনের উপর। সেজন্যই দেখা যায় অনেক সময় বংশগতীয় পরীক্ষায় আশানুরূপ ফলাফল না আশা সত্ত্বেও অনেকের ক্ষেত্রেই সম্পর্ক তৈরি এবং বিকাশে সমস্যা হয়নি, কেবল সামাজিক উপাদানগুলোর কারণেই। তারপরেও অনেক বিজ্ঞানী মনে করেন বংশগতীয় ব্যাপারটা মিলে গেলে সম্পর্ক তৈরিতে সেটা অনুকূল প্রভাব আনতে পারে ভবিষ্যৎ পৃথিবীতে সঙ্গী নির্বাচনের ক্ষেত্রে। ক্লাউস ওয়াইন্ড, ক্যারোল ওবার, তামারাব্রাউন সহ অনেক বিজ্ঞানীই মনে করেন, আমাদের ডিএনএতে প্রকাশিত এই ভালোবাসার সংকেতগুলো শেষ পর্যন্ত ফেরোমোন প্রবাহের মাধ্যমেই আমাদের মস্তিকে পৌঁছায়, যার ভিত্তি মূলত লুকিয়ে আছে সঙ্গীর গায়ের গন্ধের মধ্যেই। সেজন্যই বিলিয়ন ডলারের ম্যাচমেকিং সাইটগুলো এখন ভালোবাসার রসায়ন বুঝতে ডিএনএ বিশ্লেষণ এবং সর্বোপরি গায়ের গন্ধ নিয়েও আগ্রহী হয়ে পড়েছে। সাম্প্রতিক বৈজ্ঞানিক গবেষণাগুলো থেকে প্রাপ্ত তথ্য থেকে আমরা জানতে শুরু করেছি যে, আর সব প্রাণীর মতো মানুষও অবচেতন মনেই গন্ধ শোঁকার মাধ্যমে সঙ্গী বাছাইয়ের কাজটি করে থাকে। কথিত আছে, ১৫ শতকে ফ্রান্সের সম্রাট তৃতীয় হেনরীর শাসনামলে সম্রাটের আমন্ত্রণে মারিয়া নামে এক নর্তকীরাজপ্রাসাদে নাচতে এসেছিল। শোনা যায়, নাচ শেষ হবার পর ঘর্মাক্ত শরীর একটি তোয়ালে দিয়ে মুছে মারিয়া সম্রাটের দিকে ছুড়ে দেয়। সম্রাট সেই তোয়ালে পেয়ে ‘ভালোবাসার গন্ধে এমনই বিমোহিত হন, যে মারিয়াকে আর প্রাসাদ থেকে যেতে দেননি, তাকে সম্রাজ্ঞী হিসেবে বরণ করে নিয়েছিলেন। অবশ্য বলা বাহুল্য, আমাদের মতো অধিকাংশ ছা-পোষা মানুষের ক্ষেত্রে এই ধরনের গন্ধকেন্দ্রিক পছন্দগুলো সম্রাট হেনরীর এত প্রকটভাবে দৃশ্যমান নয়। আর আগেই বলেছি, গন্ধের মাধ্যমে পছন্দের এই ব্যাপারটি আসলে সচেতন ভাবে নয়, বরং প্রবৃত্তিগতভাবেই ঘটে, এবং এটি উদ্ভূত হয়েছে বিবর্তনেরই ক্রমিক ধারায়।
প্রতি অঙ্গ কাঁদে তব প্রতি অঙ্গ-তরে।
প্রাণের মিলন মাগে দেহের মিলন।
হৃদয়ে আচ্ছন্ন দেহ হৃদয়ের ভরে।
মুরছি পড়িতে চায় তব দেহ-’পরে।
তোমার নয়ন পানে ধাইছে নয়ন,
অধর মরিতে চায় তোমার অধরে।
দেহমিলন নামে চতুষ্পদী কবিতার শুরুতে কবিগুরু উপরের যে চরণগুলো লিখেছেন, তা যেন প্রেম ভালোবাসার একেবারে মোদ্দা কথা–”অধর মরিতে চায় তোমার অধরে’! সত্যই তো। চুমুবিহীন প্রেম যেন অনেকটা লবনহীন খিচুড়ির মতোই বিস্বাদ!
