একদিন দেবী আমায় বললেন—আর কিছুদিন যাক, তোমায় বহর নিয়ে যাবো–
—কোথায়?
—সে বলবো না এখন।
—কতদূরে? কোন দিকে?
—এতদূরে এমন দিকে যা তুমি ধারণা করতে পারবে না। তবে তোমার ভাগ্যে আছে কি তা?
সব ভুলে গেলাম তাবার। পিশাচিনী মধুসুন্দরী তখন কোথায় মিলিয়ে গেছে আমার সামনে হাস্যলাস্যময়ী, যৌবনচঞ্চলা, মঞ্চস্বভাবা অপরুপ রুপসী এক তরণী নারী। দেবীই বটে।
আমি আবার কিসের নেশায় অভিভত হয়ে পড়লম, মাথার ঠিক রইল না।
একদিন বললেন—বিপদ আসচে তোমার, তৈরী হও।
-–কি বিপদ?
–তা বলবো না।
—প্রাণ-সংশয়ের বিপদ?
–তা বলবো না।
–তুমি অভয় দিলে বিপদ কিসের?
—আমি ঠেকাতে পারবো না। কেউ ঠেকাতে পারবে না। যা আসছে, তা আসবেই। কথা খেটে গেল শীগগির,, খুব বেশী দেরি হয়নি।
তিন মাস পরে আমার বাড়ি থেকে লোকজন সধানে সন্ধানে সেখানে গিয়ে হাজির। গ্রামের লোক তাদের বলেছে কে একজন পাগল, বোধ হয় বাঙালীই হবে, অল্প বয়সে বরাকর নদীর ধারে শালবনে সন্ধ্যাবেলা বসে থাকে—আর আপন মনে বিড় বিড় করে বকে। আমায় এ অবস্থায় গাঁয়ের অনেকেই নাকি দেখেছে।
তাই শুনে বাড়ির লোক আমায় গিয়ে খুঁজে বার করলে। ছেঁড়া ময়লা কাপড় পরনে, মাথায় জট, গায়ে খড়ি উড়ছে—এই অবস্থায় নাকি আমায় ধরে। বাড়ি ধরে আনবার জন্যে টানাটানি, আমি কিছুতেই আসব না, ওরাও ছাড়বে না। আমার তখন সত্যিই জ্ঞান নেই, সত্যিই আমি ক্ষিপ্ত, উন্মাদ। ওরা হয়তো আমায় আনতে পারত না—কিন্তু যে দেবীকে পেয়েছিলাম প্রণয়িনী রূপে, তিনি নিরুৎসাহ করলেন।
–কি রকম?
ওরা ধরে নিয়ে গিয়ে নিকটবতী গ্রামের একটি গোয়ালঘরে আমায় বেধে রেখেছিল। গভীর রাত্রে বাঁধন ছিঁড়ে ওদের হাত থেকে লুকিয়ে পালিয়ে সেই একটি রাত মধসুন্দরী দেবীর সঙ্গে দেখা করেছিলাম। দেবীকে বললাম—আমি এই নদীতীরের তীর্থস্থান ছেড়ে কোথাও যাব না। তিনি নিষ্ঠুর হাসি হেসে বললেন—যেতে হবেই, এই আমার অদৃষ্টলিপি। অদৃষ্টের বিরুদ্ধে তিনি অত বড় শক্তিশালিনী যযাগিনী হয়েও যেতে পারেন না। তিনি জানেন, এই রাতের পরে জীবনে তাঁর সঙ্গে আর কখনও দেখা হবে না। আগে থেকে বলে তৈরী করে রাখতে চেয়েছিলেন এই জন্যেই।
দেবী ত্রিকালজ্ঞা, তাঁকে জিজ্ঞেস করিনি কি করে তিনি একথা জানলেন। হ’লও তাই, বাড়ী আসার পরে সবাই বললে কে কি খাইয়ে পাগল করে দিয়েছে। দিনকতক উন্মাদের চিকিৎসা চলল—বছর খানেক পরে আমার বিয়ে দেওয়া হল। সেই থেকেই আমি সংসারী।
আমি জিজ্ঞাসা করিলাম—আর কখনো মন্ত্র জপ করে তাঁকে আহবান করেন নি কেন?
–বাপ রে! এ কি ছেলেখেলা? মারা যাব শেষে! অন্য নারী জীবনে এলে তিনি দেখা দেবেন? সে–চেষ্টাও কখনো করিনি। সে কতকাল হয়ে গেল, সে কি আজকার কথা?
