তারাচাঁদ তাকে বোঝালে, বললে—একটু এগিয়ে চল, রতনপুরের কৈবর্ত পাড়ায় জল খাওয়াব।
সেই ‘একটু এগিয়ে’ মানে দু-ক্রোশের কম নয়। আর খানিকটা এসে মেয়েটা তেষ্টায় রোদে অবসন্ন হয়ে পড়ল। বারবার বলতে লাগল—ও দাদা, তোর দুটি পায়ে পড়ি, দে আমায় একটু জল…
তারাচাঁদ তাকে কোলে তুলে নিয়ে এই বটগাছটার ছায়ায় নিয়ে এসে ফেললে। ছোটো মেয়েটা তখন আর কথা বলতে পারছে না। তারাচাঁদ তার অবস্থা দেখে তাকে নামিয়ে রেখে ছুটে জলের সন্ধানে গেল। এখান থেকে আধক্রোশ তফাতে রতনপুরের কৈবর্তপাড়া থেকে এক ঘটি জল চেয়ে এনে দেখে, তার ছোটো বোনটা গাছতলায় মরে পড়ে আছে, তার মুখে একটা কচুর ডগা! এই বটগাছটা তখন ছোটো ছিল, ওরই তলায় অনেক কচুবন ছিল। তেষ্টার যন্ত্রণায় মেয়েটা সেই বুনো কচুর ডগা মুখে করে তার রস চুষেছিল—সেই থেকে এই মাঠটার নাম হোল কচু-চুষির মাঠ।
তারাচাঁদ বিশ্বেস ব্যাবসা করে বড়োলোক হয়েছিল। শুনেছি নাকি তার সে বোন তাকে স্বপ্নে দেখা দিয়ে বলত—দাদা, ওই মাঠের মধ্যে সকলের জল খাবার জন্য তুই একটা জলসত্র করে দে।…তাই তারাচাঁদ বিশ্বেস এখানে এই বটগাছ পিতিষ্ঠে করে জলসত্র বসিয়ে গেছে—সে আজ পনেরো-ষোলো কী বিশ বছরের কথা হবে। ঠাকুরমশায়, কচু-চুষির মাঠের এ-জলসত্র এদিকের সকলেই জানে। বলব কি বাবা ঠাকুর, এমনও শুনেছি যে মাঠের মধ্যে জলতেষ্টায় বেঘোরে পড়ে ঘুরপাক খাচ্ছে, এমন লোক নাকি কেউ কেউ দেখেছে একটা ছোটো মেয়ে মাঠের মধ্যে দাঁড়িয়ে বলছে—ওগো আমি জল দেব, তুমি আমার সঙ্গে এসো।…
লোকটা তার কাহিনি শেষ করলে; তারপর বললে—সত্যি-মিথ্যে জানিনে ঠাকুরমশায়, লোকে বলে তাই শুনি, বোশেখ মাসের দিন ব্রাহ্মণের কাছে মিথ্যে বলে কী শেষকালে…
লোকটা দুই হাতে নিজের কান মলে কপালে দু-হাত ঠেকিয়ে এক প্রণাম করলে।
বেলা পড়ে এল। কত লোক জলসত্রে আসতে-যেতে লাগল। একজন চাষা পাশের মাঠ থেকে লাঙল ছেড়ে বটতলায় উঠল। ঘেমে সে নেয়ে উঠেছে। একটু বিশ্রাম করে সে তৃপ্তির সঙ্গে ছোলা, গুড় আর জল খেয়ে বসে গল্প করতে লাগল।
এক বুড়ি অন্য গ্রাম থেকে ভিক্ষা করে ফিরছিল। গাছতলায় এসে সে ঝুলি নামিয়ে একটু জল চেয়ে নিয়ে হাত-পা ধুলে। একজন বললে—আবদুলের মা, একটা ডাব খাবা?
আবদুলের মা একগাল হেসে বললে—তা দ্যাও দিকি মোরে, আজ অ্যাকটা খাই। মরব তো, খেয়েই মরি।
একজন লোক পরনে টাটকা কোরা কাপড়ের ওপর নতুন পাটভাঙা ধপধপে সাদা টুইলের শাট, হাঁটু পর্যন্ত কাপড় তোলা পায়ে এক-পা ধুলো, বটতলায় এসে হাতাশভাবে ধপ করে বসে পড়ল। কেউ জিজ্ঞাসা করলে—ছমিরুদ্দি মিঞা যে, আজ ছানির দিন ছিল না?
