এতটা বলে সাধুজী ভাল করেন নি, আমার কৌতূহল বাড়িয়ে দিয়ে তিনি আমায় আর কি সামলে রাখতে পারেন? আমি নাছোড়বান্দা হয়ে পড়লাম, মন্ত্র নেই।
সাধুজী বললেন—তবে কনকবতী দেবী–সাধনার মন্ত্র নাও-কন্যাভাবে পাবে দেবীকে—
আমি চুপ করে রইলাম।
তিনি আবার বললেন—তবে কিঙ্কিণী–সাধনার মন্ত্র?
আঃ, কি বিপদেই পড়েছি বড়ো সাধুটাকে নিয়ে। অন্য যোগিনীদের দেখতে দোষ কি?
সাধু আমায় চুপ করে থাকতে দেখে বললেন—বেশ, আমি তোমাকে মধসুন্দরী দেবীসাধনার মন্ত্র দিচ্ছি। একে কন্যা ভাবে, ভগ্নী ভাবে বা ভার্যা ভাবে পেতে পার। তবে আমার যদি কথা শোন, কখনও ভার্যা ভাবে পেতে যেও না। এর বিপদের দিক বলি। ভার্যা ভাবে সাধন করলে তিনি তোমাকে প্রণয়ীর মত দেখবেন—কিন্তু এরা মহাশক্তিশালিনী যোগিনী, সাধারণ মানবী নয়, এদের আয়ত্তের মধ্যে রাখা বড় শক্ত। হয় তোমাকে পথিবীর মধ্যে সর্বাপেক্ষা সুখী মানুষ করে রাখবে, নয়তো একেবারে উন্মাদ করে ছেড়ে দেবে। সামলাতে পারা বড় কঠিন।
সাধুজী আমায় মন্ত্র দিলেন এবং বললেন–বাবা, এ জায়গা থেকে তোমায় চলে যেতে হবে। তোমায় এখানে আমি আর রাখতে পারি নে। এক জায়গায় দ’জন সাধকের সাধনা হয় না।
বেশ ভাল। আমিও তা চাইনে। আমার ভয় ছিল, হয়তো সাধুজীও মাতু পাগলীর মত হিপনটিজম, জানে, এবং খানিকটা অভিভূত করে যা-তা দেখাবে আমায়। তারপর
আমি তারানাথের কথায় বাধা দিয়া বলিলাম—কেন, আপনি যে স্বচক্ষে পঞ্চমুণ্ডির আসনে কি মতি দেখেছিলেন তখন তো সাধু সেখানে ছিলেন না?
–তারপর আমার টাইফয়েড জ্বর হয় বলি নি? হয়তো পঞ্চমুণ্ডির আসনে যখন বসে, তখনই জ্বর আসছে, সে–সময় জরের পর্বাবস্থায় অসুস্থ মস্তিষ্কে কি বিকার দেখে থাকব—হয়তো চোখের ধাঁধা। আর ছেড়ে সেরে উঠে এ সন্দেহ আমার হয়েছিল, সত্যি বলছি।
যাক সে কথা। তারপর ওখান থেকে চলে গেলাম বরাকর নদীর ধারে আর একটা নির্জন জায়গায়। ওখান থেকে পাঁচ–ছয় মাইল দূরে। একটা গ্রাম ছিল কিছু দুরে থাকতাম গ্রামের বারোয়ারী ঘরে। গ্রামের লোকে যে যা দিত তাই খেতাম, আর সন্ধ্যার পরে নদীর ধারে নির্জনে বসে মন্ত্র জপ করতাম।
এই রকমে একমাস কেটে গেল, দু–মাস গেল, তিন মাস গেল। কিছুই দেখিনে। মন্ত্রের উপর বিশ্বাস ক্রমেই যেন কমে যাচ্ছে। তবও মনকে বোঝালাম—ছ–মাস পরে পর্ণহতি ও হোম করার নিয়ম বলে দিয়েছিল সাধুজী। তার আগে কিছু হবে না। ছ’মাসও পর্ণ হ’ল। সাধুজী যেমন বলে দিয়েছিল, ঠিক সেই সব নিয়ম পালন করলাম।
পদ্মাসনং সমাস্থায় মৎস্যেন্দ্রনাথ সম্মতম্।
আমিষান্নৈঃ পুপসূপৈঃ সংপজ্য মধুসুন্দরীম্ ॥
বরাকর নদীর তীরে বসে ভাত রাঁধলম, কই মাছ পোড়ালম, আঙট কলার পাতায় ভাত ও পোড়ামাছের নৈবিদ্যি দিলাম। ডমরের সমিধ দিয়ে বালির উপর হোম করে ওঁ টং ঠং ঝং ইঁ ক্ষং মধুসন্দর্যৈ নমঃ এই মন্ত্রে আহুতি দিলাম। জাতিফলের মালা নিতান্ত দরকার, কত দুর থেকে খুঁজে জাতিফলের মালা এনেছিলাম—তার মালা ও চন্দন আলাদা কলার পাতায় রেখে দেবীর উদ্দেশে নিবেদন করে ধ্যানে বসলাম—সারারাত কেটে গেল।
বললাম—কিছু, দেখলেন?
