এই তিয়াত্তর বছর বয়সেও গত আষাঢ় মাসে যখন কাঠের ভয়ানক অভাব হল, নিজে বাঁশঝাড় খুঁজে খুঁজে শুকনো বাঁশ আর কঞ্চি কেটে গোয়ালে ডাং করেননি, পাছে স্ত্রীর বা মেয়েদের রান্নার এতটুকু অসুবিধে হয় সেজন্যে? এই ভীষণ জলকাদার পথে মোট বয়ে নিয়ে যাননি?
যাক, এসব কথা তিনি বলতে চান না। তবে মনে কষ্ট হয় এই ভেবে যে, সংসার কীরকম অকৃতজ্ঞ! যাদের জন্যে সারাজীবন খেটে খেটে গায়ের রক্ত জল করেছেন, তারাই আজ বলে কিনা তিনি মলেই তারা বাঁচে, তাদের কোনো ক্ষতি হবে না।
কেশব গাঙ্গুলীর মনের মধ্যেটা হা হা করে উঠল দুঃখে। চোখে আবার হু হু করে জল এল, কোঁচার খুঁটে মুছলেন। আজ যদি
—টিকিট?
—কেশব গাঙ্গুলী মুখ তুলে চমকে চাইলেন। একটি ছোকরা টিকেট-চেকার সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। কেবশ গাঙ্গুলী বললেন—রেলওয়ে সার্ভেন্ট—
ছোকরা চলে গেল।
বেশ ছেলেটি। ওই রকম একটি ছেলে যদি আজ তাঁর থাকত! তা হলে ওরা এমন কথা বলতে সাহস পেত না। সবই অদৃষ্ট। ছেলে তাঁর হয়নি? হয়েছিল। তখন তিনি তিনপাহাড় স্টেশনের তারবাবু। ছেলের নাম ছিল সান্টু! প্ল্যাটফর্মে হেলেদুলে চলে বেড়াত। আজও বেশ মনে আছে, তাঁকে বলত—বাবা, আমাকে পুরোনো টিকিট দেবে? পুরোনো টিকিট হাতে পেলেই সে হঠাৎ মুখে ‘পু-উ উ-উ’ শব্দ করে ট্রেন ছেড়ে দিত…তারপর ঝক ঝক ঝক ঝক শব্দ করতে করতে প্ল্যাটফর্মের ধারে ধারে খানিকদ্দূর মাথা নাড়তে নাড়তে কেমন যেত।
টরেটক্কার টেবিলে কাজ করতে করতে তিনি বসে দেখতেন আর হাসতেন। মাল-কুলি রামদেওকে বলতেন—শিশুকে ধরে বাসায় দিয়ে আসতে। শিশু বুঝতে পারত, রামদেও তাকে ধরে নিয়ে যেতে আসছে, সে ছোটো পায়ে ছুট দিত আর রামদেও পেছনে পেছনে ‘এ খোঁকাবাবু, এ খোঁকাবাবু’ বলে ছুটত—এ দৃশ্য আজও এই এখুনি চোখের সামনে দেখতে পাচ্ছেন কেশব।
দেড় বছর বয়সে সান্টু মারা যায়।…আজ ছত্রিশ বছর আগেকার কথা। তবুও যেন মনে হয়, সেই সাহেবগঞ্জ স্টেশনের প্ল্যাটফর্মে বড়ো ঘোড়ানিম গাছটার ছায়ায় আজও সান্টু সেই রকম ছুটে ছুটে খেলা করে বেড়াচ্ছে।…সান্টু থাকলে আজ বোধ হয় এমন কষ্ট কেশব গাঙ্গুলীর হত না। চোখ দিয়ে এবার ঝরঝর করে জল পড়ল, মনের মধ্যে—বুকের মধ্যে কী একটা যেন ঠেলে ফুলে ফেঁপে উত্তাল হয়ে উঠল। কেশব জানলা দিয়ে বাইরের দিকে তাকিয়ে রইলেন। একটা রাখাল বালক একটা গোরুকে কী নির্দয়ভাবেই না প্রহার করছে। খুব বৃষ্টির জল বেধেছে ডোবায়, পুকুরে। এক জায়গায় ছোটো ছোটো ছেলে-মেয়েরা গামছা দিয়ে হেঁকে কুঁচোমাছ ধরছে। টেলিগ্রাফের তারে একটা কি পাখি বসে রয়েছে।
নৈ-হা-টি!