ছমিরুদ্দি সম্পূর্ণ ভদ্রতাসংগত নয় এরূপ একটি বাক্য উচ্চরণ করে ভূমিকা ফেঁদে তার মোকদ্দমার একটি সংক্ষিপ্ত ইতিহাস বর্ণনা করে গেল এবং যে উকিলের হাতে তার কেস ছিল, তার সম্বন্ধে এমন কতকগুলো মন্তব্য প্রকাশ করলে যে, তিনি সেখানে উপস্থিত থাকলে ছমিরুদ্দির বিরুদ্ধে আর একটা কেস হত। তারপর সে পোয়াটাক আখের গুড়ের সাহায্যে আধসের আন্দাজ ভিজে ছোলা উদরসাৎ করে একছিলিম তামাক খেয়ে বিদায় নিলে।
ক্রমে রোদ পড়ে গেল। বৈকালের বাতাসে কাছেরই একটা ঝোপ থেকে ডাঁশা খেজুরের গন্ধ ভেসে আসছিল। হলুদ রং-এর সোঁদালি ফুলের ঝাড় মাঠের পেছনটা আলো করে ছিল। একটা পাখি আকাশ বেয়ে ডানা মেলে চলেছিল—বউ কথা-ক–বউ কথা-ক।
শিরোমণি মশায়ের বসে বসে মনে হল, বিশ বছর আগে, তাঁর আট বছরের পাগলি মেয়ে উমার মতোই ছোটো একটি মেয়ে এই বটতলায় অসহ্য পিপাসায় জল অভাবে বুনো কচুর ডাঁটার কচু রস চুষেছিল, আজ তারই স্নেহ করুণা এই বিরাট বটগাছটার নিবিড় ডালপালায় বেড়ে উঠে এই জলকষ্টপীড়িত পল্লি-প্রান্তরের একধারে পিপাসার্ত পথিকদের আশ্রয় তৈরি করেছে।… এরই তলায় আজ বিশ বছর ধরে সে মঙ্গলরূপিণী জগদ্ধাত্রীর মতো দশহাত বাড়িয়ে প্রতি নিদাঘ-মধ্যাহ্নে কত পিপাসাতুর পল্লি-পথিককে জল জোগাচ্ছে!…চারিধারে যখন সন্ধ্যা নামে…তপ্ত মাঠ যখন ছায়া-শীতল হয়ে আসে…তখনই কেবল সমস্ত দিনের পরিশ্রমের পর সে-মেয়েটি অস্ফুট জ্যোৎস্নায় শুভ্র-আঁচল উড়িয়ে কোন অজ্ঞাত ঊর্ধ্বলোকে তার নিজের স্থানটিতে ফিরে চলে যায়।…তার পৃথিবীর বালিকা-জীবনের ইতিহাস সে ভোলেনি।…
যে-লোকটা জল দিচ্ছিল, তার নাম চিনিবাস, জাতে সদগোপ। শিরোমণিমশায় তাকে বললেন—ওহে বাপু, তোমার ওই বড়ো ঘটিটা বেশ করে মেজে একঘটি জল আমায় দাও, আর ইয়ে—ব্রাহ্মণের জন্য আনা সন্দেশ আছে বললে না?
ঝগড়া
সন্ধ্যার সময় কেশব গাঙ্গুলীর ভীষণ ঝগড়া হয়ে গেল দুই কন্যা ও স্ত্রীর সঙ্গে। কন্যা দুটিও মায়ের দিকে চিরকাল। এদের কাছ থেকে কখনো শ্রদ্ধা ভালোবাসা পাননি কেশব।
শুধু এনে দাও বাজার থেকে, এই আক্রা চাল মাথায় করে আনো দেড়কোশ দূরের বাজার থেকে। তেল আনো, নুন আনো, কাঠ আনো—এই শুধু ওদের মুখের বুলি। কখনো একটা ভালো কথা শুনেছেন ওদের মুখ থেকে?
ব্যাপারটা সেদিন দাঁড়াল এইরকম।
সন্ধ্যার আগে কেশব গাঙ্গুলী হাট করে আনলেন। তাঁর বয়েস বাহাত্তর বছর, চলতে আজকাল যেন পা কাঁপে—আগের মতো শক্তি নেই আর শরীরে। আড়াই টাকা করে চালের কাঠা। দু-কাঠা চাল কিনে, আর তা ছাড়া তরিতরকারি কিনে ভীষণ কর্দমময় পিছল পথে কোনোরকমে পড়তে পড়তে বেঁচে গিয়ে কেশব গাঙ্গুলী তো হাটের বোঝা বাড়ি নিয়ে এলেন।
