১. প্লেইসটোসিন যুগের অভিযোজনগত সমস্যা থেকে আমাদের মানসপটের বিনির্মাণের যোগসূত্র খুঁজে পাওয়া।
২. পার্থক্যসূচক চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যগুলো ইতোমধ্যেই খুঁজে পেয়েছি বা শিগগিরই খুঁজে পাব বলে মনে করা।
৩. মনোবিজ্ঞান থেকে প্রাপ্ত উপাত্ত জনপ্রিয় বিবর্তনীয় মনোবিজ্ঞানের স্বপক্ষে যায় বলে মনে করা।
৪. আমাদের আধুনিক করোটির ভিতরে আদিম প্রস্তরযুগের মস্তিষ্কের বাস বলে স্বতঃসিদ্ধভাবে ধরে নেওয়া।
তালিকার শেষ দুটি বিষয় খুব গুরুত্বপূর্ণ। বিবর্তন মনোবিজ্ঞানীরা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই জরিপ, গ্রাফ, ট্রেন্ড এনালাইসিস প্রভৃতির সাহায্য নিয়ে একটি সরল উপসংহারে পৌঁছে যান বলে সমালোচকদের অনেকেই মনে করেন। অনেক সময় নমুনাক্ষেত্রও থাকে খুব ছোট। আর তাদের অনেকেরই গবেষণার পদ্ধতি অনেকসময়ই নিগূঢ় থাকে না, বরং অধিকাংশ ক্ষেত্রেই হয়ে উঠে বর্ণনামূলক। সেজন্যই সংশয়বাদী জীববিজ্ঞানী ম্যাসিমো পাগ্লিউসি (Massimo Pigliucci) বলেছেন, “Evolutionary stories of human behavior make for a good narrative, but not good science.”। উদাহরণ দেয়া যাক। যেমন, ডেভিড বাসের যে বহুল আলোচিত সমীক্ষাটির সাথে আমরা পরিচিত হয়েছি বইয়ের পঞ্চম অধ্যায়ে, থেকে আমরা জেনেছি সঙ্গী নির্বাচনের সময় ছেলে এবং মেয়েদের মধ্যকার পার্থক্যের ব্যাপারগুলো। বাসের এই জরিপের পর সহস্রাধিক জার্নালে এই স্টাডির উল্লেখ করে দেখানো হয়েছে যে, ছেলেমেয়েদের মধ্যে পার্থক্যগুলো প্রধানত বিবর্তনীয় কারণেই ‘মজ্জাগত’ কিন্তু বাস্তবতা হলো মাত্র ৩৩ টি দেশে ছোট নমুনাক্ষেত্রের মাধ্যমে পাওয়া ফলাফল মোটেই শক্তিশালী কোনো বিজ্ঞানকে প্রকাশ করে না। তার চেয়েও বড় কথা সাম্প্রতিক কিছু জরিপ নারী পুরুষ নিয়ে বিবর্তন মনোবিজ্ঞানের প্রচলিত ধারণার বিপরীতে গেছে মনে করা হচ্ছে। যেমন, সাউদার্ন ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞানের অধ্যাপক লীন কারোল মিলার তার সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখিয়েছেন, যে মেয়েরাও ছেলেদের মতো বহুগামী হতে পারে, সংস্কৃতিভেদে তারাও ছেলেদের মতো একইভাবে সময় এবং অর্থ ব্যয় করে থাকে যৌনতাকে উদযাপনের জন্য। এই ফলাফল বাসের পূর্বোক্ত সমীক্ষার বিপরীতে গেছে বলে মনে করা হচ্ছে। কাজেই বহুগামিতা, ‘ওয়ান নাইট স্ট্যান্ড’, সম্ভোগের যথেচ্ছাচার প্রভৃতি পুরুষদের একচেটিয়া কিছু নয়, নারীদের মধ্যেও একইভাবে জাগ্রত হতে পারে উপযুক্ত পরিবেশ পেলেই[৩২৮]।
