সেদিনই গভীর রাত্রে আমরা সবাই ঘুমিয়ে যখন, ঠাকুরদাদা নিজের ঘর খুলে হাতড়ে হাতড়ে বাইরের রোয়াকে এসে ডাকছেন—অ বউমা, অ হরিশ—
বাবা ধড়মড় করে উঠে বাইরে এসে বললেন—কী বাবা, কী হয়েছে? কী হয়েছে—
—বাবা হরিশ!
—কী হয়েছে?
–বউমা আমায় এখনও ভাত দিলে না। রাত কত হয়েছে দ্যাখ তো! আমি বসে বসে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম—ভাত হয়নি এখনও?
বাবা অবাক!
মা ঘুম-চোখে উঠে বললেন—কী?
–বাবা ভাত চাইছেন।
–বাব্বাঃ হাড়-মাস কালি হয়ে গেল। ঢের ঢের সংসার দেখেছি, ঢের ঢের শ্বশুর দেখেছি–কিন্তু এমনধারা কাণ্ডকারখানা কখনো শুনিওনি, কখনো দেখিওনি—
—চেঁচালে কাজ চলবে? ও কী! সবসময়—
ইতিমধ্যে আমার নির্বিকার ঠাকুরদাদা, যিনি চোখে ভালো দেখেন না, কানেও ভালো শোনেন না, আবার ডেকে উঠলেন—অ হরিশ! অ বউমা!
—যাই বাবা, যাচ্ছি।
—আমাকে ভাত দিয়ে যাও। খিদে পেয়েছে।
বাবা গিয়ে ঠাকুরদাদাকে সান্ত্বনা দিতে লাগলেন—অবোধ শিশুকে যেমন লোকে সান্ত্বনা দেয়। তিনি খেয়েছেন সন্ধ্যার পরেই, তাঁর বউমা ভাত দিয়ে গিয়েছে মাগুরমাছের ঝোল দিয়ে—মনে নেই তাঁর? তাঁকে ভাত না-দিয়ে কী বাড়ির কেউ খেতে পারে? এখন রাত দুটো। এখন কী ভাত খেতে আছে? এখন খেলে তাঁর অসুখ করবে। কাল সকালেই—খুব ভোরেই তাঁকে খেতে দেওয়া হবে, রাত তো ভোর হয়ে গেল। অমন করলে সবারই মনে কষ্ট দেওয়া হবে। অমন কী করা উচিত? ছিঃ!
ঠাকুরদাদা বালকের মতো আশ্বস্ত হয়ে বললেন—খেইছি?
—হ্যাঁ বাবা। আমার কথা বিশ্বাস করুন—মাগুরমাছ এনেছিলাম আপনার জন্যে হাট থেকে কিনে—তাই দিয়ে ভাত খেয়েছেন। সত্যি বলছি, আপনার সঙ্গে মিথ্যে কথা বলছিনে। চলুন, শোবেন আসুন—ঠাণ্ডা লাগবে—ঘরের মধ্যে আসুন–
–আচ্ছা, আচ্ছা।
—আসুন—
বাবা হাত ধরে ঠাকুরদাদাকে ঘরের মধ্যে নিয়ে গিয়ে যত্ন করে শুইয়ে দিয়ে চাদর দিয়ে ঢেকে দিয়ে আবার এসে শুয়ে পড়লেন।
মা বললেন—সহজে মিটল?
—মেটাতে জানলেই মেটে। এখন থেকে বাবার জন্যে দুটো ভাত রেখে দিলে কেমন হয়?
—হ্যাঁ, তারপর ওই বুড়ো বয়সে পেট ছেড়ে দিক এই শেষরাত্তিরে গিলে, তখন ঠ্যালা সামলাবে কে শুনি?
বাবা ন্যায্যপক্ষেই বলতে পারতেন, যে এতকাল সামলে আসছে, সে-ই সামলাবে। কিন্তু তা তিনি বললেন না। নীরবে গিয়ে আবার নিজের ছোট্ট খাটটিতে শুয়ে পড়লেন।
কাছারির কাজে বাবাকে কয়েক দিনের জন্য গোয়াড়িতে গিয়ে থাকতে হল।
যাবার সময় বার বার মাকে বলে গেলেন, ঠাকুরদাদার যেন কোনো অসুবিধে
-হয়। অযত্ন না-হয় একথাটা বলতে বোধ হয় সাহস করলেন না, তাহলে ধুন্ধুমার ঝগড়া বেধে যাবে। ঠাকুরদাদাকে গিয়ে বললেন—বাবা, আমি গোয়াড়ি যাচ্ছি, এই পাঁচ-ছ দিন দেরি হবে। একটু বুঝেসুঝে চলবেন, আপনার বউমাও তো কাজের লোক, ছেলেপুলে নিয়ে বিব্রত।
—কবে আসবি?
