কিছুক্ষণ পরে ঠাকুরদাদা বসে বসে আপনমনে কী বকতেন। একটু বেশি বেলায় বাবা নায়েবি করে কাছারি থেকে ফিরে বাড়ি ঢুকলেই ঠাকুরদাদা অমনি কান খাড়া করতেন। কে এল? হরিশ?
—হ্যাঁ বাবা।
—বাবা হরিশ, আমার বড্ড খিদে পেয়েছে।
—সে কী বাবা, আপনাকে এখনও ভাত দেয়নি?
–না বাবা। খিদেয় মরছি, অ হরিশ। ভাত দিতে বলে দে। বা
বার বয়স পঞ্চাশের ওপর। মাথার চুল প্রায় সব সাদা হয়ে গিয়েছে, বেশ মোটা-সোটা নাদুস-নুদুস চেহারা, সবাই বলে বাবা নাকি দেখতে সুপুরুষ।
বাবা মাকে অনুযোগ করলেন—আচ্ছা বাবাকে এখনও ভাত দাওনি? ছি ছি, এত বেলা হল!
মা বললেন—ওমা, সে কী গো! দশটার সময় যে আমি নিজের হাতে খাইয়ে এসেছি।
বাবা চেঁচিয়ে ডেকে বললেন-ও বাবা–
—কী হরিশ?
—আপনাকে আপনার বউমা খাইয়ে এসেছে যে? কী বলছেন আপনি?
-না না, অ হরিশ, মিথ্যে কথা। আমারে কেউ ভাত দেয়নি, না-খেয়ে মলাম আমি—
বলেই ঠাকুরদাদা ছেলেমানুষের মতো খুঁতখুঁত করে কান্না শুরু করে দিলেন।
মা রাগ করে বলে উঠলেন—বুড়ো বাহাত্তুরে, মরেও না, সাতকাল জ্বালাবে। তোমার সাধের হিমি গিয়ে তোমায় খাওয়াক মাখাক—আমি আর যদি কাল থেকে তোমায় দেখি, তবে আমি বেণী মুখুজ্যের—
বাবা দুঃখিত স্বরে বললেন—আহা-হা, বড়োবউ-ছেলেপিলের সামনে—
—কী ছেলেপিলের সামনে? কে না-জানে সোহাগের হিমির কথা? বাহাত্তুরে বুড়ো, চারকালে গিয়ে ঠেকেছে—
—আহা-হা বড়োবউ! অমন করে গুরুজনকে বলতে আছে? ছি, ছি, তোমার মুখখানা আজকাল বড্ড—
ঠাকুরদাদা তখনও কিন্তু কাঁদছেন ছেলেমানুষের মতো।
কান্নার মধ্যে ডাকলেন—অ হরিশ।
যেন অসহায় আর্ত বালক তার একমাত্র আশ্রয়স্থল পিতাকে ডাকছে।
বাবা জামা-টামা না-খুলেই ছুটে গেলেন, সান্ত্বনার সুরে বললেন—কী বাবা, কী?
—আমি ভাঁত খাঁব—আঁমি না-খেঁয়ে মলাম, অ হঁরিশ! ওরা আমায় নাঁ-খেতে দিয়ে মরবে—খুঁত—খুঁত–
—বাবা, কাঁদবেন না। কাঁদতে নেই। ছিঃ, অমন কাঁদতে আছে!
মা অমনি এ রোয়াক থেকে বলে উঠলেন—আ মরণ, বুড়ো বাহাত্তুরের মরণ দ্যাখো না, যেন দু-বছরের খোকা, ছেলের কাছে কেঁদেই খুন—যমের ভুল এমনও হয়।
বাবা বলেন—আঃ, চুপ করো না বড়োবউ—কী করো!
