একটা নাড় কিংবা এতটুকু আমসত্ব-ছেড়া পড়ত ঠাকুরদাদার ভাগ্যে।
বাবা নিজের হাতে খাবার নিয়ে ঠাকুরদাদাকে দিতেন বোধ হয় এইজন্যেই। আগে ঠাকুরদাদাকে না-খাওয়ালে বাবার যেন তৃপ্তি হত না।
আষাঢ় মাসে ঠাকুরদাদা জ্বরে শয্যাশায়ী হয়ে পড়লেন। আর উঠতে পারেন না। বাবা তাঁকে বিছানা থেকে উঠিয়ে মুখ ধুইয়ে কাপড় ছাড়িয়ে ওষুধ খাইয়ে দেন। বেদানার রস করে মিছরির গুঁড়ো মিশিয়ে খাওয়ান। কাছারি থেকে আসবার পথে ঠাকুরদাদার ঘরে কিছুক্ষণ বসে তবে এসে স্নানাহার করেন। কী উদবেগ তাঁর ঠাকুরদাদার অসুখের জন্যে।
মাকে বলতেন—বাবার জ্বর কত? দেখেছিলে? উনি তো ভুলে যান, ওষুধ ঠিকমতো দেবে।
সেরে উঠেও ঠাকুরদাদা প্রায় দু-মাস বিছানা ছেড়ে উঠতেই পারেন না। বাবা আজ ছাগলের দুধ, চাল কুমড়োর মেঠাই, পরশু আমলকীর মোরব্বা—যে যা বলে তাই জোগাড় করে নিয়ে এসে খাওয়ান, ঠাকুরদাদা গায়ে বল পাবেন বলে।
ঠাকুরদাদাও হয়ে গেলেন একেবারে বালক। তাঁর উৎপাতের জ্বালায় বাড়িসুদ্ধ। লোক অতিষ্ঠ হয়ে উঠল। কেবল দিনরাত খাইখাই আর একে ডাকছেন তাকে ডাকছেন। আমরা পারতপক্ষে কোনো দিনই কেউ ঠাকুরদাদার ঘেঁষ বড়ো একা নিইনে, এখন তো একেবারে ত্রিসীমানায় ঘেঁষিনে। দশ ডাক দিলে একবার উত্তর দিই কী না-দিই। মা ভাতের থালা দিয়ে আসেন নিয়ে আসেন, এই পর্যন্ত।
কথার জবাব দিলেও খুব হৃষ্টচিত্তে দেন না। যা দেন, তাও আবার অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত। অথচ সেই মা-ই নদীর ঘাটে বাঁড়ুজ্যেগিন্নির সঙ্গে এক ঘণ্টা ধরে হাবড়হাটি বকেন।
ঠাকুরদাদা অসহায় শিশুর মতো বাবার পথ চেয়ে বসে থাকেন। বাবার পায়ের শব্দ পেলেই সুর ধরেন—অ হরিশ, এলি? অ হরিশ!
আর ঠিক কী বাবার পায়ের শব্দ চেনেন ঠাকুরদাদা।
বাবা এসে নিজে দেখাশোনো করবেন, নাওয়াবেন খাওয়াবেন ঠাকুরদাদাকে।
বাবা এলেই ঠাকুরদাদা যত কিছু অভিযোগ শুরু করে দেবেন। তাঁর কাছে ছেলেমানুষের মতো—বউমা আমাকে এ করেনি, আমাকে তা দেয়নি। তাতে ঠাকুরদাদা মায়ের সহানুভূতি আরও হারাতেন।
বাবা তা জানতেনও। সেজন্যে নিজে সর্বদা খবরদারি করতেন।
কারও হাতে ঠাকুরদাদাকে ছেড়ে দিয়ে বাবার বিশ্বাস হত না। দিদি ছাড়া। দিদি তো শ্বশুরবাড়ি চলে গিয়েছে।
পৌঁষ মাসে বাবা আবাদে গেলেন পৌঁষ-কিস্তির খাজনা আদায় করতে। বার বার মাকে বলে গেলেন ঠাকুরদাদার যেন অযত্ন না-হয়।
মা বললেন—কেন, আমি কী বুড়োকে গলা টিপে মেরে ফেলব নাকি?
—ছিঃ, অমন বলতে নেই।
—না, তুমি সেইরকম কথাবার্তা বলছ কিনা তাই বলছি। তবে আমার সংসারের কাজকর্ম সেরে সব দিক দেখতে তো পারি নে। যত দূর পারি, চিরকাল যা হয়ে আসছে, তাই হবে।
—একটু মন দিয়ে—মানে, উনি বুড়ো মানুষ—
—আমি তা জানি। যা পারি হবে—ভেব না।
বাবা ঠাকুরদাদার কাছে বিদায় নেবার সময় কতদিন দেরি হবে তা ঠিক বললেন। বললে ঠাকুরদাদা হয়তো যেতে দেবেন না কিংবা ব্যস্ত হয়ে পড়বেন। বাবা যখন বেরুলেন, ঠাকুরদাদা বললেন—অ হরিশ, কবে ফিরবি?