–বুধবার নাগাদ।
—আজ না-গেলে হত না? শনিবারের বারবেলা—নিশিকান্ত তরফদার বলত মেহেরপুরের কুঠির জমানবিশ ছিল, শনিবারের বারবেলা—
—কে বললে আজ শনিবার?
—তবে কী বার?
—শুক্রবার।
—তা কী করে হয়? তুই বললি পাঁচ দিন দেরি হবে, তবে আজ শনিবার হল?
—বাবার এত হিসেব এখনও মাথায় আছে? পাঁচ-ছ দিন বললাম যে—আপনি ভাববেন না, কোনো অসুবিধে হবে না আপনার।
বাবা তো চলে গেলেন, এদিকে দু-দিন বেশ কাটল। তার পরই ঠাকুরদাদা উৎপাত শুরু করলেন। রোজ সন্ধের পর অভ্যাসমতো বলেন—অ হরিশ!
কেউ উত্তর দেয় না।
মা আমাদের চোখ টিপে বারণ করে দিতেন বাবা বাড়ি আসেননি সে-কথা বলতে, কারণ তাহলে ঠাকুরদাদা উদবিগ্ন হয়ে উঠবেন।
—অ হরিশ, বাড়ি এলি? অ হরিশ!
আমি মায়ের শিক্ষামতো বলতাম—না, এখনও আসেননি বাবা।
—আজ কখন কাছারি গেল? আমাকে বলে গেল না?
আমরা উত্তর দিইনে।
—অ হরিশ!
–ঠাকুরদা, তামাক সেজে দেব?
এটিও মায়ের পরামর্শ। ওই একমাত্র উপায় ঠাকুরদাদাকে অন্যমনস্ক রাখবার। আমাদের বলতেন—বোস আমার কাছে।
আমি, আমার ছোটো ভাই নীলু-ফুচু ও দুই বোন সরলা আর বিনু ঠাকুরদাদাকে ঘিরে বসি।
—সবাই এসেছে?
—হুঁ।
—বিনু এসেছে? আমার কাছে এগিয়ে এসে বোস সব। শোন, সুদরবনে একশো ছাপ্পান্ন লম্বর লাটে আমার মনিবের কাছারি ছিল। পাইকপাড়ার রাজা ঈশ্বরচন্দ্র সিংহ। মস্ত বড়ো জমিদার। আমি যেখানে থাকতাম, সে কাছারির নাম ছিল গরানহাটির কাছারি। সুদরী আর গরান কাঠের জঙ্গল কিনা, তাই নাম ছিল গরানহাটি। একবার নোনাতলার খালে আমাদের ডিঙি লেগেছে, মাঘ মাসের দিন, জলে সোন নেমেছে—
—সে কী ঠাকুরদা?
—সোন মানে জোয়ার। বে-সোন মানে ভাটা—বে-সোনে নৌকো চলে না। সামনে, নোঙর করতে হয় ও-দিকির গাঙে। তারপর কী বলছিলাম?…
ওই হল মুশকিল। ঠাকুরদাদার কাছে গল্প শোনবার সুখ নেই, কেবল ভুলে যাবেন।
—বলছিলেন সোন নেমেছে জলে—
—হ্যাঁ, তার পরে দেখি এক মস্ত বাঘ জলে ডিঙির পাশে জল খাচ্ছে। আমাদের সঙ্গে উজিরালি বিশ্বেস ছিল বড়ো শিকারি, সে অমনি বন্দুকের চোঙ বাগিয়ে এক দ্যাওড় করলে। এক দেওড়, দু-দেওড়—ব্যস, বাঘ উলটে পড়ল খালের জলে। হ্যাঁ মনু?
—কি?
—তোর বাবা এল?
—না, এখনও আসেননি?
—গিয়ে দেখে এসো দাদাভাই আমার। অ হরিশ।
—আসেননি বাবা। গল্প বলুন ঠাকুরদা।
—দেখে এসো না দাদাভাই।
—দেখতে হবে না, আসেননি। এলে আপনার সঙ্গে কথা বলতেন না?
ঠাকুরদা আবার গল্প বলতে শুরু করলেন। বাঘের গল্প জমাতে পারলেন না, কেবল ভুলে যান, আবার গোড়া থেকে শুরু করেন। উলটো-পালটা করে ফেলেন, কখন বলেন শিকারির নাম উজিরালি বিশ্বেস, কখন বলেন তার নাম আজিমুদ্দি বিশ্বেস।