ঠাকুরদাদা আবার বলেন—খিদে পেয়েছে—ভাত খাব—
–আচ্ছা আচ্ছা, আমি দেখছি—আপনি চুপ করুন।
অবশেষে আবার সামান্য দুটি ভাত বাবা নিয়ে দিয়ে এলেন। ঠাকুরদাদা দিব্যি খেতে বসে গেলেন আবার। মুখে আর হাসি ধরে না।
আমরাও ঠাকুরদাদার কাণ্ড দেখে হেসে বাঁচিনে।
এমনি একদিন নয়, মাসের মধ্যে দশ দিন হত। ইতিমধ্যে দিদি শ্বশুরবাড়ি চলে গেল।
বাবাকে দেখতাম, ঠাকুরদাদার যত কিছু কাজ নিজের হাতে করতেন। কিন্তু তাঁর সময় নেই, সকালে উঠে সন্ধ্যাহ্নিক করে জল-বাতাসা খেয়ে তিনি বেরিয়ে যেতেন কাছারির কাজে। দুপুরে এসে খেয়ে সামান্য বিশ্রাম করে কাজে বেরুতেন, ফিরতে রাত আটটা ন-টা বাজত। এসেই ঠাকুরদাদার ঘরে ঢুকে জিজ্ঞেস করতেন–বাবা, শরীর ভালো আছে? এদিকে ঠাকুরদাদাও সারাদিনের যত অভাব অভিযোগের কাহিনি জমিয়ে রাখতেন ছেলের সামনে পেশ করবার জন্যে সেই সময়।
—আর বাবা, শরীর ভালো! একটু তামাক, তা কেউ দেয় না। টিকে ভিজে, আগুনও ধরল না। আজ এমন মশা কামড়াতে লাগল দুপুরবেলা, মশারিটা কেউ টাঙিয়েই দিলে না—এই দ্যাখো না পিঠটা—
তার পর কাঁদা-কাঁদা সুরে বললেন—তুই একটু হাত বুলিয়ে দে হরিশ—
বাবা বসে বসে হাত বুলিয়ে দিতে থাকেন।
—তুই বাড়ি না-থাকলে আমাকে সবাই অগ্রাহ্যি করে। এক ঘটি জল চাইলে সময়মতো দেয় না বাবা।
—সত্যি তো! আহা, আমি সব বলে ঠিক করে দেব এখন।
—দিস। ভালো করে বলে দিয়ে যাস তো।
—দেব।
—তোর খাওয়া হয়েছে?
–না বাবা, এই তো এলাম।
—যা তুই, হাত-পা ধুয়ে জল-টল খা—তোকে পেটভরে খেতে দিচ্ছে তো?
—হ্যাঁ বাবা।
—দেখি সরে আয় তো! একটু মোটা-সোটা হলি, না সেইরকম আছিস? জানিস, ছেলেবেলায় তোর শরীর ছিল এমনি রোগা। তোর গর্ভধারিণী একদিন বললে, খোকার জন্যে ছাগলের দুধের ব্যবস্থা করো। তখন মেহেরপুরে নীলকুঠিতে কাজ করি। সেইখানেই তোর জন্ম, জানিস তো? হ্যাঁ মেহেরপুরের ইয়ে—ওই কি বলছিলাম ভুলে গেলাম—আজকাল কিছু মনেও থাকে না—
–ছাগলের দুধ।
—হ্যাঁ, ছাগলের দুধ আনতে বললে তোর গর্ভধারিণী। সাহেবের একটা বড়ো ছাগল ছিল। মালির সঙ্গে ষড় করে ফেললাম, মাসে দু-টাকা করে দেব—আর সে আধ সের করে ছাগলের দুধ আমায় দেবে–
বাবা ওঠেন না সেখান থেকে, যতক্ষণ ঠাকুরদাদা একটু শান্ত না-হন।
ভাত খেয়ে বাবার সঙ্গে গল্প করে ঠাকুরদাদা খুশিমনে বলেন—তা হলে তুই এখন যা হরিশ, খেয়ে নিয়ে—দুধ পাচ্ছিস তো?
—হ্যাঁ বাবা।
—ভালো করে দুধ খাবি। দুধেই বল।
—না বাবা, দুধ ঠিক খাচ্ছি।
বাবা চলে গেলেন। যাবার আগে ঠাকুরদাদাকে বিছানায় শুইয়ে নিজের হাতে একটা মোটা চাদর ওঁর গায়ে ঢেকে দিলেন।
—চাদর খুলবেন না বাবা, ঠাণ্ডা লাগবে।
মা বকতেন—হল বাপের সেবা? বাব্বাঃ, এমন কীর্তিও কখনো দেখিনি!
বাবা একটু লজ্জা ও সংকোচের সঙ্গে বলতেন—আঃ, চুপ করো—
—কেন চুপ করব? বুড়ো বাপের আবদার যেন দু-বছরের খোকার আবদার এমন কাণ্ড যদি কখনও দেখেছি!
-না দেখেছ না দেখেছ, থামো তুমি। ওই যে-ক-দিন বুড়ো আছে, তার পর আর—
—সে সবাই জানে, তার পর কী আর তুমি বুনোপাড়ার দিগম্বর বুনোর সেবা করবে? এসো, দুটো খেয়ে নিয়ে আমার মাথা কিনবে এসো।