তাই ভালোবাসার কথা বললে অবধারিতভাবেই চুমুর কথা এসে পড়বে। ভালোবাসা প্রকাশের আদি এবং অকৃত্রিম মাধ্যমটির নাম যে চুম্বন সেই বিষয়ে সম্ভবত কেউই দ্বিমত করবেন না। কাজেই কেন কবিগুরুর কথামতো আমাদের অধর মরিতে চায় অন্যের অধরে তার পেছনের বিজ্ঞানটি না জানলে আমাদের আর চলছে না।
বাঙালি, আফগানি, জাপানিজ, মালয় থেকে শুরু করে পশ্চিমা সংস্কৃতি সব জায়গাতেই প্রেমের বহিঃপ্রকাশ হিসেবে চুম্বন পাওয়া যাবে। সংস্কৃতিভেদে চুম্বনের তারতম্য আর ভেদাভেদ আছে ঠিকই—কোথাও প্রেমিক প্রেমিকাকে কিংবা প্রেমিকা প্রেমিককে চুমু খায় গোপনে, কোথাও বা প্রকাশ্যে, কারো চুম্বন শীতল, কারোটা বা উদগ্র, কেউ ঘার কাৎ করে চুমু খায় কেউ বা খায় মাথা সোজা রেখে। কিন্তু চুম্বন আছেই মানবসভ্যতার সাথে অঙ্গাঙ্গিভাবে মিশে[৯৭]। তাই চুম্বনের বিবর্তনীয় উৎসটি আমাদের জানা চাই।
আর শুধু মানুষই নয়, অনেকে জেনে হয়তো অবাক হবেন, চুমুর অস্তিত্ব রয়েছে এমনকি অন্যান্য অনেক প্রাণীর মধ্যেই[৯৮]। ইঁদুর, কুকুর, বিড়াল, পাখি থেকে শুরু করে শিম্পাঞ্জি, বনোবো সহ বহু প্রাণীর মধ্যেই চুম্বনের অস্তিত্ব লক্ষ করা গেছে। এ সমস্ত প্রাণীদের কেউ বা চুমু খায় খাদ্য বিনিময় থেকে শুরু করে আদর সোহাগ বিনিময় এমনকি ঝগড়া-ফ্যাসাদ মেটাতেও। বিজ্ঞানী বিজ্ঞানী ফ্রান্স ডি ওয়াল তার প্রাইমেট সংক্রান্ত বিভিন্ন গবেষণায় দেখিয়েছেন চুম্বনের ব্যাপারটা মানবসমাজেরই কেবল একচেটিয়া নয়, আমাদের অন্য সকল জ্ঞাতিভাই প্রাইমেটদের মধ্যেও তা প্রবলভাবেই দৃশ্যমান।
চিত্র। পেজ ৮৯
চিত্র: চুম্বনের ব্যাপারটা মানবসমাজেরই। কেবল একচেটিয়া নয়, প্রাইমেট এবং নন প্রাইমেট অনেক প্রাণীর মধ্যেই চুম্বনের অস্তিত্ব দেখা যায়। ছবিতে প্রেইরি কুকুর নামে খ্যাত একধরনের ইঁদুরের মধ্যকার চুম্বন।
চিত্র। পেজ ৯০
চিত্র:দুটি শিম্পাঞ্জির মধ্যকার চুম্বন দেখানো হয়েছে।
কেউ কি কবুতরের চুমু খাওয়া দেখেছেন? ওরা ঘরের চালে একেবারে উপরে দাঁড়িয়ে ঠোঁটে ঠোঁট আংটার মতো করে আটকিয়ে দেয়। তারপরে বিশেষ ছন্দে উঠা নামা করে মিনিট খানেক। বাংলাদেশে গ্রামাঞ্চলে একে বলে “নালি ভাঙ্গা। তারা বলে, কবুতর “নালি ভাঙছে। বাচ্চা হবে”[৯৯]। কিসিং গোরামি (kissing gourami) নামে এক ধরনের মাছ আছে, যাদের মধ্যেও চুম্বন ব্যাপারটা বেশ প্রচলিত। যারা অ্যাকুরিয়ামে গোরামি মাছ পালেন, তারা প্রায়শই এদের চুম্বনলীলা দেখার সৌভাগ্য অর্জন করেন।
