স্ত্রী মুক্তকেশী বললে—দেখি কীরকম বাজার করলে? পটলগুলো এত ছোছাটো কেন? কত করে সের?
—দশ আনা।
—ও বাড়ির পন্টু এনেচে ন-আনা সের। তুমি বেশি দর দিয়ে নিয়ে এলে, তাও ছোটো পটল। ও কখনো দশ আনা সের না।
—বাঃ, আমি মিথ্যে বলছি?
—তুমি বড্ড সত্যবাদী যুধিষ্ঠির—তা আমার ভালো জানা আছে। আচ্ছা রও, ও পটল আমি ওজন করে দেখব।
—কেন আমার কথা বিশ্বাস হল না?
—না, তোমার কথা আমার বিশ্বাস তো হয়ই না—সত্যি কথা বলব তার আবার ঢাক-ঢাক গুড়গুড় কী?
এই হল সূত্রপাত। তারপর কেশব গাঙ্গুলী হাত-পা ধুয়ে রোজকার মতো বললেন—ও ময়না, চালভাজা নিয়ে আয়—
ময়না কথা বলে না, চালভাজার বাটিও আনে না। তাতে বুঝি কেশব বলেছিলেন—কৈ, কানে কী তুলো দিয়ে বসে আছ নাকি, ও ময়না?
ছোটো মেয়ে ময়না নীরস সুরে বললে—চাল ভাজিনি।
-কেন?
–রোজ রোজ চালভাজা খাওয়ার চাল জুটছে কোথা থেকে? তা ছাড়া আমার শরীরও ভালো ছিল না।
—কেন, তোর দিদি?
—দিদি সেলাই করছিল।
এটা খুবই স্বাভাবিক যে বাহাত্তর-তিয়াত্তর বছরের বৃদ্ধ কেশব গাঙ্গুলী দশ সের ভারী মোট বয়ে এনে মেয়েদের এ উদাসীনতায় বিরক্ত হবেন, বা প্রতিবাদে দু-কথা শোনাবেন। কিন্তু তার ফল দাঁড়াল খুবই খারাপ।
পাঁচজনের সামনে বলবার কথা নয়, বলতেও সংকোচ হয়। ছোটো মেয়ে ময়না তাঁকে একটা ভাঙা ছাতির বাঁট তুলে মারতে এল। মেজো মেয়ে লীলা বললে— তুমি মরো না কেন? মলে তো সংসারের আপদ চোকে—
স্ত্রী মুক্তকেশী বললে—অমন আপদ থাকলেও যা, না-থাকলেও তা কেশব গাঙ্গুলী রেগে ঘর থেকে বেরিয়ে গিয়ে বললেন, আমি তোদের ভাত আর খাব না—চললাম।
মুক্তকেশী ও ছোটো মেয়ে ময়না একসঙ্গে বলে উঠল—যাও না—যাও।
ময়না বললে—আর বাড়ি ঢুকো না। মনে থাকে যেন।
শুনে বিশ্বাস হবে না জানি, কিন্তু একেবারে নির্জলা সত্যি। আপন মেয়ে বুড়ো বাবাকে ছাতি তুলে মারতে যায়!
কেশব গাঙ্গুলী রাত্রে বাইরের ভাঙা চণ্ডীমণ্ডপে শুয়ে রইলেন। কেউ এসে খেতে ডাকলে না—মাও না, মেয়েরাও না। সত্যিই কেউ ডাকতে আসবে না, এটা কেশব বুঝতে পারেননি, ধারণা করতে পারেননি। তাই ঘটে গেল অবশেষে। না খেয়ে সমস্ত রাত কাটল কেশব গাঙ্গুলীর—নিজের পৈতৃক ভিটেতে, স্ত্রী ও দুই কন্যা বর্তমানে। উঃ, এ কথা ভাবতে পারা যায়?
কেশব গাঙ্গুলী সত্যি কখনো ভাবেননি যে, এতটা তিনি হেনস্থার পাত্র তাঁর সংসারে। মেয়েরা বা স্ত্রী তাঁকে কেউ ভালোবাসে না, এ তিনি অনেকদিন থেকেই জানেন। কিন্তু তার বহর যে এতটা, তা তিনি ধারণা করবেন কীভাবে?
ক্ষুধায় ও মশার কামড়ের যন্ত্রণায় সারারাত কেটে গেল ছটফট করে। সকালে উঠে আগে কেশব নদী থেকে স্নান করে এসে সন্ধ্যাহ্নিক ও জপ করে নিয়ে প্রতিবেশী যদুনন্দন মজুমদারের বাড়ি চা খেতে গেলেন।
যদুনন্দন বললেন—কী কাকা, আজ এত সকালে কী মনে করে?
