-–কি রকম দেখলেন? কেমন চেহারা?
–ভারি রপসী যদি বলি কিছুই বলা হল না। মধুসুন্দরী দেবীর ধ্যানে আছে।
উদ্যদ্ ভানু প্রতীকাশা বিদ্যুৎপুঞ্জনিভা সতী
নীলাম্বর পরিধানা মদবিহ্বললোচনা
নানালঙ্কারশোভাঢ্যা কস্তুরীগন্ধমোদিতা
কোমলাঙ্গীং স্মেরমুখীং পীনোত্তুঙ্গপয়োধরাম্
অবিকল সেই মূর্তি। তখন বুঝলাম দেবদেবীর ধ্যান মনগড়া কথা নয়, সাধুকে প্রত্যক্ষ করলে এমন বর্ণনা দেওয়া যায় না।
—আপনি কোন কথা বললেন?
–কথা! আমার চেতনা তখন লোপ পাবার মত হয়েছে—তো কথা বলছি। পাগল তুমি? সে–তেজ সহ্য করা আমার কম? সাধারণ মানবীর মত তার কোন জায়গাই নয়। ঐ যে বলেছে মদবিহললাৈচনা-ওরে বাবা সে চোখের কি ভাব! ত্ৰিভবন জয় হয় সে–চোখের চাউনিতে।…
আমি অধীর হইয়া বলিলাম বর্ণনা রাখুন। কি কথা হ’ল বলুন।
—কথাবার্তা যা হয়েছিল সব বলার দরকার নেই।
মোটের উপর সেই থেকে মধুসুন্দরী দেবী প্রতি রাত্রে আমায় দেখা দিতেন। নদীতীরের সেই নির্জন জায়গায় তাঁকে চেয়েছিলাম প্রিয়ারূপে—বলাই বাহুল্য, সাধুর কথা কে শোনে? তখন শীতকাল, বরাকর নদীর জল কম হয়েছে অনেক, জলের ধারে জলজ লিলিগাছ শুকিয়ে হলদে হয়ে এসেছে, আগে যেখানে জল ছিল, সেখানে বালির উপর অভ্রকণা জ্যোৎস্নারাত্রে চকচক করে, বরাকর নদীর দুপারের শালবন পাতা ঝরিয়ে দিচ্ছে! আকাশ রোজ নীল, রাত্রে শুক্লপক্ষের জ্যোৎস্নার বড় মনোরম শোভা—সেই সময় থেকে তিনটি মাস দেবী প্রতিরাত্রে দেখা দিতেন—সত্যিকার বাঁচা বেঁচেছিলাম ঐ তিন মাস। এসব কথাও বলা এখন আমার পক্ষে বেদনাদায়ক। কত বেদনাদায়ক তুমি জান না, আমার জীবনের যা সর্বশ্রেষ্ঠ আনন্দ তা পেয়েছিলম ঐ তিন মাসে। দেবীই বটে, মানুষের সাধ্য নেই অমন ভালবাসা, অমন নিবিড় বন্ধুত্ব দান করা—সে এক স্বর্গীয় দান…সে তুমি বুঝবে না, তোমায় কি বোঝাব, তুমি আমায় অবিশ্বাস করবে, মিথ্যেবাদী না হয় পাগল ভাববে। হয়ত ভাবছ এতক্ষণ। তুমি কেন আমার স্ত্রীই আমার কথা বিশ্বাস করে না, আমায় তান্ত্রিক সাধু পাগল করে দিয়েছিল গুণজ্ঞান করে।
কিন্তু সে সুখের প্রকৃতি ভীষণ তেজস্কর মদিরার মত। আমাকে তার নেশা দিনে দিনে কেমন যেন অপ্রকৃতিস্থ করে দিতে লাগলো। কিছু ভাল লাগে না। কেবল মনে হয় কখন সন্ধ্যা নামবে বরাকর নদীর শালবনে, কখন দেবী মধুসুন্দরী নায়িকার বেশে আসবেন! সারারাতি কোথা দিয়ে কেটে যাবে স্বপ্নের মত, নেশার ঘোরের মত। আকাশ, নক্ষত্র, দিকবিদিকের জ্ঞান লন্ত হয়ে যাবে কয়েক প্রহরের জন্যে কয়েক প্রহরের জন্যে সময় খির হয়ে নিশচই হয়ে ঋণর মত অচল হয়ে থেমে থাকবে বরাকর নদীতীরের বনপ্রাঙ্গণে।
একদিন ঘটল বিপদ।
একটি সাঁওতালী মেয়ে রোজ নদীর ঘাটে জল নিতে আসে—সুঠাম তার দেহের গঠন, নিকটের বস্তীতে তার বাড়ি। অনেক দিন থেকে তাকে দেখচি, সেও আমায় দেখছে।
সেদিন সে জল নিয়ে ফিরে যাচ্ছে। আমায় তাদের বাঁকা বাংলায় বললে–ছেলে হয়ে হয়ে মরে যায়, তার মাদুলি আছে তোমার কাছে সাধুবাবা?
