ভেবেছিলেন ছোটো মেয়েটার বিয়ে দিয়ে একরকম নিঝঞ্জাট হবেন, কিন্তু আর সংসারে তাঁর দরকার নেই। যাদের জন্য চুরি করেন, তারাই বলে চোর। সে সংসার আর ধরতে আছে?
কেশব গাঙ্গুলী রেলের বোতাম বসানো সাদা কোট একটা নিয়ে বেরিয়েছেন, রেলের ভাড়া লাগবে না। রেলের বোতামওয়ালা কোট দেখলে ছেলেছোকরা টিকিট-চেকাররা একবার চেয়ে দেখে চলে যায়, কিছু জিগ্যেস করে না।
একটি পয়সা তাঁর নিজের হাতে নেই। হাজার চারেক টাকা আছে স্ত্রীর নামে আর হাজার তিনেক আছে অবিবাহিত ছোটো মেয়ের নামে। যদি তিনি মারা যান মেয়ের বিয়ে দেওয়ার আগেই, কারণ বয়স তাঁর যথেষ্ট হয়েছে, তাই বন্ধুবান্ধবদের পরামর্শে নৈহাটিতে থাকতে বাড়ি বিক্রির টাকা থেকে ছোটো মেয়ের নামে টাকাটা রেখেছিলেন। আজ চাইলে কেউ একটা পয়সা তাঁকে দেবে? না-স্ত্রী, না-মেয়ে।
তাই হাটের পয়সা থেকে দু-চার আনা এদিক-ওদিক করতেন কেশব গাঙ্গুলী।–করলে চলে না। তাঁর নিজের একটু নস্যি, একটু তামাক, হয়তো বা ইচ্ছে হল দু-পেয়ালা চা কিনে খেলেন—এ পয়সা আসে কোথা থেকে।
মুক্তকেশী এ সন্দেহ করেছিল আগে থেকেই। তাই স্বামী হাট থেকে ফিরলে জিনিসপত্রের ওজন, দরদস্তুর সম্বন্ধে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে জিগ্যেস করে, দাঁড়ি ধরে আলু, পটল, চাল, ডাল ওজন করে নেয়। পাড়ার ছেলেদের জিগ্যেস করে—হ্যাঁরে, আজ হাটে পটল কত করে সের?
—ও নিতাই, আজ হাটে মাছ কত করে সের?
তবুও কেশব গাঙ্গুলীকে সামলানো অত সহজ নয়। চল্লিশ বছর তিনি রেলে কাজ করে এসেছেন। মুক্তকেশী যতই কৌশল করুক, যতই সতর্ক হোক, কেশব গাঙ্গুলীর ফাঁক ধরতে পারা অত সহজ কাজ বুঝি?
পটলের মধ্যে বাসি তাজা নেই?
দেখলে হয়তো ঠিক ধরা যায় না, কিন্তু দর বিভিন্ন। মাছের মধ্যেও দরের তারতম্য নেই? কত ধরবে মুক্তকেশী? না-করলেই বা কেশব গাঙ্গুলীর বাজে খরচ চলে কোথা থেকে? চাইলে স্ত্রীর হাত থেকে পয়সা বার করা শক্ত। ওই নিয়েই তো যত ঝগড়া।
কেশব গাঙ্গুলী বাড়ি থেকে বেরিয়ে স্টেশনে এসে পৌঁছালেন বেলা তিনটের সময়। কাল হাট থেকে ফিরবার সময় ছ-আনা পয়সার হেরফের করেছিলেন, সেই পয়সা পকেটে খুচরো আছে—আর আছে গুপ্তস্থান থেকে সন্তর্পণে বার করা তিন টাকা সাত আনা। এই তিন টাকা তেরো আনা ছাড়া জগতে তাঁর বলতে আর কোথাও কিছু নেই। হ্যাঁ, অবিশ্যি পকেট ঘড়িটা আছে। সেটাও রেলের জামার বুকপকেটে এনেছেন। বিক্রি করলে ত্রিশ-চল্লিশ টাকা হবে! সেকালের কুরুভাইজার ফ্রেরিসের ঘড়ি। এখনকার মতো ফঙ্গবেনে জিনিস নয়।
স্টেশনের কাছে একটা জামগাছের তলায় পাকিস্তানের উদবাস্তুদের পানবিড়ির দোকান। পান কিনলেন দু-পয়সার। বিড়িও দু-পয়সার। দেশলাই একটা কত? চার পয়সা? দাও একটা।
পান খেয়ে বিড়ির ধোঁয়া টেনে কেশব গাঙ্গুলীর শরীরের কষ্ট খানিকটা দূর হল। এতক্ষণ চিন্তা করবার মতো অবস্থা তাঁর ছিল না।
তিনি আপাতত যাবেন কোথায়?