এ কথার উত্তরে কেশব গাঙ্গুলী বললেন কাল রাত্রের কথা। পরিবার ও মেয়ে দুটির দুর্ব্যবহারের কাহিনি। যদুনন্দনের কাছে এ কথা নতুন নয়, পাড়ার মেয়েদের কানাকানির মধ্যে দিয়ে কেশব গাঙ্গুলীর দুরবস্থার কথা অনেকদিন শুনেছেন তিনি।
তবুও বিস্ময়ের ভান করে বললেন—সে কী কাকা, বলেন কী? কাল রাত্রে খাননি? এ বড় অন্যায় কাকিমার। ছিঃ ছিঃ—এ বেলা আপনি আমার বাড়ি খাবেন। বসুন।
কেশব গাঙ্গুলী আর বাড়ি এলেন না। সেখানেই দুপুর পর্যন্ত থেকে আহারের পর যখন বাড়ি এলেন, তখন এক ভীষণ কাণ্ড বেধে গেল। মুক্তকেশী বললে— আবার বাড়িতে কেন? যাও দূর হও, যে বাড়িতে গিয়ে নিন্দে রটনা করে এক পাথর ভাত মেরে এলে, সেখানেই যাও না, কতদিন খেতে দ্যায় দেখি একবার।
মেয়েরাও বললে—বেশ তো, পরের বাড়ি টোকলা সেধে কদ্দিন চলে, দেখি না? এখানে আবার কেন? যাও না—
—কাকে কি বলেছি আমি?
—আহা! ন্যাকা! আমরা আর জানিনে! এই তো যদুদার মেয়ে ঘাটে আজ ব্যাখ্যান করেছে সবার কাছে। ওই বুড়ো মানুষ ওঁকে খেতে দ্যায়নি, দূর দূর করে তাড়িয়ে দিয়েছে, মেরেছে—সে কত কথা! আমরা শুনিনি কিছু?
—তা তো মিথ্যে কিছু বলিনি।
—মেরেছিলাম তোমাকে আমরা? খেতে দিইনি আমরা? তুমিই না তেজ করে চণ্ডীমণ্ডপে গিয়ে শুয়ে রইলে! আবার লাগানি-ভাঙানি পাড়ায় পাড়ায়। বেশ লাগাও, লাগিয়ে করবে কী? যাও না, যেখানে খুশি—আমরা তো বলেছি, বেরোও না–
ছোটো মেয়ে বললে—মরে যাও না, মলেই তো বাঁচি—
কেশব গাঙ্গুলী ঘরের মধ্যে ঢুকে কাপড়জামা পরে এবং একটা থলের মধ্যে কাপড়-গামছা পুরে নিয়ে তেড়েফুঁড়ে বাড়ি থেকে বেরুলেন!
বলে গেলেন—বেশ তাই যাচ্ছি—আর তোদের বাড়ি আসব না—চললাম।
মুক্তকেশী চেঁচিয়ে বললে–তেজ করে যেমন বেরুনো হল তেমনি আর ঢুকো বাড়িতে কালামুখ নিয়ে—দেখব তেজ—কে জ্বর হলে দেখে, তা দেখব।
কেশব গাঙ্গুলী হনহন করে বাড়ি থেকে বেরিয়ে চলে গেলেন। হোক জ্বর। নৈহাটী থেকে এখানে এসে পর্যন্ত ম্যালেরিয়ায় ভুগছেন। দুর্বল করে ফেলে দিয়েছে বড়ো। তা হোক। যা হয় হবে।
কেশব গাঙ্গুলী রেলে চাকুরি করতেন। চাকুরি থেকে অবসর নিয়ে নৈহাটিতে বাড়ি করেছিলেন, কিন্তু বারো-চোদ্দো বছর বসে খেয়ে প্রভিডেন্ট ফন্ডের সামান্য টাকা যা বাড়ি তৈরির পর অবশিষ্ট ছিল, ক্রমে ক্রমে ফুরিয়ে যেতে লাগল— এখনো ছোটো মেয়ের বিয়ে বাকি। টাকা ফুরিয়ে গেলে কী খাবেন?
অগত্যা নৈহাটির বাড়ি বিক্রি করে পৈতৃক গ্রামে এসে এই দু-বছর বাস করছেন। শরিকদের সঙ্গে ঝগড়া করে দু-ঝাড় বাঁশ ও বিঘে-দুই ধানের জমির ভাগ পেয়ে যা-হোক একরকম চালিয়ে যাচ্ছিলেন, কিন্তু মেয়ে দুটি আর পরিবারের জন্যে সত্যি তাঁর সংসারে বিতৃষ্ণা হয়ে গিয়েছে। মেজে মেয়ের বিয়ে দিয়েছিলেন, কিন্তু স্বামীর চরিত্র ভালো নয়, সে মেয়ে তাঁর কাছেই আছে বিয়ের দু-বছর পর থেকেই। সব দিক থেকেই তাঁর গোলমাল।
