বিজ্ঞানীরা অবশ্য জিনের পাশাপাশি গন্ধ পরিবহনের পিছনে এক ধরনের রাসায়নিক পদার্থেরও ভূমিকা খুঁজে পেয়েছেন সেটাকে ফেরোমোন (Pheromone) বলে তারা অভিহিত করেন। এই ফেরোমোন নার্ভ জিরো’ নামে এক ধরনের করোটিক স্নায়ুর মাধ্যমে মস্তিষ্কে সঞ্চালিত হয়ে প্রাণিজগতে সঙ্গী নির্বাচন এবং প্রজননকে ত্বরান্বিত করে বলে ধারণা করা হয়[৮২]। দেখা গেছে গন্ধের উপর নির্ভর করে অনেক প্রাণীই লিঙ্গ চিহ্নিতকরণ, সামাজিক পদমর্যাদা, অঞ্চল, প্রজননগত অবস্থানসহ অনেক কিছু নির্ণয় করতে পারে। যেমন, ১৯৫৯ সালে ইঁদুরের উপর হিল্ডা ব্রুসের একটি গবেষণা[৮৩] থেকে পাওয়া গেছে যে, সঙ্গমের পর যদি কোনো ইঁদুর অরচিত কোনো ইঁদুরের গন্ধের খোঁজ পায়, তাহলে তার জরায়ুতে ভ্রুণ প্রতিস্থাপিত না হয়ে ঝরে পড়ে। কিন্তু পরিচিত বা পছন্দের সঙ্গীর গন্ধ গর্ভধারণে কখনো বাধা হয়ে দাঁড়ায় না। তার মানে ফেরোমোনের সাহায্যে পছন্দের সঙ্গীর মাধ্যমে গর্ভধারণ নিশ্চিত করতে কিংবা বাতিল করতে পারে এ ধরনের ইঁদুরেরা।
২০০৬ সালে নোবেল জয়ী বিজ্ঞানী লিন্ডা বাক এবং তার সহযোগী সিয়াটলের একটি ক্যান্সার রিসার্চ সেন্টারে গবেষণারত অবস্থায় নতুন গ্রাহক প্রোটিনের পরিবারের ১৫টি সদস্যকে সনাক্ত করতে সমর্থ হন। ইঁদুরের নাকে খুঁজে পাওয়া এই গ্রাহকগুলো ফেরোমোনকে সনাক্ত করতে পারে বলে প্রমাণিত হয়েছে।
প্রাণিজগতে ফেরোমোনের ভূমিকা খুব ভালোভাবে প্রমাণিত হলেও মানুষের মধ্যে এর সরাসরি সম্পর্ক যে খুব জোরালো সেটা কিন্তু এখনও বলা যাবে না[৮৪]। আসলে অন্য প্রাণীরা তাদের বেঁচে থাকা এবং সঙ্গী নির্বাচনের ক্ষেত্রে গন্ধের উপর খুব বেশি মাত্রায় নির্ভরশীল হলেও বিবর্তনের ক্রমধারায় গন্ধের উপযোগিতা এবং গুরুত্ব মানব প্রজাতিতে কমে এসেছে। মানুষ তার দৃষ্টিশক্তি, শ্রবণেন্দ্রিয় কিংবা বুদ্ধিমত্তার উপর যেভাবে নির্ভর করে, ঠিক তেমনভাবে গন্ধের উপর নয়। তারপরেও বিজ্ঞানীরা মনে করেন, আমাদের ঘাণজ আবরণীকলায় (olfactory epithelium) এখনও প্রায় ৩৪৭টি ভিন্ন ধরনের সংবেদনশীল নিউরনের অস্তিত্ব আছে। এই নিউরনগুলো ভিন্ন ভিন্ন গন্ধ সনাক্ত করতে পারলেও আমাদের মাথায় বহুসময়েই গন্ধগুলো মিশ্রিত হয়ে উপস্থাপিত হয়, অন্য প্রাণীদের ক্ষেত্রে যেটা আলাদাই থাকে। লিন্ডা বাক ইঁদুরের ক্ষেত্রে যে সমস্ত ফারমোনের গ্রাহক জিনে খুঁজে পেয়েছিলেন, তার অন্তত ছয়টি মানুষের মধ্যেও আছে।
চিত্র। পেজ ৮২
চিত্রঃ বিশ্ববিদ্যালয়ের ডর্মে কিংবা ছাত্রী আবাসে একই কক্ষে একাধিক ছাত্রীরা বেশ কিছুদিন ধরে অবস্থান করলে তাদের রজঃস্রাব একই সময়ে সমাপতিত হয়ে যায়। ফেরোমোন প্রবহের কারণেই এটি হয়। বলে বেশ কিছু গবেষণায় আলামত পাওয়া গেছে।
