জটি পিসিমা সবেমাত্র সদর দোর খুলে দোরগোড়ায় জলের ধারা দিচ্ছেন, ওকে এত সকালে দেখে অবাক হয়ে বললেন, “কীরে খোকা?”
গোপাল একগাল হেসে বললে, “তোমার জন্যে তাল এনিচি পিসিমা।”
জটি পিসিমা আর কিছু না-বলে তাল দুটো হাতে করে নিয়ে বাড়ির ভেতর চলে গেলেন।
গোপাল একবার ভাবলে, তালনবমী কবে জিগ্যেস করে; কিন্তু সাহসে কুলোয় না তার। সারাদিন গোপালের মন খেলাধুলোর ফাঁকে কেবলই অন্যমনস্ক হয়ে পড়ে। ঘন বর্ষার দুপুরে, মুখ উঁচু করে দেখেনারকোল গাছের মাথা থেকে পাতা বেয়ে জল ঝরে পড়চে, বাঁশঝাড় নুয়ে নুয়ে পড়ছে বাদলার হাওয়ায়, বকুলতলার ডোবায় কটকটে ব্যাঙের দল থেকে থেকে ডাকছে।
গোপাল জিগ্যেস করলে, “ব্যাংগুলো আজকাল তেমন ডাকে না কেন মা?”
গোপালের মা বলেন, ‘নতুন জলে ডাকে, এখন পুরোনো জলে তত আমোদ নেই ওদের।”
“আজ কী বার, মা?”
“সোমবার। কেন রে? বারের খোঁজে তোর কী দরকার?”
“মঙ্গলবারে তালনবমী, না মা?”
“তা হয়তো হবে। কি জানি বাপু! নিজের হাঁড়িতে চাল জোটে না, তালনবমীর খোঁজে কী দরকার আমার?”
সারাদিন কেটে গেল। নেপাল বিকেলের দিকে জিগ্যেস করলে, “জটি পিসিমার বাড়িতে তাল দিইছিলি আজ সকালে?” কোথায় পেলি তুই? আমি তাল দিতে গেলে পিসি বললেন, “গোপাল তাল দিয়ে গেছে, পয়সা নেয়নি”—“কেন দিতে গেলি তুই? একটা পয়সা হলে দুজনে মুড়ি কিনে খেতাম!”
“ওরা নেমন্তন্ন করবে, দেখিস দাদা, কাল তো তালনবমী!”
“সে এমনিই নেমন্তন্ন করবে, পয়সা নিলেও করবে। তুই একটা বোকা!”
“আচ্ছা দাদা, কাল তো মঙ্গলবার না?”
“হুঁ।”
রাত্রে উত্তেজনায় গোপালের ঘুম হয় না। বাড়ির পাশের বড়ো বকুলগাছটায় জোনাকির ঝাঁক জ্বলচে; জানলা দিয়ে সেদিকে চেয়ে চেয়ে সে ভাবে—কাল সকালটা হলে হয়। কতক্ষণে যে রাত পোহাবে!…
জটি পিসিমা আদর করে ওকে বললেন খাওয়ানোর সময়, “খোকা, কাঁকুড়ের ডালনা আর নিবি? মুগের ডাল বেশি করে মেখেনে।” জটি পিসিমার বড়ো মেয়ে লাবণ্যদি একখানা থালায় গরম গরম তিল-পিটুলি ভাজা এনে ওর সামনে ধরে হেসে বললে, “খোকা, ক-খানা নিবি তিল-পিটুলি?”—বলেই লাবণ্যদি থালাখানা উপুড় করে তার পাতে ঢেলে দিলে। তার পর জটি পিসিমা আনলেন পায়েস আর তালের বড়া। হেসে বললেন “খোকা যাই তাল কুড়িয়ে দিয়েছিলি, তাই পায়েস হল!…খা, খা,আজ যে তালনবমী রে!”…কত কী চমৎকার ধরনের রাঁধা তরকারির গন্ধ বাতাসে! খেজুরগুড়ের পায়েসের সুগন্ধ বাতাসে! গোপালের মন খুশি ও আনন্দে ভরে উঠল। সে বসে বসে খাচ্ছে, কেবলই খাচ্ছে।…সবারই খাওয়া শেষ, ও তবুও খেয়েই যাচ্ছে…লাবণ্যদি হেসে হেসে বলছে, “আর নিবি তিল-পিটুলি?”…
“ও গোপাল?”
