চিত্র। পেজ ৮৪
চিত্রঃ বিজ্ঞানীরা মনে করেন যে ভোমেরোনাসা তন্ত্র। নামক পৃথক একটি তন্ত্র ফেরোমোন সনাক্ত এবং প্রবাহে ভূমিকা রাখে।
গন্ধ যে মানুষের মনের মেজাজ মর্জি পরিবর্তনে ভূমিকা রাখে তা কিন্তু আমরা প্রাত্যহিক জীবনের নানা উদাহরণ থেকে খুব সাধারণভাবেই জানি। পুজা-অর্চনার সময় ধূপধুনা জ্বালানো, কিংবা মিলাদ মাহফিলে আগর বাতি জ্বালানো হয় গন্ধের মাধ্যমে চিত্ত চাঞ্চল্য দূর করে মানসিক ভাবগাম্ভীর্যতা বজায় রাখার প্রয়োজনেই। গোলাপের গন্ধে মন প্রফুল্ল হওয়া, লেবুর গন্ধে সতেজ থাকা, ফিনাইল এলকোহলের গন্ধে রক্তচাপ কমার কিংবা ইউক্যালিপ্টাস পাতার ঘ্রাণে শ্বাস-প্রশ্বাস নিয়মিত হবার কিছু প্রমাণ বিজ্ঞানীরাও পেয়েছেন। আর বিভিন্ন সৌগন্ধিক কোম্পানিগুলো টিকেই আছে পারফিউমের সুবেশী গন্ধকে প্রফুল্লতায় নিয়ে যাওয়ার নানা রকম চেষ্টার উপকরণের উপরেই। কিন্তু এসবের বাইরেও বিজ্ঞানীরা গন্ধের আরও একটি বড় ভূমিকা খুঁজে পেয়েছেন। আমরা যে ‘হিস্টোকম্পিট্যাবিলিটি কমপ্লেক্স জিন’ বা MHC জিনের কথা আগে জেনেছি, দেখা গেছে অনেক প্রাণী গন্ধের মাধ্যমে MHC জিন সনাক্ত করতে পারে। এভাবে তারা গন্ধ শুকে নিজেদের পরিবারে কিংবা নিকটাত্মীয়দের সাথে সঙ্গম করা থেকে বিরত থাকতে পারে। এই বিরত থাকার ব্যাপারটা কিন্তু বিবর্তনীয় পথেই সৃষ্ট হয়েছে। মানবসমাজেও খুব কাছের পরিবার পরিজনদের (বাবা, মা ভাই বোন কিংবা নিকটাত্মীয়) মধ্যে যৌনসঙ্গমকে ঘৃণার চোখে দেখা হয়, সামাজিকভাবেই একে ‘ব্যাভিচার’ হিসেবে গণ্য করা হয়। এর কারণ হচ্ছে, খুব কাছের পরিবারের সদস্যদের মধ্যে ব্যাভিচারের ফলে যে সন্তান জন্মায় দেখা গেছে তার বংশাণু বৈচিত্র্য হ্রাস পায়, ফলে সে ধরনের সন্তানের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল হয়। শুধু তাই নয় জীববিজ্ঞানীরা গবেষনা করে দেখেছেন যে, বাবা কিংবা মায়ের পরিবারে যদি কোনো জিনবাহিত রোগ থাকে, তবে শতকরা ২৫ ভাগের মতো ক্ষেত্রে অতিরিক্ত সম্ভাবনা থেকে যায় ত্রুটিপূর্ণ জেনেটিক বৈশিষ্ট্য নিয়ে সন্তান জন্মানোর। বিজ্ঞানের ভাষায় একে বলে ‘কনজেনিটাল বার্থ ডিফেক্ট’ (congenital birth defects) বা জন্মগত সমস্যা। নিঃসন্দেহে আমাদের আদিম পূর্বপুরুষেরা প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে ব্যাপারটি অনুধাবন করেছিলেন যে কাছাকাছি পারিবারিক সম্পর্কযুক্ত মানুষজনের মধ্যে যৌনসম্পর্ক হলে বিকলাঙ্গ শিশু জন্ম নিচ্ছে। এবং সে সমস্ত শিশুর মৃত্যু হার বেশি। সামাজিকভাবেই এটিকে প্রতিহত করার প্রবণতা দেখা দেয়। সেজন্যই বিবর্তনের দীর্ঘ পথপরিক্রমায় আমাদের প্রবৃত্তিগুলো এমনভাবে তৈরি হয়েছে যে, বেশিরভাগ মানুষই নিজেদের পরিবারের সদস্যদের দেখে যৌন আকাঙ্ক্ষায় উদ্দীপ্ত হয় না। বিজ্ঞানীরা অনুমান করেন অন্য প্রাণীদের মতো মানুষও অবচেতনভাবেই গন্ধের সাহায্যে ব্যাপারটির ফয়সলা করে। এর একটি প্রমাণ পাওয়া গেছে জীববিজ্ঞানী ক্লাউস ওয়েডেকাইণ্ডের একটি গবেষণায়[৯১]।
সেই পরীক্ষায় সুইজারল্যান্ডের বার্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ক্লাউস ওয়াইল্ড ১০০ জন কলেজ ছাত্রকে আলাদা করে তাদের সুতির জামা পরিয়ে রেখেছিলেন দুই দিন ধরে। সেই দুই দিন তারা কোনো ঝাল-ঝোলওয়ালা খাবার খায়নি, ধূমপান করেনি, কোনো ডিওডারেন্ট ব্যবহার করেনি, এমনি কোনো সুগন্ধি সাবানও নয়, যাতে করে নমুনাক্ষেত্র প্রভাবান্বিত হবার ঝামেলা-টামেলাগুলো এড়ানো যায়। তারপর যেটা করা হলো তা বেশ মজার। তাদের সবগুলো জামা একত্রিত করে একটি বাক্সে ভরে আরেকদল অপরিচিত ছাত্রীদের দিয়ে শোঁকানো হলো। মেয়েদেরকে গন্ধ শুকে বলতে বলা হলো কোনো টি-শার্টের গন্ধকে তারা ‘সেক্সি’ বলে মনে করে। দেখা গেল মেয়েরা সেসমস্ত টি-শার্টের গন্ধকেই পছন্দ করছে কিংবা যৌনোদ্দীপক বলে রায় দিচ্ছে যে সমস্তটি-শার্টের অধিকারীদের দেহজ MHC জিন নিজেদের থেকে অনেকটাই আলাদা। আর যাদের MHC জিন নিজের জিনের কাছাকাছি বলে প্রতীয়মান হয়, তাকে মেয়েরা অনেকটা নিজের ভাইয়ের মতো মনে করে[৯২]!