একই কথা বাসের ঈর্ষা সংক্রান্ত জরিপের ক্ষেত্রেও একইভাবে প্রযোজ্য। অধ্যাপক বাস তার জরিপের মাধ্যমে উপসংহারে পৌঁছেছেন যে, পুরুষ এবং নারী দুজনেরই ঈর্ষা আছে, কিন্তু জৈববিবর্তনীয় কারণে তাদের প্রকাশ ভিন্ন। ছেলেরা তার সঙ্গীর যৌনতার ব্যাপারে অধিকতর ঈর্ষাপরায়ণ থাকে, আর অন্যদিকে মেয়েরাঈর্ষার প্রকাশ ঘটায় তার সঙ্গীর রোমান্টিক সম্পর্কের ব্যাপারে। নারী পুরুষে ঈর্ষার জৈববিবর্তনীয় পার্থক্য নিয়ে আমিও এই বইয়ের চতুর্থ অধ্যায়ে আলোচনা করেছি। কিন্তু সেটাই শেষ কথায়। এমনও হতে পারে এই পার্থক্যের ভিত্তি পুরোপুরি জৈবিক নয়। জার্মানি কিংবা নেদারল্যান্ডের মতো দেশে যেখানে যৌনতার ব্যাপারগুলো অনেক শিথিল, সেখানে পুরুষেরা সঙ্গীর যৌনতার ব্যাপারে অনেক কম ঈর্ষাপরায়ণ থাকেন। এ দুটি দেশের জরিপে যৌনতার ব্যাপারে সঙ্গীর বিশ্বাসঘাতকতায় ঈর্ষাপরায়ণ পুরুষের হার যথাক্রমে মাত্র ২৮ ভাগ এবং ২৩ ভাগ। সেটা বাস নিজেও স্বীকার করেছেন এই বলে–”আমেরিকান সংস্কৃতির চেয়ে তাদের সংস্কৃতি অনেক শিথিল, এমনকি বিবাহবহির্ভূত সম্পর্কের ক্ষেত্রেও[৩২৯]। তার মানে হচ্ছে সংস্কৃতির একটা গুরুত্ব থেকেই যাচ্ছে। যে সংস্কৃতিতে সংম্পর্কে বিশ্বাসঘাতকতা মানেই শাস্তি কিংবা সম্পর্কের তাৎক্ষণিক সমাপ্তি, সেখানে মানুষ সম্পর্কের ব্যাপারে অনেক বেশি সচেতন থাকে, আর যে জায়গায় লোকজনের মন মানসিকতা যৌনতার ব্যাপারে অপেক্ষাকৃত কম কঠোর, সে সমস্ত জায়গায় যৌনতা নিয়ে একটু এদিক ওদিক হওয়াটা মোটেই অস্বাভাবিক নয়। তাই কিন্তু আমরা দেখছি জরিপের ফলাফলে। নতুন কিছু সমীক্ষায় ব্যাপারগুলো আরও স্পষ্ট হয়েছে। যেমন, কোনটা চিন্তা করে আপনি বেশি বিপর্যস্ত হবেন–আপনার সঙ্গী অন্য কারো সাথে বিভিন্ন আসনে যৌনক্রিয়ায় আসীন নাকি আপনার সঙ্গী অপরজনের সাথে রোমান্টিক সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েছে–এর উত্তরে মার্কিনদের মধ্যে মাত্র ১২ ভাগ, নেদারল্যান্ডসের ১২ ভাগ এবং জার্মানির মাত্র ৮ ভাগ নারী ২য় অপশনটির পক্ষে মত দিয়েছেন। কাজেই মেয়েরা তার যৌনসঙ্গীর ‘ব্যাভিচারের ব্যাপারে মোটেই উল্কণ্ঠিত নয় এই অনুমান সার্বজনীন বলে ধরে নেওয়ার পক্ষে যুক্তি বোধ হয় খুব জোরালো নয়।
চিত্র। পেজ ২৮৫
চিত্রঃ ডেভিড বাস নারী-পুরুষে ঈর্ষা সংক্রান্ত ভিন্নতা নির্ণয়ের ক্ষেত্রে যে সমীক্ষা চালিয়েছিলেন [“Sex Differences in Jealousy: Evolution, Physiology, and Psychology” in Psychological Science, Vol. 3, No. 4; July 1992] তার কিছু ফলাফল সম্প্রতি প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় না উল্লেখ করলেই নয়। যথেষ্ট সতর্ক না থাকলে বিবর্তন মনোবিজ্ঞানের গবেষণা, বিশ্লেষণ এবং উপস্থাপনা ভুল দিকে চলে যাওয়ার ক্ষেত্র তৈরি করতে পারে অবলীলায়। অনেক সময় তৈরি করতে পারে অনাকাঙ্ক্ষিত বিতর্ক। যেমন রেন্ডি থর্নহিলের ধর্ষণ সংক্রান্ত গবেষণা এবং তার ‘ধর্ষণের প্রাকৃতিক ইতিহাস’ বইটির[৩৩০] কথা এক্ষেত্রে প্রাসঙ্গিক। এই বইয়ে থর্নহিল এবং ক্রেইগ পালমার ধর্ষণকে একটি ‘বিবর্তনীয় অভিযোজন’ হিসেবে অভিমত দেয়ার চেষ্টা করেছিলেন। তারা বলার চেষ্টা করেছেন যে, ধর্ষণ ব্যাপারটা হয়তো আদিম সমাজে পুরুষদের বেশ কিছু প্রজননগত সুবিধা দিয়েছিল। তাদের মতে, আমরা সেই সব পুরুষেরই বংশধর যারা একসময় শুধু নিজেদের সঙ্গীর দেহেই গর্ভসঞ্চার করেনি, পাশাপাশি অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে জোর করে গর্ভ সঞ্চার করেছিল অনিচ্ছুক নারীর দেহেও। তাই আধুনিক সমাজব্যবস্থাতেও ‘ধর্ষণের ট্রেইট’ অনেকটা সার্থকভাবেই টিকে আছে, আর পুরুষেরা সে কারণেই ধর্ষণ করতে উন্মুখ থাকে সুযোগ পেলেই। তারা যুক্তি দেন প্রজননগত সুবিধার ব্যাপারটা আছে বলেই দেখা যায় যে, শিশু কিংবা বৃদ্ধাদের তুলনায় সন্তান ধারণক্ষম উর্বরা নারীদের উপরেই ধর্ষণের প্রকোপ ঘটে বেশি, এবং ধর্ষণের কারণে মানসিক আঘাতের প্রতিক্রিয়াও তাদের মধ্যে বেশি থাকে[৩৩১]। কথাগুলো হয়তো মিথ্যে নয় (কিছু জরিপে এর সপক্ষে কিছু সত্যতা পাওয়া গেছে বলে দাবি করা হয়েছে[৩৩২]), কিন্তু তারপরেও থর্নহিল এবং পালমার ধর্ষণকে যেভাবে ‘মানব বিবর্তনের একটি স্বাভাবিক এবং জৈবিক প্রক্রিয়াজাত উপকরণ হিসেবে সংজ্ঞায়িত করেছেন, তাতে অনেকেই ধর্ষণের ‘বৈধতার গন্ধ খুঁজে পেয়েছিলেন, এবং স্বাভাবিক কারণেই এটি নানা অনাকাঙ্ক্ষিত বিতর্কের ক্ষেত্র তৈরি করেছে। নারীবাদী, যৌন অপরাধবিশেষজ্ঞ, সমাজবিজ্ঞানী, মানবাধিকারকর্মী থেকে শুরু করে অনেকেই বইটির নিন্দা করেছেন। জীববিজ্ঞানী জোয়ান রাফগার্ডেন তো বইটিকে সর্বশেষ ‘বিবর্তনই আমার অপরাধের জন্য দায়ী’ ধরনের দায়মুক্তির অপচেষ্টা হিসেবে অভিহিত করেছেন। জেরি কোয়েনের মতো খ্যাতনামা জীববিজ্ঞানী পর্যন্ত এই বইয়ের সমালোচনায় মুখর হয়েছেন[৩৩৩]। অবশ্য থর্নহিল এবং অন্যান্য বিবর্তন মনোবিজ্ঞানীরা এই দাবিগুলোকে ‘অবৈজ্ঞানিক অপপ্রচার হিসেবে প্রত্যাখান করেছেন এই বলে যে, তারা কেবল বিবর্তনীয় দৃষ্টিকোণ থেকেই ধর্ষণের উপর বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধান করতে চেয়েছেন, কোনো কিছুর বৈধতা দিতে নয়। তারা যুক্তি দিয়েছেন, ধর্ষণ করে নারীর দখল নেওয়া একধরনের স্ট্র্যাটিজি যা পুরুষেরা ব্যবহার করেছে অনাদিকাল ধরে। এজন্যই পরিসংখ্যানে দেখা যায়, যুদ্ধের সময় নারীদের উপর ধর্ষণের প্রবণতা বৃদ্ধি পায়, বিগতযৌবনা নারীদের চেয়ে যুবতী নারীরাই বেশি ধর্ষিত হয়, ইত্যাদি। কিন্তু এগুলো কোনোটিই ধর্ষণকে ‘অ্যাপ্টিভ’ বা অভিযোজনশীল প্রমাণ করার জন্য যথেষ্ট নয়। যুদ্ধের সময় নারীদের উপর আগ্রাসন এবং ধর্ষণ বৃদ্ধি পায় সত্য কথা, কিন্তু যুদ্ধের সময় চুরিদারি, লুটতরাজ, খুন মারামারি, সম্পত্তি ধ্বংসসহ অনেক কিছুই বৃদ্ধি পায়। অন্য নেতিবাচক ব্যাপারগুলোকে যদি অভিযোজনশীল মনে না করা হয়, তবে একতরফাভাবে ধর্ষণকেও অভিযোজনশীল মনে করার কোন যৌক্তিকতা নেই।