হঠাৎ গোপাল চোখ চেয়ে দেখলে—জানালার পাশে বর্ষার জলে ভেজা ঝোপঝাড়, তাদের সেই আতাগাছটা…সে শুয়ে আছে তাদের বাড়িতে। মার হাতের মৃদু ঠেলায় ঘুম ভেঙেছে, মা পাশে দাঁড়িয়ে বলছেন, “ওঠ ওঠ, বেলা হয়েচে কত! মেঘ করে আছে তাই বোঝা যাচ্ছে না!”
বোকার মতো ফ্যালফ্যাল করে সে মায়ের মুখের দিকে চেয়ে রইল।
“আজ কী বার, মা…?”
“মঙ্গলবার।”
তাও তো বটে! আজই তো তালনবমী! ঘুমের মধ্যে ওসব কি হিজিবিজি স্বপ্ন সে দেখছিল?
বেলা আরও বাড়ল, ঘন মেঘাচ্ছন্ন বর্ষার দিনে যদিও বোঝা গেল না বেলা কতটা হয়েছে। গোপাল দরজার সামনে একটা কাঠের গুঁড়ির ওপর ঠায় বসে রইল। বৃষ্টি নেই একটুও, মেঘ-জমকালো আকাশ। বাদলের সজল হাওয়ায় গা শিরশির করে। গোপাল আশায় আশায় বসে রইল বটে, কিন্তু কই, পিসিমাদের বাড়ি থেকে কেউ তো নেমন্তন্ন করতে এল না!
অনেক বেলায় তাদের পাড়ার জগবন্ধু চক্কোত্তি তাঁর ছেলে-মেয়ে নিয়ে সামনের পথ দিয়ে কোথায় যেন চলেছেন। তাদের পেছনে রাখাল রায় ও তাঁর ছেলে সানু; তার পেছনে কালীবর বাড় জ্যের বড়ো ছেলে পাঁচু আর ও-পাড়ার হরেন…
গোপাল ভাবলে, এরা যায় কোথায়?
এ-দলটি চলে যাবার কিছু পরে বুড়ো নবীন ভটচাজ ও তার ছোটো ভাই দীনু, সঙ্গে একপাল ছেলে-মেয়ে নিয়ে চলেছে।
দীনু ভটচাজের ছেলে কুড়োরাম ওকে দেখে বললে, “এখানে বসে কেনরে? যাবিনে?”
গোপাল বললে, “কোথায় যাচ্ছিস তোরা?”
“জটি পিসিমাদের বাড়ি তালনবমীর নেমন্তন্ন খেতে। করেনি তোদের? ওরা বেছে বেছে বলেছে কিনা, সবাইকে তো বলেনি…”
গোপাল হঠাৎ রাগে, অভিমানে যেন দিশেহারা হয়ে গেল। রেগে দাঁড়িয়ে উঠে বললে, “কেন করবে না আমাদের নেমন্তন্ন? আমরা এর পরে যাব…”
রাগ করবার মতো কী কথা সে বলেচে বুঝতে না-পেরে কুড়োরাম অবাক হয়ে বললে, “বা রে! তা অত রাগ করিস কেন? কী হয়েছে?”
ওরা চলে যাবার সঙ্গে সঙ্গে গোপালের চোখে জল এসে পড়ল—বোধ হয় সংসারের অবিচার দেখেই। পথ চেয়ে সে বসে আছে ক-দিন থেকে। কিন্তু তার কেবল পথ চাওয়াই সার হল! তার সজল ঝাপসা দৃষ্টির সামনে পাড়ার হারু,
হিতেন, দেবেন, গুটকে তাদের বাপ-কাকাদের সঙ্গে একে একে তার বাড়ির সামনে দিয়ে জটি পিসিমাদের বাড়ির দিকে চলে গেল…
দাদু
ঠাকুরদাদা আমার শৈশবের অনেকখানি জুড়ে আছেন। সমস্ত শৈশব-দিগন্তটা জুড়ে আছেন। ছেলেবেলায় জ্ঞান হয়েই দেখেছি আমাদের বাড়িতে তিনি আছেন।
তাঁর বয়স হয়েছিল প্রায় একশো। জ্ঞান হয়ে পর্যন্ত দেখেছি তিনি আমাদের পশ্চিমের ঘরের রোয়াকে সকাল থেকে বসে থাকতেন। একটা বড়ো গামলায় গরমজল করে দিদি তাঁকে নাইয়ে দিত।
ঠাকুরদাদা চোখে ভালো দেখতে পেতেন না। তাঁকে সকালে হাত ধরে রোয়াকে নিয়ে এসে তাঁর জায়গাটিতে বসিয়ে দিতে হত। তামাক সেজে দিত দিদি। কেবল মা ঠাকুরদাদার ভাতের থালাটি নিয়ে গিয়ে তাঁকে খাইয়ে আসতেন। দিদি আবার তামাক সেজে দিত।
