আরও একটা জিনিস লক্ষ করা গেছে। দীর্ঘদিন আমেরিকায় থাকার ফলে এ ব্যাপারটা আমার কাছে আরও স্পষ্ট করে ধরা পড়েছে। বহু ক্ষেত্রেই দেখা গেছে। আমেরিকান সৈন্যরা ঠিক যুদ্ধে যাওয়ার বছরখানেক আগে বিয়ে করে ফেলে; আর যুদ্ধরত অবস্থায় পায় সন্তান জন্মের খবর। স্ত্রী সন্তানদের নিরাপত্তা রাষ্ট্রের হাতে সঁপে দিয়ে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়া হয়তো আদিম মনোসঞ্জাত স্ট্র্যাটিজি। পরিবারের নিরাপত্তা একবার নিশ্চিত হয়ে গেলে বহুনারীর দখলদারিত্বের সম্ভাবনা অনেক ক্ষেত্রেই হয়ে দাঁড়ায় স্রেফ সময়ের ব্যাপার। সেজন্যই দেখা যায় প্রতিটি যুদ্ধেই আগ্রাসী সৈন্যরা ভিন দেশ আক্রমণের মাধ্যমে হত্যা এবং ধ্বংসের পাশাপাশি বহু সময়ই মেতে উঠে ধর্ষণে। শুনতে হয়তো খারাপ লাগবে, কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে ধর্ষণ প্রায় প্রতিটি যুদ্ধেরই অত্যাবশ্যকীয় নিয়ামক। বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে পাকিস্তানি সৈন্যরা নয় মাসে দুই লক্ষ নারীকে ধর্ষণ করেছিল, বসনিয়ায় সার্ব সৈন্যরা ধর্ষণ করেছিল প্রায় পঞ্চাশ হাজার নারীকে, রুয়ান্ডা গণহত্যায় দুই লক্ষ থেকে পাঁচ লক্ষ নারীকে ধর্ষণ করা হয়েছিল। শিম্পাঞ্জিরা যখন অন্য শিম্পাজির এলাকা দখল করে, তখন প্রথম কাজটিই যেটা করে সেটা হলো সেই এলাকার নারী শিম্পাঞ্জিদের পালা করে ধর্ষণ করা[৩২৩]। আমরা নিজেদের ‘সভ্য এবং আধুনিক’ মানুষ দাবি করলেও আমরা যে বন্য স্বভাব থেকে মুক্ত হতে পারিনি, তা যুদ্ধের সময়গুলোতে উৎকটভাবে প্রকাশিত হয়ে পড়ে। অনেক বিশেষজ্ঞই মনে করেন শিম্পাঞ্জিদের মতোই এভাবে অধিক নারীর দখল নিয়ে প্রজননগত সফলতা বৃদ্ধি করা মানবসমাজেও সৈন্যদের গুপ্ত স্ট্র্যাটিজি। যুদ্ধের ময়দানে একাধিক নারীর দখল, আর যুদ্ধ শেষে রাষ্ট্রীয় পুরস্কার এবং পাশাপাশি পরিবারের সুদৃঢ় নিরাপত্তা—এগুলো মানবসমাজে যে কোনো রাষ্ট্রেই নির্জলা সত্য। আরও একটা ব্যাপার এখানে লক্ষণীয়; বিভিন্ন দেশের অবস্থা পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যাবে, সাধারণত আর্থিক দিক থেকে অসচ্ছল পরিবার থেকেই মূলত সৈন্যবাহিনীতে নিয়োগ দেয়া হয়। তারা যুদ্ধের মাধ্যমে সম্মান বয়ে এনে যে প্রজননগত সফলতা প্রদর্শন করতে পারে, যুদ্ধ না করলে সেটা তাদের মতো অবস্থার মানুষদের পক্ষে সম্ভব হতো না অনেক ক্ষেত্রেই। এগুলো সবগুলোই হয়তো দেশের জন্য সৈন্যদের যুদ্ধ করার উজ্জীবনী শক্তি। তবে বলা বাহুল্য–এগুলো সবই জৈববৈজ্ঞানিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেওয়া কতকগুলো ধারণা, সুনির্দিষ্ট কোনো প্রমাণ নয়। কেন মানুষ দেশপ্রেমে উজ্জীবিত হয়, কেন সৈন্যরা দেশের জন্য অকাতরে প্রাণ দেয় তার অনেক কিছুই এই মুহূর্তে জৈবিক দৃষ্টিকোণ থেকে অজানা।
.