এমন ভাবে করুণ সুরে বললে—আমার মনে দয়া হোল। মাদলি দিতে জানি একথা বলিনি, তবে তার সঙ্গে কিছুক্ষল গল্প করেছিলাম। তারপর সে চলে গেল।
মধুসুন্দরী দেবীকে সেদিন দেখলুম অন্য মতিতে। কি ভ্রূকুটি-কুটিল দৃষ্টি, কি ভীষণ মুখের ভাব! সে মুখের ভাব তুমি কল্পনা করতে পারবে না—চণ্ডিকা দেবীর রোষকটাক্ষে যেমন লোলজিহ্বা, করালিনী প্রচণ্ডা কালভৈরবী মূর্তির সৃষ্টি হয়েছিল—এও যেন ঠিক তাই।
সেদিন বুঝলুম আমি যার সঙ্গে মেলামেশা করি, সে মানুষ নয়—মানষের পর্যায়ে সে পড়ে না। মানবী রাগ যতই করুক সে করাসিনী হয় না, পিশাচী হয় না–মানবীই থেকে যায়।
ভীষণ পুতিগন্ধে সেদিন শালবন ভরে গেল–প্রতি দিনের মত কস্তুরীর সুবাস কোথায় গেল মিশিয়ে! তারপর এলেন মধুসুন্দরী দেবী–দেখেই মনে হোল এরা দেবীও বটে, বিদেহী পিশাচীও বটে। এদের ধর্মাধর্ম নেই, সব পারে এরা। যে হাতে নায়িকার মত ফুলের মালা গাঁথে, সেই হাতেই বিনা দ্বিধায়, বিনা অনুশোচনায়, নিমেষে ধংস করতে এরা অভ্যস্ত।
আমার ভীষণ ভয় হোল।
পিশাচী মধুসুন্দরী তা বুঝে বললে—ভয় কিসের?
বললুম—ভয় কই? তুমি রাগ করেছ কেন?
খল খল অট্টহাস্যে নির্জন অন্ধকার ভরে গেল। আমি শিউরে উঠলাম।
পিশাচী বললে—শব চিনতে পারবে? অন্ধকার রাত্রে সাঁওতালদের কোনো বৌয়ের শব তোমার সামনে দিয়ে যদি জলে ভেসে যায়—চিনতে পারবে? তুমি না যদি চিনতে পারো, দু’টি শবে জড়াজড়ি করে ভেসে থাকলে অন্য লোকে সকালে নিশ্চয়ই চিনবে।
হাত জোড় করে বললুম—দেবী, তোমায় ভালবাসি। ও মতি আমায় দেখিও না— আমায় মারো ক্ষতি নেই—কিন্তু অন্য কোন নিরপরাধিনী স্ত্রীলোকের প্রাণ কেন নেবে? দয়া করো।
বহু চেষ্টায় প্রসন্ন করলাম। তখন আবার যে দেবী, সে দেবী। বললেন—সেই সাঁওতালের মেয়ের মতিতে আমায় দেখতে চাও? সেই মতিতে এখনি দেখা দেবো।
বলতে বলতে সেই সাঁওতালদের মেয়েটি আমার সামনে দাঁড়িয়ে। বরং আরও নিটোল গড়ন শরীরের, মুখের ভাব আরও কমনীয়।
বললুম–ও চাই না—তোমার মতি দেখাও দেবী।
সেই রাত্রি থেকে বুঝলুম কালসাপ নিয়ে খেলা করছি আমি। গুরুদেব বারণ করেছিলেন এই জন্যেই। হয়তো একদিন মরবো এর হাতেই। সাপুড়ে সাপ খেলায় মন্ত্রে—আবার বেকায়দায় পড়লে সাপের ছোবলেই মরে। এভাবে বেশীদিন কিন্তু ছিল না। কিছুদিন পরে পিশাচী মতি ভুলে গেলাম দেবীর অনুপম প্রেমে ও মধুর ব্যবহারে। তাতেও বুঝলুম এ সাধারণ মানবী নয়–অমানুষিক ধরণের এদের মন। মানুষের বিবর্তনের জীব এরা নয়। হয় তার ওপরে, নয় তার নীচে।
