পশ্চিম দিকে অনেক দূরে একটা উলুখড়ের খেত গরম বাতাসে মাথা দোলাচ্ছিল। যে–দিকে চোখ যায়, সেদিকেই কেবল চকচকে খরবালির সমুদ্র। ব্রাহ্মণের ভয়ানক তৃষ্ণা পেল, গরম বাতাসে শরীরের সব জল যেন শুকিয়ে গেল, জিব জড়িয়ে আসতে লাগল। তৃষ্ণা এত বেশি হল যে, সামনে ডোবার পাতা-পচা কালো জল পেলেও তা তিনি আগ্রহের সঙ্গে পান করেন। কিন্তু নবাবগঞ্জ থেকে রতনপুর পর্যন্ত সাড়ে চার ক্রোশ বিস্তৃত এই প্রকাণ্ড মাঠটার মধ্যে যে কোথাও জল পাওয়া যায় না, তা তো তাঁকে কেউ কেউ বাজারেই বলেছিল। এ কষ্ট তাঁকে ভোগ করতেই হবে।
ব্রাহ্মণ কিন্তু ক্রমেই ঘেমে-নেয়ে উঠতে লাগলেন। তাঁর কান দিয়ে, নাক দিয়ে নিঃশ্বাসে যেন আগুনের ঝলক বেরুতে লাগল। জিব জোর করে চুষলেও তা থেকে আর রস পাওয়া যায় না, ধুলোর মতো শুকনো। চারিদিকে ধু-ধু মাঠ খররৌদ্রে যেন নাচছে…চকচকে বালিরাশি রোদ ফিরিয়ে দিচ্ছে…মাঝে মাঝে ছোটো ছোটো ঘূর্ণি হাওয়া গরম বালি-ধুলো-কুটো উড়িয়ে নাকে-মুখে নিয়ে এনে ফেলছে।…অসহ্য পিপাসায় তিনি চোখে ধোঁয়া-ধোঁয়া দেখতে লাগলেন। মনে হতে লাগল—একটু ঘন সবুজ মতো যদি কোনো পাতাও পাই তাহলে চুষি…জীবনে তিনি যত ঠান্ডা জল খেয়েছিলেন তা এইবার তাঁর একে একে মনে আসতে লাগল। তাঁর বাড়ির পুকুরের জল কত ঠান্ডা…পাহাড়পুরের কাছারির ইদারার জল সে তো একেবারে বরফ…কবে তিনি শিষ্যবাড়ি গিয়েছিলেন, বৈশাখ মাসের দিন তারা তাঁকে বড়ো সাদা কাঁসার ঘটি করে নতুন কলসীর জল খেতে দিয়েছিল, সে জল একেবারে হিম, খাবার সময় দাঁত কনকন করে। আচ্ছা, এখন যদি সেই রকম এক ঘটি জল কেউ তাঁকে দেয়?…তাঁর তৃষ্ণাটা হঠাৎ বেড়ে গিয়ে বুকের কলজে পর্যন্ত যেন শুকিয়ে উঠল। এ মাঠটাকে এ অঞ্চলে বলে কচু-চুষির মাঠ। তাঁর মনে পড়ল তিনি শুনেছিলেন, এ জেলার মধ্যে এত বড়ো মাঠ আর নেই; আগে আগে অনেকে নাকি বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠ মাসের দুপুরে এ-মাঠ পার হতে গিয়ে সত্যি প্রাণ হারিয়েছে, গরম বালির ওপর তাদের নির্জীব দেহ লুটিয়ে পড়ে থাকতে দেখা গিয়েছে। অসহ্য জল-তৃষ্ণায় তারা আর চলতে অক্ষম হয়ে গরম বালির ওপর ছটফট করে প্রাণ হারিয়েছে।…সত্যিই তো!…এখনও তো দু-ক্রোশ দূরে গ্রাম…যদি তিনিও?…
শুধু মনের জোরে তিনি পথ চলতে লাগলেন। এই পথ-হাঁটার শেষে কোথায় যেন এক ঘটি ঠান্ডা কনকনে হিমজল তাঁর জন্যে কে রেখে দিয়েছে, পথ-হাঁটার বাজি জিতলে সেই জলঘটিটাই যেন তাঁর পুরস্কার, এই ভেবেই তিনি কলের পুতুলের মতো চলছিলেন। আধক্রোশটাক পথ চলে উলুখড়ের বনটা ডাইনে ফেলেই দেখলেন, বোধহয় আর আধক্রোশ পথ দূরে একটা বড়ো বটগাছ। গাছটার তলায় কোনো পুকুর হয়তো থাকতে পারে, না-থাকে, ছায়াও তো আছে?