—কা কস্য পরিবেদনা। ঘি, চন্দন, মিষ্টি কিনতে কেবল কতকগুলো পয়সার শ্রাদ্ধ হয়ে গেল। ধ্যান–জপ–হোমে কিছই ফল ফলল না। রাগ করে টান মেরে সব নৈবিদ্যি ফেলে দিলাম নদীর জলে। বেটা সাধু বিষম ঠকিয়েছে। কোনো ব্যাটার কোনো ক্ষমতা নেই—যেমন মাতু পাগলী তেমনি এ সাধ। তন্ত্রট সব বাজে, খানিকটা হিপনটিজম, জানে—তার বলে মূর্খ গ্রাম্যলোককে ঠকিয়ে খায়।
এ-সব ভাবি বটে, জপটা কিন্তু ছাড়তে পারিনি, অভ্যেসমত করেই যাই, ওটা যেন একটা বদ অভ্যেসে দাঁড়িয়ে গিয়েছিল।
এ-ভাবে আরও মাস চার–পাঁচ কেটে গেল।
একদিন সন্ধ্যার পরেই। রাত তখন হয়েছে সবে, আধ ঘণ্টাও হয়নি। আমি একটা গাছের তলায় বসে জপ করছি, অন্ধকার হলেও খুব ঘন হয় নি তখনও-হঠাৎ তীব্র কস্তুরীর গন্ধ অনুভব করলাম বাতাসে। বেশ মন দিয়ে শুনে যাও। এক বণও মিথ্যে বলিনি। যা যা হ’ল একটার পর আর একটা বলছি মন দিয়ে শোন। কস্তুরীর গন্ধটা যখন সেকেণ্ড চার-পাঁচ পেয়েছি তখন আমার সেদিকে মন গেল। ভাবলাম এ দেখছি অবিকল কস্তুরীর গন্ধ! বাঃ, পাহাড়ে জঙ্গলে কত সুন্দর অজানা বনফলই আছে!
তারপরেই আমার মনে হল আমার পেছনে অর্থাৎ যে-গাছটার তলায় বসে ছিলাম তার গুঁড়ির আড়ালে কে একজন এসে দাঁড়িয়েছে। আমি পেছন থেকে দেখতে পাচ্ছি নে বটে কিন্তু অনেক সময় লোকের উপস্থিতি চোখে না-দেখেও এভাবে ধরা যায়। আমার সমস্ত ইন্দ্রিয় তখন যেন অতিমাত্রায় সজাগ ও সতর্ক হয়ে উঠেছে।
বাতাস যেন বন্ধ হয়ে গেল, সমস্ত শরীর দিয়ে যেন গরম আগুনের হলকা বেরুচ্ছে মনে হ’ল। আবার অজ্ঞান হয়ে যাব নাকি? ভয় হ’ল মনে। ঠিক সেই সময় আমার সামনে দেখলাম একটি মেয়ে দাঁড়িয়ে। আধ সেকেণ্ড আগেও তিনি সেখানে ছিলেন না। ঠিক সেই পঞ্চমুণ্ডির আসনে বসার রাত্রের সেই অভিজ্ঞতার পুনরাবৃত্তি। কিন্তু এবার মনে মনে দৃঢ়সঙ্কল্প করলাম জ্ঞান হারাব না কখনই।
মেয়েটি দেখি একুটির সঙ্গে আমার দিকে চেয়ে রয়েছে।
জিজ্ঞাসা করিলাম—নিজের চোখে এমনি এক মতি দেখলেন আপনি?
আমার কথার মধ্যে হয়তো একট, অবিশ্বাসের গন্ধ পাইয়া তারানাথ উগ্র প্রতিবাদের সুরে বলিল—নিজের চোখে। সুস্থ শরীরে। বিশ্বাস কর না-কর সে আলাদা কথা–কিন্তু যা দেখেছি তাকে মিথ্যে বলতে পারব না।
