এমন সময় মা ভাত নিয়ে এলেন।
আমরা বললাম–ঠাকুরদাদা, ভাত এনেছে মা।
—ও, এসো বউমা। কী রাঁধলে?
—মাছের ঝোল আর চচ্চড়ি।
—হরিশ আসেনি বউমা?
—না।
—এখনও এল না? রাত তো অনেক হয়েছে—
—রাত বেশি হয়নি। আপনি খেতে বসুন, আমি দুধ আনি।
—হরিশ এলে বোলো আমার সঙ্গে যেন দেখা করে।
মা চলে গেলেন। ঠাকুরদাদার সামনে দাঁড়ালে ঝুড়ি ঝুড়ি কথা বলতে হবে। ঠাকুরদাদা খাওয়া শেষ করে কিন্তু অন্য দিনের মতো শুতে গেলেন না, ঠায় অনেক রাত পর্যন্ত রোয়াকে বসে রইলেন, আর কেবল মাঝে মাঝে যার-তার পায়ের শব্দ শুনে বাবার নাম ধরে ডাকতে শুরু করলেন।
অনেক রাত্রে মা বললেন—বাবা, আপনি এবার শুয়ে পড় ন। ফুচুকে পাঠিয়ে দিই, আপনাকে শুইয়ে আসুক।
—হরিশ এসেছে।
—না।
—কেন এল না এখনও?
—আপনার কিছু মনে থাকে না, তিনি গোয়াড়ি গিয়েছেন মনে নেই? বুধবারে আসবেন আপনাকে বলে গেলেন যে—শুয়ে পড় ন।
ঠাকুরদাদা বসে কী ভাবলেন। কথার উত্তর দিলেন না। হয়তো মনে পড়ল বাবার গোয়াড়ি যাওয়ার কথা। ফুচু গিয়ে তাঁকে শুইয়ে দিয়ে এল। অনেক রাতে শুনলাম, ঠাকুরদাদার ঘর থেকে কান্নার শব্দ আসছে। মা শুনে বললেন—দেখে আয় কী হল?
গিয়ে দেখি ঠাকুরদাদা বিছানার ওপর উঠে বসে কোণের দিকে হাত বাড়িয়ে লাঠি হাতড়াচ্ছেন। তিনি নাকি এখুনি বাবার সন্ধানে বেরুবেন। বাবা কেন আসেননি এখনও? তিনি মোটেই ঘুমুতে পারেননি নাকি। আমরা জানি, এ কথা ঠিক নয়। ঠাকুরদাদা বসে বসে ঢুলে পড়েন, তিনি না-ঘুমিয়ে আছেন এত রাত পর্যন্ত! ইস! তা আর জানিনে!
ঠাকুরদাদাকে বোঝাবার অনেক চেষ্টা করলাম। অবশেষে মা গিয়ে কড়াসুরে বললেন—আচ্ছা, বাবা, আপনার কাণ্ডখানা কী শুনি? ওরা ছেলেমানুষ, ওদের ঘুমোতে দেবেন না একটু? একশোবার আপনাকে বলা হচ্ছে তিনি গোয়াড়ি গিয়েছেন, বুধবারে আসবেন, আপনি কিছুতেই তা শুনবেন না। রাতদুপুরে উঠে বাধিয়ে দিয়েছেন গোলমাল। ওরকম করলে থাকুন আপনি সংসারে, আমি এক দিকে বেরুই।
মাকে ঠাকুরদাদা ভয় করতেন। মা ঘরে পা দিতেই তিনি বেশ নরম হয়ে এসেছিলেন, সুড়সুড় করে চাদর মুড়ি দিয়ে শুয়ে পড়লেন।
সকালে উঠে আমায় কাছে ডাকলেন–শোন মনু
—কী?
—দাদাভাই, দাদু আমার, একটা পয়সা দেব এখন–
ঠাকুরদাদা নিঃস্ব নিষ্কপর্দক লোক, তিনি পয়সা দেবেন এ-কথা যদিও আমি বিশ্বাস করি–নে, তবুও বলি—কী বলছেন?
—তোর বাবার চিঠি এসেছে?
—না।
—আজ কী বার?
—সোমবার।
—হরিশ কবে আসবে?