বটতলায় পৌঁছে দেখলেন একটা জলসত্র। চার-পাঁচটা নতুন জালায় জল, একপাশে একরাশি কচি ডাব! এক ধামা ভিজে ছোলা, একটা বড়ো জায়গায় অনেকটা নতুন আখের গুড়, একটা ছোটো ধামায় আধ ধামা বাতাসা! বাঁশের চেরা একটা খোল কাতার দড়ি দিয়ে আর একটা বাঁশের খুঁটির গায়ে বাঁধা। একজন জালা থেকে জল উঠিয়ে চেরা বাঁশের খোলে ঢেলে দিচ্ছে। আর লোকে বাঁশের খোলের এ-মুখে অঞ্জলি পেতে জল পান করছে।
গাছতলায় যারা বসেছিল, ব্রাহ্মণ দেখে শিরোমণি মহাশয়কে তারা খুব খাতির করলে। একজন জিজ্ঞাসা করলে—ঠাকুরমশায়ের আগমন হচ্ছে কোথা থেকে?
একজন বলল—আহা, সে-কথা রাখো, বাবা-ঠাকুর আগে ঠান্ডা হোন। শিরোমণিমশায় যেখানে বসলেন, সেখানে প্রকাণ্ড বটগাছটা প্রায় দু-তিন বিঘা জমি জুড়ে আছে। হাতির শুড়ের মতো লম্বা ঝুরি চারিদিকে নেমেছে!…একজন তাঁকে তামাক সেজে দিয়ে একটা বটপাতা ভেঙে নিয়ে এল নল করবার জন্যে।…আ:, কী ঝিরঝিরে হাওয়া। এই অসহ্য পিপাসা ও গরমের পর এমন ঠান্ডা ঝিরঝিরে বাতাস ও তৈরি-তামাকে তাঁর তৃষ্ণাও যেন অনেকটা কমে গেল।
তামাক খাওয়া শেষ হল। একজন বললে—ঠাকুরমশায়, হাত-পা ধুয়ে ঠান্ডা হোন। ভালো সন্দেশ আছে ব্রাহ্মণদের জন্যে আনা, সেবা করে একটু জল খান, এই রোদে এখন আর যাবেন না—বেলা পড়ুক।
তারপর শিরোমণিমশায় জিজ্ঞাসা করলেন—এ জলসত্র কাদের?
—আজ্ঞে ওই আমডোবের বিশ্বেসদের। শ্ৰীমন্ত বিশ্বেস আর নিতাই বিশ্বেস নাম শুনেছেন? শিরোমণিমশায় বললেন—বিশ্বেস? সদগোপ?
–আজ্ঞে না, কলু।
সর্বনাশ! নতুন মাটির জালা ভর্তি জল ও কচি ডাবের রাশি দেখে পিপাসার্ত শিরোমণিমশায় যে আনন্দ অনুভব করেছিলেন, তা তাঁর এক মুহূর্তে কপূরের মতো উবে গেল। কলুর দেওয়া জলসত্রে তিনি কী করে জল খাবেন? তিনি নিজে এবং তাঁর বংশ চিরদিন অশূদ্রে প্রতিগ্রাহী; আজ কি তিনি—ওঃ! ভাগ্যে কথাটা জিজ্ঞাসা করেছিলেন।নইলে, এখনি তো…
শিরোমণিমশায় জিজ্ঞাসা করলেন—এ জলসত্র কতদিনের দেওয়া?
—তা আজ প্রায় পনেরো-ষোলো বছর হবে। শ্ৰীমন্ত বিশ্বেসের বাপ তারাচাঁদ বিশ্বেস এই জলসত্র বসিয়ে যায়। সে হয়েছিল কী বলি শুনুন। বলে লোকটা সেই কাহিনি বলতে আরম্ভ করলে।
আমডোবের তারাচাঁদ বিশ্বেস যখন ছোটো, চোদ্দো-পনেরো বছর বয়স, তখন তার বাপ মারা যায়। সংসারে কেবল ন-দশ বছরের একটি বোন ছাড়া তারাচাঁদের আর কেউ ছিল না। ভাই-বোনে মাথায় করে কলা-বেগুন-কুমড়ো এইসব হাটে বিক্রি করত; এতেই তাদের সংসার চলত। সেবার বোশেখ মাসের মাঝামাঝি তারাচাঁদ ছোটো বোনটিকে নিয়ে নাবাবগঞ্জের হাটে তালশাঁস বিক্রি করতে গিয়েছিল। ফেরবার সময় তারাচাঁদ মাঠের আর কিছু ঠিক পায় না—নবাবগঞ্জ থেকে রতনপুর পর্যন্ত এই মাঠটা সাড়ে চার ক্রোশের বেশি হবে তো কম নয়। কোথাও একটা গাছ পর্যন্ত নেই। বোশেখ মাসের দুপুর রোদে মাঠ বেয়ে আসতে তারাচাঁদের ছোটো বোনটা অবসন্ন হয়ে পড়ল। তারাচাঁদের নিজের মুখে শুনেছি ছোটো বোনটি মাঠের মাঝামাঝি এসে বললে—দাদা, আমার বড়ো তেষ্টা পেয়েছে, জল খাব।
