সম্প্রতি প্যারাগুয়ের আহকে ট্রাইবের (Ach€) মানুষের উপর গুরুত্বপূর্ণ গবেষণা চালিয়েছেন এরিজোনা স্টেট বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক কিম হিল। সেখানে গবেষণা চালানোর কারণ হলো, আহকে গোত্রের মানুষেরা এখনও সেই আদিম শিকারি সংগ্রাহক হিসেবেই জীবনযাপন করছে। সেই সমাজের উপর সমীক্ষা চালিয়ে অধ্যাপক কিম হিল বের করার চেষ্টা করেন যে, সত্য সত্যই আদিম সমাজে ধর্ষণ কোনো ‘বিবর্তনীয় অভিযোজন’ হিসেবে কাজ করেছিল কিনা। তিনি সেখানে ধর্ষণের ব্যয় এবং উপযোগিতার একটা তুলনামূলক হিসেব বের করেন। তারা ধর্ষণের ব্যয় হিসেবে গণনায় আনেন কিছু বিশেষ প্রেক্ষাপট যেমন, ধর্ষণ করতে গিয়ে আক্রান্ত নারীর স্বামী কিংবা আত্মীয়দের দ্বারা ধর্ষণকারীর নিগ্রহ, শাস্তি এবং মৃত্যুর সম্ভাবনাসহ অন্যান্য ব্যাপারগুলো যা ধর্ষণের জন্য নেতিবাচক উপাদান হিসেবে গৃহীত। ঠিক একইভাবে প্রজননগত উপযোগিতার ব্যাপারটি আরও কমে আসবে ধর্ষিতা যদি তার ধর্ষণজাত শিশুকে জন্ম দিতে কিংবা লালনপালন করতে অস্বীকৃত হন, কিংবা শিকারি সংগ্রাহকদের ছোট গোত্রের মধ্যে ব্যাপারটা জানাজানি হয়ে গেলে খাদ্যান্বেষণসহ বহু মৌলিক চাহিদা পরিপূরণে সহযোগিতার অভাবে ক্ষতির সম্মুখীন হওয়া ইত্যাদি কারণে। অন্যদিকে ধর্ষণগত বিবর্তনীয় উপযোগিতা বাড়বে যদি ধর্ষিতা উর্বর সময়ের মধ্যে থাকে (শতকরা ১৫ ভাগ), তার গর্ভ সঞ্চার হয় (শতকরা ৭ ভাগসম্ভাবনা), ধর্ষিতা গর্ভপাত ঘটাবেননা (শতকরা ৯০ ভাগ) এবং ধর্ষণের পরেও ধর্ষিতার শিশুকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে না দেন (শতকরা ৯০ ভাগ)। হিল এই প্রেক্ষাপটগুলো বিবেচনা করে ধর্ষণের ব্যয় এবং উপযোগিতার তুলনামুলক বিশ্লেষণ নির্ণয়ের জন্য সিমুলেশন পরিচালনা করেন। যে ফলাফল পাওয়া গেছে তাতে তিনি দেখেছেন প্রতিটি ক্ষেত্রেই ধর্ষণের ব্যয় তার উপযোগিতাকে অতিক্রম করে যায়। এমনকি ফলাফল কাছাকাছিও নয়, ধর্ষণের ব্যয় উপযোগিতার প্রায় দশগুণ পাওয়া গেছে। কিপ হিলের এই গবেষণার ভিত্তিতে বলা যেতে পারে ধর্ষণের বিবর্তনীয় অভিযোজন থাকার সম্ভাবনা খুব কমই। হিল সেজন্যই বলেন, ‘প্লেইস্টোসিন যুগের মানুষেরা একটি প্রজননগত কৌশল হিসেবে ধর্ষণকে ব্যবহার করেছিল–এটি বলার পেছনে কোনো শক্ত ভিত্তি নেই।
বিবর্তনীয় মনোবিজ্ঞান নিয়ে গবেষণা করতে গিয়ে সতর্ক থাকা দরকার আরও অনেক ব্যাপারেই, নাহলে বিশ্লেষণ এবং উপসংহার নারী অধিকারের জন্য ‘অপমানজনক’ বলে প্রতিভাত হতে পারে। মনে হতে পারে ‘স্টাটাস কো’ বজায় রাখার ‘পুরুষতান্ত্রিক’ অপচেষ্টা, কিংবা ব্যাক টু কিচেন আর্গুমেন্ট। বিষয়টা পরিষ্কার করা যাক। বিবর্তন মনোবিজ্ঞানীরা বলেন যে, পুরুষেরা অনাদিকাল থেকেই অসংখ্য যুদ্ধ বিগ্রহের মধ্য দিয়ে নিজেদের নিয়ে যাওয়ায় তারা মন মানসিকতায় অনেক প্রতিযোগিতামূলক এবং সহিংস হয়ে উঠেছে। আর মেয়ারা ঘর-দোর সামলাতে আর বাচ্চা মানুষ করার পেছনে নিয়োজিত থাকায় তাদের বাচনিক যোগাযোগের ক্ষেত্র অনেক উন্নত হয়েছে। কিন্তু কেউ যদি মনে করেন যে, এর মাধ্যমে দেখানোর চেষ্টা হয়েছে যে, মেয়েরা ঘরে থাকুক, কেবল