তাঁর চিরন্তন প্রশ্ন।
—এই যত শিগগির হয় বাবা, আপনি ভাববেন না। ঠাকুরদাদাকে ফেলে কোথাও গিয়ে বাবা স্বস্তি পেতেন না আমি জানি। ঠাকুরদাদা নাকি তিন বছর বয়স থেকে বাবা ও মার মতো করে মানুষ করেন বাবাকে ঠাকুরমায়ের মৃত্যুর পরে। বাবা যেন ভাবতেন ঠাকুরদাদা শত্ৰুপুরীর মধ্যে বাস করছেন—চতুর্দিকে শত্ৰুবেষ্টিত অবস্থায়—একমাত্র আপনারজন তিনি নিজে। চোখে চোখে রাখতেন এইজন্যে সর্বদা। কারও হাতে ছেড়ে দিয়ে বিশ্বাস করতেন না। বলাবাহুল্য, ঠাকুরদাদা তো নিজেকে অসহায় শত্ৰুবেষ্টিত বলে মনে করতেনই।
বাবা এবার বাড়ি ফিরতে বড়ো দেরি করতে লাগলেন।
অবশেষে যখন ফিরলেন তখন গোরুরগাড়ি করে ভীষণ অসুস্থ অবস্থায়। ঘোর জ্বর। জ্বরের ঘোরে বলতে লাগলেন—বাবাকে কেউ বোলো না আমি অসুস্থ হয়ে বাড়ি এসেছি।
ঠাকুরদাদা কিন্তু আন্দাজে মাঝে মাঝে বাবাকে ডাক দিতেন। বুঝতে পেরেছিলেন কিনা কী জানি।
—অ হরিশ! আমার জন্যি কী আনলি, অ হরিশ?
বাবা ঠিক শুনতে পান। জ্বরে ধুঁকতে ধুঁকতে বললেন—বাবা বাঁচতে আমার যেন কিছু না-হয়, হে ভগবান। মরেও সুখ পাব না।
অসুখ বড়ো বড়ল। জেলা থেকে ডাক্তার এসে দেখল দু-দিন। সংসারের পুঁজি ভেঙে বাবার চিকিৎসা হল।
একদিন বড়ো বাড়াবাড়ি হল। ঠাকুরদাদাকে আর দেখাশোনা করার লোক নেই, বাবাকে নিয়েই সবাই ব্যস্ত। গ্রামের ত্রিলোচন ঠাকুরদাদার কাছে বসে তাঁকে বাজে গল্পে ভুলিয়ে রাখলে।
সবাই বলতে লাগল—সুবোধ আর বাঁচবে না। আহা, বুড়োর কী কপাল!
বাবার মৃত্যু হল শেষরাত্রে।
ঠাকুরদাদা তার কিছুই জানেন না। গভীর ঘুমে অচেতন।
খুব ভোরে বাড়িতে এসে ত্রিলোচন চক্রবর্তী ঠাকুরদার হাত ধরে ছুতো করে বাইরে নিয়ে গেল।
—চলুন জ্যাঠামশাই একটু বড়দার বাড়িতে। আপনাকে একটু পায়ের ধুলো দিতে হবে সেখানে, তারা বলেছে।
—আমি যাব?
কান্নাকাটির চাপা শব্দে বলতে লাগলেন—কী রে, অ হরিশ, কী রে? কীসের শব্দ?
সন্ধ্যায় আমরা বাড়ি এসে ঠাকুরদাদাকে ঘিরে বসি। হঠাৎ আমার বড়ো মমতা হল ঠাকুরদাদার অসহায় মুখের দিকে চেয়ে।
নতুন কেমন একটা মমতা—যা এতদিন মনের মধ্যে খুঁজে পাইনি।
দুর্মতি
নিশ্চিন্তপুর গ্রামের প্রান্তে হরিচরণ রায়ের ছোটো একখানা কোঠাবাড়ি ছিল। সংসারে থাকিবার মধ্যে তাহার স্ত্রী আর এক ছেলে। হরিচরণ রায়ের বয়স বছর ত্রিশেক, স্ত্রীর বয়স একুশ-বাইশ। হরিচরণ রায়ের লেখাপড়া এমন বিশেষ কিছুই জানা ছিল না, তাহার উপর নিতান্তই পাড়াগেঁয়ে মানুষ; কাজেই কোথাও না যাইয়া তিনি বাড়ি বসিয়া পৈতৃক আমলের সামান্য একটু জমিজমার খাজনা সাধিতেন। কচু কুমড়া বেগুন—আবাদ করিতেন ঠিক বলা চলে না—পুঁতিতেন; ইহাতেই তিন প্রাণীর একপ্রকার কষ্টেসৃষ্টে সংসার চলিয়া যাইত।