সেটা কিছু ঠিক করেননি, না-করেই বাড়ি থেকে বেরিয়েছেন অবিশ্যি। এখনো ট্রেনের ঘণ্টাখানেক বিলম্ব আছে। যাবেন কোথায়? যেখানে যান, যেতে তো হবে? তিন টাকা তেরো আনায় স্বাধীনভাবে খাওয়া কতদিন চলবে?
মেয়ের বাড়ি যাবেন? জামাই কাজ করে টিটাগড়ের কাগজের কলে। টিটাগড়েই বাসা। সেখানে যেতে লজ্জা করে। এই গত জ্যৈষ্ঠ মাসে সেখানে গিয়ে দু-দিন ছিলেন। অবিশ্যি জামাইষষ্ঠীর তত্বস্বরূপ নিয়ে গিয়েছিলেন কিছু আম ও দুটো কাঁঠাল। বার বার জামাইবাড়ি যেতে আছে?
বিশেষ করে আজকাল রেশনের চালের দিনে কারো বাড়িতেই একবেলার বেশি দু-বেলা থাকতে নেই। কী মনে করবে। যে কাল পড়েছে।
ট্রেন এসে পড়ল। উঠে বসলেন এক কোণে। রেলের জামা আছে, টিকিট লাগবে না।
হু হু করে ট্রেন চলল। কাশফুলের খেতে কাশফুল ফুটতে শুরু করেছে। খুব বৃষ্টি হওয়ায় ধানের খেত জলে ডুবুডুবু। অনেক জায়গায় এখনো ধান বুনছে। আমন ধান এবার নাবি।
খুব ভালো করেছেন কেশব। যখন কাজ থেকে অবসর নিলেন, তখন প্রভিডেন্ট ফন্ডের দরুন ন-হাজার টাকা পেয়েই যদি তা থেকে কিছু ধানের জমি কিনতেন নিজের নামে, তবে আজ স্ত্রী আর মেয়েরা এমন হেনস্থা করতে পারত?
স্ত্রী আর মেয়েদের দুর্ব্যবহারের কথা মনে আসায় চোখ দিয়ে জল পড়ল, কোঁচার খুঁটে মুছলেন। কী না করেছেন ওদের জন্যে? ওই ছোটো মেয়েটার নৈহাটিতে থাকতে একবার টাইফয়েড হয়েছিল, কেশব গাঙ্গুলী রাত জেগে ঘণ্টায় ঘণ্টায় থার্মোমিটার দেখেছেন, ওষুধ খাইয়েছেন, কই অবহেলা করতে পেরেছিলেন? একশো ষাট টাকা খরচ হয়ে যায় সেই অসুখে।…
ওই স্ত্রী মুক্তকেশীর সে-বার হাঁপানির মতো হল। চুচুড়ায় নিয়ে গিয়ে সপ্তাহে সপ্তাহে কবিরাজ দেখানো, অনুপানের ব্যবস্থা করা, পাছে আগুনের তাতে কষ্ট হয় বলে রাঁধতে দিতেন না, রান্নাঘরের কাছে যেতে দিতেন না। রাত্রে শুয়ে ভাবতেন, এই বয়সে হাঁপানি হল, মুক্তকেশী বড়ো কষ্ট পাবে, কী করা যায়? রঘুনাথপুরের পীতাম্বর দাসের কাছে হাঁপানির মাদুলি পাওয়া যায়, তাই কি আনবেন? কত ভেবেছেন। কত ব্যস্ত হয়েছিলেন।
সেই মুক্তকেশী তাঁকে আজ বললে—বাড়ি থেকে বেরিয়ে যাও, আর এসো না–
ছোটো মেয়ে বললে—মরো না তুমি, মলেই বাঁচি। তুমি মলেই বা কী?
কেন তিনি কি ওদের জন্যে কিছু করেননি? চিরকাল রেলে টরেটক্কা করেছেন তবে কাদের জন্যে? খাইয়ে মাখিয়ে বড়ো না-করলে ওরা অত বড়ো হল কী করে? আজ কিনা তিনি মরে গেলে ওরা বাঁচে! তিনি আজ সংসারের আপদ, এই তিয়াত্তর বছর বয়সে!