কেশব গাঙ্গুলীর চিন্তাসূত্র ছিন্ন হয়ে গেল। তিনি তাড়াতাড়ি গাড়ি থেকে নেমে পড়লেন।
সন্ধ্যার আর বিলম্ব নেই। এখানে সাবেক বাসা ছিল। দু-চারজন বন্ধুর সঙ্গে আলাপ আছে। তাদের কারো বাড়ি যাবার ইচ্ছে নেই, তবুও না-গেলে রাত্রে থাকবেন কোথায় এই অভদ্রা বর্ষাকালে, খাবেনই বা কী? রমাপতির বাড়ি যাবেন?
রমাপতি কুণ্ডুর বড়ো গোলদারি দোকান ও রেস্টুরেন্ট। নাম, দি কমলাপতি মডার্ন রেস্টোরান্ট। রমাপতির বড়ো ছেলের নাম কমলাপতি। তার ছেলে শান্তি ওই রেস্টোরেন্টে বসে! খুব বিক্রি। চার-পাঁচটা ছোকরা চা-খাবার দিতে দিতে হিমশিম খেয়ে যাচ্ছে।
শান্তি তাঁকে দেখে বললে—এই যে দাদু, আসুন! দেশ থেকে? ভালো সব? ওরে, ভালো করে গরম জলে ধুয়ে এক কাপ চা দে দাদুকে। আর কী খাবেন? একটা চপ দেবে? ভালো চপ আছে। না? টোস্ট দিক? তবে থাক।
কেশব গাঙ্গুলী জানেন, এখানে যা খাবেন তার নগদ দাম দিতে হবে এখুনি। আর একবার এ রকম হয়েছিল, তাঁকে খাতির করছে ভেবে চপ, কাটলেট, ডিম যা নিয়ে আসে তাই খান। শেষে হাসিমুখে আপ্যায়িত করে বিদায় নেবার জন্যে টেবিলের কাছে যেতেই শান্তি হাসিমুখে বললে—এক টাকা সাড়ে তেরো আনা—
আজ আর সে ভুল করবেন না। হাতে পয়সা কম। চায়ের ছ-পয়সা দাম দিয়ে কিছুক্ষণ বসে রইলেন। শান্তিকে বললেন, তোমার বাবা ভালো? তোমার দাদু বাড়িতে আছেন?
–আজ্ঞে হ্যাঁ।
—একবার যাব দেখা করতে?
—যান না। এখন বৈঠকখানাতেই বসে আছেন, আর শশী কাকা আছেন।
—আচ্ছা আসি। কেশব গাঙ্গুলীর মনটা খারাপ হয়ে গেল। ব্যাবসাদারের চক্ষুলজ্জা নেই। সংসার বড়ো কঠিন জায়গা।
তবুও রমাপতির বাড়িতেই গেলেন। রমাপতি কুণ্ডু তাঁর সমবয়সি। তাঁকে দেখে খুশি হল। যত্ন করলে খুব। রাত্রে লুচি, তরকারী, মিষ্টি খাওয়ালে। ভালো গদিপাতা নেটের মশারি খাটানো বিছানায় শুয়ে কেশব মশারির চালের দিকে চেয়ে দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেললেন। পরের এমন সুন্দর বিছানাতে ক-দিন তিনি শোবেন? তাঁর আশ্রয়স্থল তো বৃক্ষতল। এরা না-হয় আজ রাত্রেই খাতির করে আশ্রয় দিয়েছে।
কেন অপরের অদৃষ্টে এত সুখ থাকে, আর তাঁর অদৃষ্টে এমন ধারা?
এই তো রমাপতিকে দেখলেন, তার নাতনিরা কত যত্নে বাতাস করতে লাগল খাওয়ার সময়ে। খাওয়ার পর এক বড়ো নাতনি আমলা নাকি রোজ তেল মালিশ করে দাদুর পায়ে। পুত্রবধূরা ‘বাবা’ বলতে অজ্ঞান।
সেটা হয়তো পয়সাওয়ালা বলে, রমাপতির নামেই ব্যাবসা, লক্ষপতি লোক। আজ তাঁর হাতে যদি পয়সা থাকত, তবে কী আর মেয়েটা তাঁকে অমন কথা বলতে সাহস করত? তিনি নিঃস্ব, কাজেই তাঁকে হেনস্থা করে। পয়সা এমন জিনিস।
কত কী ভাবতে ভাবতে কেশবের ঘুম এল। একটা বড় ব্যথার জায়গা খচ খচ করে। যখন তিনি চলে যাচ্ছেন বাড়ি থেকে বেরিয়ে, তখন মেয়েরা কেন দৌড়ে এসে পথ আটকালে না? স্ত্রী কেন ছুটে এল না?