অন্য প্রাণীদের মতো মানুষের জীবন যাত্রাতেও ফেরোমোনের প্রভাব থাকতে পারে এ ব্যাপারটি বোঝা যেতে শুরু করে শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক মার্থা ক্লিনটক এবং ক্যাথলিন স্টার্নের একটি গবেষণা থেকে। বিজ্ঞানীরা অনেকদিন ধরেই জানেন যে বিশ্ববিদ্যালয়ের ডর্মে কিংবা ছাত্রী-আবাসে একই কক্ষে একাধিক ছাত্রীরা অবস্থান করলে তাদের ঋতু বা রজঃস্রাব একই সময়ে সমাপতিত হয়ে যায়। এই রহস্যময় ব্যাপারটিকে বলে ঋতুচক্রের সমলয়ীকরণ (menstrual synchrony)। মার্থা ক্লিনটক তার ১৯৭১ সালের গবেষণাপত্রে দেখিয়েছিলেন যে এটার পেছনে মূল ভুমিকা পালন করে ফেরোমোন[৮৬]।
১৯৯৮ সালে মার্থা ক্লিনটক তার আগের গবেষণাকে আরও বিস্তৃত করেন। তিনি তার এ পরীক্ষায় দেখান, যে ফেরোমোন শুধু ঋতুচক্রের সমলয়ীকরণই নয়, সেই সাথে মেয়েদের অনিয়মিত মাসিককে নিয়মিত করতেও ভূমিকা রাখে। সাধারণত দেহের লোমশ জায়গাগুলোকে (যেমন, বগলের তলা কিংবা যৌনাঙ্গের এলাকা প্রভৃতি) ফেরোমোনের উৎস বলে মনে করা হয়। মার্থা ক্লিনটক এই পরীক্ষায় কিছু স্বাচ্ছাসেবক পুরুষের বগল থেকে নেওয়া ঘামের ফেরোমোন নারিদের ঠোঁটে লাগিয়ে কয়েক সপ্তাহ ধরে পরীক্ষা করে দেখেন, এর ফলে মেয়েদের অনিয়মিত মাসিক নিয়মিত হয়ে যাচ্ছে[৮৭]। ব্যাপারটা অস্বাভাবিক নয়। অনেক বিজ্ঞানীই মনে করেন, অন্য প্রাণীদের মতো এত ব্যাপক আকারে না হলেও শরীরের গন্ধ মানব শরীরের রোগ প্রতিরোধতন্ত্র গঠনে বড় ভূমিকা রাখে, এবং এর পেছনে আছে বিবর্তনীয় কারণ। হেলেন ফিশার তাঁর অ্যানাটমি অফ লাভ বইয়ের ৪২ পৃষ্ঠায় লিখেছেন[৮৮]—
পুরুষের গায়ের গন্ধ (ঘাম) মেয়েদের ঋতুচক্রকে স্বাভাবিক রাখতে সহায়তা করে। সেজন্যই ছেলেদের ঘামের গন্ধের প্রতি মেয়েদের (অবচেতন) আকর্ষণ খুব সম্ভবত বিবর্তনজনিত। পুরুষদের সুগন্ধি ব্যবহার করার ও মেয়েদের তা পছন্দ করার কারণ হলো পণ্য উৎপাদনকারীর বিজ্ঞাপকদের আগ্রাসী সাংস্কৃতিক মগজ ধোলাই যার দরুন ঘাম হওয়াকে অপরিচ্ছন্নতার সঙ্গে এক করে দেখা হয়।
অর্থাৎ, এ ব্যাপারটি মনে রাখতে হবে যে, ঘামের পচা গন্ধ যে আমরা অপছন্দ করি সেটা এবং ফেরোমোনের গন্ধ কিন্তু এক নয়। ঘামের দুর্গন্ধ তৈরি হয় ঘামের ব্যাক্টেরিয়া পচনের ফলে, যা আবহাওয়ায় ছড়ায় কিছু সময়ের জন্য। কিন্তু অন্যদিকে ফেরোমোনের গন্ধ মূলত দেহজাত যা খুবই সূক্ষ এবং সেটা সচেতনভাবে পাওয়া যায় না। আমরা যতই পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন থাকি না কেন, সেটা সবসময়ই দেহ থেকে বের হতে থাকে বলে মনে করা হয়। ছেলেরা যখন এগারো বারো বছর বয়সের দিকে বয়ঃসন্ধিকালে পৌঁছায়, তখন তাদের দেহ হয়ে উঠে নানা ধরনের নতুন ধরনের গন্ধের আড়ত, যা তার আগেকার শিশু বয়সের গন্ধ থেকে একেবারেই আলাদা। স্নায়ুবিজ্ঞানী লোয়ান ব্রিজেন্ডিন তার সাম্প্রতিক ‘মেইল ব্রেন’ গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন যে, এই নতুন গন্ধটি টেস্টোস্টেরন হরমোনের প্রভাবে পুরুষের দেহজ ঘামগ্রন্থি থেকে নির্গত ফেরোমোন এবং এন্ড্রোস্টেনেডিওনের একধরনের সুষম মিশ্রণ[৮৯]। আর ছেলেদের এই গন্ধটা মেয়েরা পায় প্রবৃত্তিগতভাবে,ঘ্রাণজ আবরণীকলার মাধ্যমে নয়, বরং এর বাইরে আরেকটি পৃথক অঙ্গের মাধ্যমে যাকে বলা হয় ভোমেরোনাসা তন্ত্র (Vomeronasal Organ) বা সংক্ষেপে VNO[৯০]।