প্রান্তিক কিছু বিতর্ক
বিবর্তন মনোবিজ্ঞানের বিরুদ্ধে বেশ কিছু বড় সড় অভিযোগ করা হয়েছে বিভিন্ন মহল থেকে। রিচার্ড লিওনটিন অভিযোগ করেছেন লঘুবাদিতার (reductionism), স্টিফেন জে. গুল্ট অভিযোগ করেছেন প্রাক-অভিযোজনের (Panadaptationism), স্টিফেন রোজ অভিযোগ করেছেন বংশাণু নির্ণয়বাদিতার (Genetic determinism)। অবশ্য বিবর্তন মনোবিজ্ঞানীরা এই যুক্তিগুলোকে খণ্ডন করেছেন বলে দাবি করেন[৩২৪]। তারা মনে করেন এই সমস্ত সমালোচকেরা বিবর্তন মনোবিজ্ঞানের সঠিক ভিত্তির উপর দাঁড়িয়ে সমালোচনা করেননি। যেমন, লঘুবাদিতা বা রিডাকশনিজম প্রসঙ্গে বলা যায় লঘুবাদিতাতে দোষের কিছু নেই। বিজ্ঞানের প্রতিটি শাখাতেই লঘুবাদিতাকে প্রশ্রয় দেয়া হয়; শুধু তাই নয়, অনেক সময় মডেল বা প্রতিরূপ নির্মাণের ক্ষেত্রে একমাত্র অবলম্বন হয়ে দাঁড়ায় লঘুবাদিতা বা রিডাকশনিজম, তা সে আমরা প্রকৃতিকেই ব্যাখ্যা করি আর সমাজকেই ব্যাখ্যা করি। যেমন, আমরা জানি যে, মহাকর্ষকে ব্যাখ্যার জন্য নিউটনের সূত্রও এক ধরনের রিডাকশনিজম বা লঘুকরণ। আইনস্টাইনের আপেক্ষিক তত্ত্বও তাই। তাহলে সামাজিক প্যাটার্ন ব্যাখ্যার ক্ষেত্রেও লঘুকরণ খাটবে না কেন? এতোদিন স্ট্যান্ডার্ড সোশাল সায়েন্সের মডেলে (SSSM) সমাজের গতি-প্রকৃতির ব্যাখ্যা দেয়া হচ্ছিল; পুরুষেরা সহিংস কেন, কিংবা সিরিয়াল কিলার পুরুষদের মধ্যে বেশি কেন, কেন পুরুষেরা পর্নোগ্রাফি বেশি দেখে, আর মেয়েরা রোমান্স নভেল বেশি পড়ে–এগুলো কেবল সামাজিক অবস্থান, প্রতিপত্তি, পাওয়ার প্লে, সংস্কৃতি এগুলো দিয়েই ব্যাখ্যা দেয়া হচ্ছিল। এখন দেখা যাচ্ছে এর অনেককিছুতেই আরও ভালো ব্যাখ্যা পাওয়া যাচ্ছে বিবর্তনীয় মনোবিজ্ঞানের সাহায্যে। এতে যদি রিডাশনিজমের ব্যাপার চলে আসে তো আসুক। ডেনিয়েল ডেনেট সেজন্যই বলেছেন, ‘রিডাকশনিজম’ কোনো সমস্যা না, সমস্যা হচ্ছে ‘লোভী রিডাকশনিজম’ (Greedy reductionism)[৩২৫]
‘লোভী রিডাকশনিজমের’ ব্যাপারটা গুরুত্বপূর্ণ। অনেক সময় সতর্ক না থাকলে ‘লোভের ফাঁদে পড়ে’ ভুল দিকে গবেষণা চলে যাওয়ার খুব ভালো অবকাশ থেকে যেতে পারে। যেমন, নারীপুরুষের জৈবিক পার্থক্যগুলোকে ‘খুব বড় করে’ কিংবা ‘অনমনীয়’ হিসেবে দেখিয়ে স্টেরিওটাইপিং-এর বৈধতা দেয়া, খুন, ধর্ষণ প্রভৃতিকে এডাপ্টিভ ট্রেইট হিসেবে উপস্থাপন করা ইত্যাদির কথা বলা যায়। বিবর্তন মনোবিজ্ঞানের কিছু গবেষক’ এমন গবেষণাপত্রও লিখেছেন যে, আফ্রিকাসহ কিছু দেশে মানুষের চিকিৎসা এবং স্বাস্থ্যজনিত দুর্ভোগ দারিদ্র কিংবা অর্থনৈতিক কারণে নয়, বরং ‘লো আইকিউ’-এর কারণে। ফলত এ গবেষণাগুলো সঠিক দিকে না গিয়ে লোভী লঘুকরণের ফলাফল হিসেবে ভুলভাবে উপস্থাপিত দুর্বল ‘পপ সায়েন্স’ হয়ে উঠেছে। শুধু তাই নয় পাশাপাশি সচেতন মানুষের মধ্যে বহু বিতর্কও তৈরি করেছে পুরোমাত্রায়। ডেভিড বুলার সায়েন্টিফিক আমেরিকান ম্যাগাজিনে ‘বিবর্তনীয় মনোবিজ্ঞানের চারটি হেত্বাভাস’ শিরোনামে একটি লেখা লিখেছিলেন ২০০৯ সালের জানুয়ারি সংখ্যায়[৩২৬]। অধ্যাপক বুলার সেই প্রবন্ধটিতে চলমান বিবর্তনীয় মনোবিজ্ঞানের জনপ্রিয় ধারাটিকে “চটুল বিজ্ঞান’ (pop evolutionary psychology, or Pop EP) হিসেবে সমালোচনা করেছেন[৩২৭]। তিনি সেই প্রবন্ধে বিবর্তনীয় মনোবিজ্ঞানের চারটি জনপ্রিয় অনুমানকে ‘হেত্বাভাস’ বা ফ্যালাসি হিসেবে খণ্ডন করেছেন। সেগুলো হলো–