১৯৯৭ সালে শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের বংশগতিবিদ ক্যারোল ওবারের এ ধরনের আরেকটি গবেষণায় দেখা গেছে একই MHC জিন বিশিষ্ট বাহকেরা সাধারণত একে অপরের সাথে যৌন সম্পর্কে অনিচ্ছুক হয়[৯৩]। শুধু তাই নয়, বিজ্ঞানীরা দেখেছেন এই পৃথিবীতে দম্পতিদের বন্ধ্যাত্ব এবং গর্ভপাত সমস্যার একটি বড় কারণ আসলে লুকিয়ে আছে দম্পতিদের MHC জিনের সমরূপতার মধ্যে। ডাক্তাররা ১৯৮০ সালের পর থেকেই কিন্তু এ ব্যাপারটা মোটামুটি জানেন। তারা দেখেছেন অনেক নারী দৈহিক এবং মানসিকভাবে কোন ধরনের সমস্যার মধ্যে না থাকা সত্ত্বেও সন্তান হচ্ছে না কেবল দুর্ভাগ্যজনকভাবে তার MHC জিন তার স্বামীর জিনের কাছাকাছি হওয়ায়। অনেক সময় যদিওবা সন্তান হয়ও তা থাকে পর্যাপ্ত ওজনের অনেক নীচে। আর এ ধরনের একই MHC জিন বিশিষ্ট সম্পর্কের ক্ষেত্রে গর্ভপাতের হারও থাকে স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি[৯৪]। হিউম্যান লিউকোসাইট এন্টিজেন’ (সংক্ষেপে HLA) নামে আমাদের ডিএনএ-এর একটি অত্যাবশ্যকীয় অংশ আছে যা দেহের রোগ প্রতিরোধের সাথে জড়িত। জুরিখের বংশগতি বিশেষজ্ঞ তামারা ব্রাউনের সাম্প্রতিক গবেষণা থেকে জানা গেছে যে এই HLAর বৈচিত্র্যই ‘সঠিক ভালোবাসার মানুষ’ নির্বাচনে বড় সড় ভুমিকা রাখে। সাধারণভাবে বললে বলা যায়, আপনার হবু সঙ্গীর HLAর বিন্যাস আপনার থেকে যত বেশি বৈচিত্র্যময় হবে, তত বেশি বাড়বে তার প্রতি আপনার আকর্ষণের মাত্রা এবং সম্পর্ক দীর্ঘস্থায়ী হবার সম্ভাবনা[৯৫]। এই ধরনের জেনেটিক বিশ্লেষণের মাধ্যমে ভবিষ্যৎ সঙ্গী খুঁজে পাওয়ার কাজকে ত্বরান্বিত করার জন্য জিনপার্টনার ডট কম (genepartner.com)-এর মতো সাইটগুলো ইতোমধ্যেই বিনিয়োগ করতে শুরু করেছে। এর মাধ্যে এর মক্কেলরা নাকি তাদের থুতু পরীক্ষার মাধ্যমে নিশ্চিত হতে পারবেন, তার ভবিষ্যত সঙ্গীর HLAর বিন্যাস বৈচিত্র্য তাকে কতটুকু আকর্ষিত কিংবা বিকর্ষিত করতে পারে, আর এতে খরচ পড়বে পরীক্ষা প্রতি ৯৯ ডলার! কে জানে হয়তো তৃতীয় বিশ্বের মতো দেশগুলোতে বহুদিন ধরে চলে আসা এরেঞ্জড ম্যারেজ’-এর জেনেটিক রূপ দেখা যাবে ভবিষ্যতের ‘উন্নত পৃথিবীতে। MHC জিন কিংবা HLAর বিন্যাস দেখে গুনে শুনে দল বেধে সঙ্গী নির্বাচন করছে প্রেমিক প্রেমিকেরা কিংবা বিবাহ ইচ্ছুকেরা[৯৬]!