–-আচ্ছা, এখন আর তাঁকে দেখতে ইচ্ছে হয় না?
বৃদ্ধ তারানাথ উৎসাহে, উত্তেজনায় বালিশ বুকে দিয়া খাড়া হইয়া উঠিয়া বসিল।
ইচ্ছে হয় না কে বলেছে? বললুম তো ঐ তিনমাসই বেচে ছিলাম। দেবী এসেছিলেন মানষী হয়ে। এদিকে ষড়ৈশ্বর্যশালিনী শক্তিরপিণী যোগিনী, তেজে কাছে ঘেষা যায় না—অথচ কি মানবীই হয়ে যেতেন, যখন ধরা দিতেন আমায়! প্রিয়ার মত আসতেন কাছে, অমনই মিষ্টি, অমনই ঠোঁট ফলিয়ে মাঝে মাঝে অভিমান, বরাকর নদীর ধারের শালবন রাত্রির পর রাত্রি তাঁর মধুর হাসিতে জ্যোৎস্নার মত উজ্জ্বল হয়ে উঠতো–এমনি কত রাত ধরে! এক এক সময় ভ্রম হ’ত তিনি সত্যই মানষীই হবেন।
বিদায় নিয়ে যাবার সেই রাতটিতে বললেন নদীতীরের এই তিন মাসের জীবন আমিও কি ভুলব ভেবেছ! আমাদের পক্ষেও সলভ এ নয়, ভেবো না আমরা খুব সখী। আমাদের মত সঙ্গীহারা, বধ্বহারা জীব কোথায় আছে? প্রেমের কাঙাল আমরাও। কত দিন পরে একজন মানুষে আমাদের সত্যিকার চাওয়া চায়, তার জন্যে আমাদের মন সর্বদা তৃষিত হয়ে থাকে কিন্তু তাই বলে নিজেকে সহজলভ্য করতে পারিনে, আগ্রহ করে যে না চায় তার কাছে যাই নে, সে আমার প্রেমের মূল্য দেবে না, নিজেও আনন্দ পাবে না, যা কিনা পাওয়া যায় বহু চেয়ে পাওয়ার পরে। কিন্তু আমাদের অদৃষ্টলিপি; কোথাও চিরদিন থাকতে পারিনে—কি না কি ঘটে যায়, ছেড়ে চলে যেতে হয় অনিচ্ছাসজেও। ক’জন আমাদের ডাকে? ক’জন বিশ্বাস করে? সুখী ভেবো না আমাকে।
বলিলাম—এত যদি সুখের ব্যাপার তবে আপনি ভয়ঙ্কর বলেছিলেন কেন আগে?
–ব্যাপার ভয়ঙ্কর এই জন্যে যে আমার সারা জীবনটা মাটি হয়ে গেল ঐ তিন মাসের সুখভোগে। কোন দিকে মনই দিতে পারিনে—মধ্যে তো দিনকতক উন্মাদ হয়েই গিয়েছিলাম, বিয়ের পরেও। তারপর সেরে সামলে উঠে এই জ্যোতিষের ব্যবসা আরম্ভ করে যা হয় একরকম—সেও দেবীরই দয়া। তিনি বলেছিলেন, জীবনে কখনও অন্নকষ্টে আমায় পড়তে হবে না। পড়তে কখনও হয়নি—কিন্তু ওতেই কি আর আনন্দ দেয় জীবনে?
তারানাথ গল্প শেষ করিয়া বাড়ির ভিতরে যাইবার জন্য উঠিল। আমিও বাহির হইয়া ধর্মতলার মোড়ে আসিলাম। এত অদ্ভুত, অবাস্তব জগৎ হইতে বিংশ শতাব্দীর বাস্তব সভ্যতার জগতে আসিয়া যেন হাঁপ ছাড়িয়া বাঁচিলাম। যতক্ষণ তারানাথ গল্প বলিয়া ততক্ষণ ওর চোখমুখের ভাবে ও গলার স্বরে গল্পের সত্যতা সম্বন্ধে অবিশ্বাস জাগে নাই–কিন্তু ট্রামে উঠিয়াই মনে হইল—
কি মনে হইল তাহা আর না-ই বা বলিলাম!
তালনবমী
ভাদ্র মাসের দিন। আজ দিন পনেরো ধরে বর্ষা নেমেছে, তার আর বিরামও নেই, বিশ্রামও নেই। ক্ষুদিরাম ভটচাজের বাড়িতে আজ দু-দিন হাঁড়ি চড়েনি।