বাচ্চা মানুষ করুক, আর ছেলেরা বাইরে কাজ করুক—কারণ এটাই ন্যাচারাল–এভাবে দেখা শুরু করলে পুরো বিষয়টিকে কিন্তু ভুল উপস্থাপনার দিকে নিয়ে যাবে। কিছু ক্ষেত্রে গিয়েছে। যেমন, চার বছর আগে হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট লরেন্স সামারস একটি কনফারেন্সে ‘ছেলে মেয়েদের মস্তিষ্কের গঠনগত পার্থক্যের কারণে মেয়েরা কম সংখ্যায় বৈজ্ঞানিক গবেষণার পরিমণ্ডলে প্রবেশ করে এই কথা বলে মহাবিপদে পড়ে গিয়েছিলেন। ন্যান্সি হপকিন্সের মতো জীববিজ্ঞানী এই মন্তব্যের প্রতিবাদে সভাস্থল ত্যাগ করেছিলেন। এই বক্তব্যের কারণে সামারসকে পরবর্তীতে পদত্যাগ করতে হয়। সামারসের কথায় সত্যতা আছে কী নেই, বা থাকলেও কতটুকু এ নিয়ে বিতর্ক করা গেলেও পরিসংখ্যান মূলত সামারসের বক্তব্যের পক্ষেই যায় বলেই অনেকে মনে করেন। উদাহরণ হিসেবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পরিসংখ্যানের উল্লেখ করা যেতে পারে। আমেরিকায় ২০০৩ সালের পরিসংখ্যান অনুযায়ী মোট জনশক্তির প্রায় ৪৩ ভাগ নারী। কিন্তু এদের মধ্যে মাত্র ২৭ ভাগ বিজ্ঞান এবং প্রযুক্তির সাথে যুক্ত[৩৩৪]। গণিতে দক্ষ শীর্ষ ১% ছেলে মেয়ের মধ্যে জরিপ চালিয়ে দেখা গেছে, দক্ষতা থাকা সত্ত্বেও আটজন ছেলে গণিত বা বিজ্ঞানকে পেশা হিসেবে নিলে, তার বিপক্ষে মেয়ে থাকে মাত্র একটি। অন্য সাতজন পেশাহিসেবে নেয় চিকিৎসাবিদ্যা,জীববিজ্ঞান, কিংবা মানবিক কোনোবিষয় আশয়। কিন্তু তারপরেও পৃথিবীর ভালো লোগবেষণাগারগুলোর দিকে চোখ রাখলে দেখা যাবে, নারীরা পুরুষদের সাথে পাল্লা দিয়েই কাজ করে যাচ্ছেন, গবেষণায় সাফল্য পাচ্ছেন। সেই প্রাচীনকালের হাইপেশিয়া থেকে শুরু করে মাদাম কুরী, লরা বেসি, সোফিয়া কোভালেভস্কায়া, লিস মিন্টার, ক্যারলিন হারসেল, মেরী অ্যানী ল্যাভয়শিয়ে রোজালিন ফ্র্যাঙ্কলিন প্রমুখ বিজ্ঞানীদের নাম আমরা সবাই জানি। আধুনিক বিশ্বে তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানে সাফল্যের সাথে কাজ করছেন লিজা রান্ডল, ইভা সিলভারস্টাইন, সিএস উ, ভেরা রুবিন, জোসলিন বেল প্রমুখ। জীববিজ্ঞান, নৃতত্ত্ব, ইতিহাস এবং বিবর্তনীয় মনোবিজ্ঞানসহ অন্যান্য শাখায় সাফল্যের সাথে কাজ করে যাচ্ছেন বনি ব্যাসলার, লরা বেটজিগ, এলিজাবেথ ক্যাসদান, লিডা কসমাইডস, হেলেনা নিন, মিল্ডার্ড ডিকম্যান, হেলেন ফিশার, প্যাট্রিশিয়া গোয়াটি, ক্রিস্টেন হকস, সারা ব্ল্যাফার হার্ডি, ম্যাগদালিনা হুটাডো, ববি লো, লিণ্ডা মিলে, ফেলিসিয়া প্রাত্তো, মেরিনরাইস, ক্যাথেরিন স্যামোন, জোয়ান সিল্ক, মেরিডিথ স্মল, বারবারাসুটস,ন্যান্সি থর্নহিল, মার্গো উইলসন প্রমুখ নারীবিজ্ঞানীরা। তাদের অনেকেই আবার স্ব স্ব পেশায় কাজ করতে গিয়ে নানা ধরনের জেন্ডারগত অসাম্যেরও শিকার হয়েছিলেন। আমি ২০০৭ সালে সারা পৃথিবী জুড়েই নারী গবেষকদের প্রতি জেন্ডারগত অসাম্যের নানা উদাহরণ হাজির করে একটি প্রবন্ধ লিখেছিলাম ‘হাইপেশিয়াঃ এক বিসৃতপ্রায় গণিতজ্ঞ নারীর বেদনাঘন উপাখ্যান’ শিরোনামে[৩৩৫]। লেখাটির প্রাসঙ্গিক কিছু অংশ উদ্ধৃত করার প্রয়োজনবোধ করছি এখানেও–