–বুধবারে।
—আচ্ছা যা।
বুধবারে বাবা কী জন্যে যেন এলেন না, কী জানি! ঠাকুরদাদা সারাদিন রোয়াকে বসে রইলেন, গম্ভীর মুখে তামাক খান আর মাঝে মাঝে বলেন—কে এল? অ হরিশ? কীসের পায়ের শব্দ রে, ও ফুচু, ও নীলু—
ফুচু বললে—আমাদের রাঙি গাই-এর বকনা, ঠাকুরদা।
-ও।
এইরকম চলল সারাদিন। রাত্রে খাবার সময় খেতে বসেছেন, আর মাঝে মাঝে কান খাড়া করে রেলগাড়ির শব্দ শোনবার চেষ্টা করছেন—মুখে কিছু বলেন না। হঠাৎ বড়ো গম্ভীর হয়ে গিয়েছেন। আমি তামাক সেজে ঘরে ঢুকতেই চমকে উঠে বললেন—কে?
—আমি মনু।
—ন-টার গাড়ি গিয়েছে জানিস?
-–এখনও যায়নি। আপনি শুয়ে পড়ুন।
—শব্দ পাসনি গাড়ির?
—না।
—ও।
বাবার কথা মুখেও আনলেন না। বললেন—পান ঘেঁচে এনেছিস? নিয়ে আয়।
বাবা তার পরদিনও এলেন না। ঠাকুরদাদা কিন্তু আশ্চর্য রকমের গম্ভীর হয়ে গিয়েছেন। আর কিছু জিগ্যেস করেন না বাবার নাম ধরে ডাকেনও না।
শুক্রবার দিন সন্ধের গাড়িতে বাবা বাড়ি এলেন। ঠাকুরদাদা অভিমানে কথাই বলেন না। বাবা বুঝতে পারলেন। মাকে বললেন—বাবার দেখছি রাগ হয়েছে— যাই দেখি ব্যাপার।
ঠাকুরদাদা তামাক খাচ্ছেন, বাবা গিয়ে বললেন—বাবা!
পায়ের ধুলো নিয়ে প্রণাম করলেন।
ঠাকুরদাদার মুখে কথা নেই।
—বাবা, কেমন আছেন?
ঠাকুরদাদা নিরুত্তর।
—বাবা, রাগ করেছেন নাকি? তা আমি আবার রানাঘাট যাচ্ছি কাল সকালবেলা।
-রাগ হয় না?
এবার ঠাকুরদাদা আর কথা না-বলে থাকতে পারলেন না। কেননা ওই যে বাবা বললেন, কাল সকালেই রানাঘাট যাবেন, ওতেই ঠাকুরদাদার রাগ জল হয়ে গিয়েছে একেবারে।
বাবা হেসে বললেন—আপনি রাগ করতে পারেন, তবে আমি পরের কাজ করি, কাজ সারতে গেলে দু-এক দিন দেরি হয়েই যায়।
—আমার জন্যি কী আনলি?
—ভালো জিনিস এনেছি। আপনার ভালো লাগবে। কেষ্টনগরের সরভাজা।
—তা দিতে বল বউমাকে। সে সময় মা কালীতলায় প্রদীপ দিতে গিয়েছিলেন। আসতে দেরি হল, ঠাকুরদাদা অধীর ভাবে বার বার আমাকে বলতে লাগলেন—এল তোর মা, ও মনু?
বাবা চলে গিয়েছেন নটবর বাঁড়ুজ্যের চণ্ডীমণ্ডপে পাশা খেলতে। ঠাকুরদাদা আমাদেরই বার বার জিগ্যেস করতে লাগলেন—যা না তোর মার কাছে।
ঠাকুরদাদার উদবেগের ন্যায্য কারণ যে ছিল না তা নয়। মা ঠাকুরদাদাকে বিশেষ পছন্দ করতেন না গোড়া থেকেই। তাঁর জন্যে খাবার এলে, বাবা দাঁড়িয়ে থেকে না-দিলে ঠাকুরদাদার ভাগ্যে অনেক সময় শূন্যের অঙ্ক লেখা হত, এ আমি জানি। মা বলতেন—ছেলেপিলেরা খাবে আগে, তা নয়, বাহাত্তুরে বুড়ো খোকনকে আগে খাওয়াও। অত আমার শ্বশুরভক্তি নেই। উনি আমার কী করেছেন কোন কালে? কখনো একখানা কাপড় দিয়েছেন পুজোর সময়—ওঁর হাতে যখন পয়সা ছিল, যখন পাইকপাড়ায় কাজ করতেন? আমি আজ আসিনি এ সংসারে, আমারও হয়ে গেল ত্রিশ বছর। আজই না-হয় ভীমরতি হয়েছে, কোন কালে উনি ভালো ছিলেন? ওই ছেলে আর ছেলে! আর সব যেন বানের জলে ভেসে এসেছিলাম!
