ইহার বছরখানেক পরে আমি আমার বিদেশের কর্মস্থান হইতে কলিকাতায় আসিয়াছি। শ্রাবণ মাস, তেমনি বর্ষা আরম্ভ হইয়াছে। দিনেরাত্রে বৃষ্টির বিরাম নাই। এ-বেলা একটু ধরিয়াছে বলিয়াই বাহির হইয়াছি। গোলদিঘির কাছাকাছি আসিয়া একখানা হ্যান্ডবিল হাতে পড়িল। হ্যান্ডবিলখানা ফেলিয়া দেওয়ার পূর্বে অন্যমনস্কভাবে সে-খানার উপর একটু চোখ বুলাইয়া লইতে গিয়া দস্তুরমতো বিস্মিত ও উত্তেজিত হইয়া উঠিলাম। উহাতে লেখা আছে—
‘নারদ’-কাব্যের খ্যাতনামা কবি
বঙ্গভারতীর কৃতী সন্তান
শ্রীযুক্ত ভূষণচন্দ্র চক্রবর্তীকে (বড়ো বড়ো অক্ষরে)
সংবর্ধনা করিবার জন্য কলিকাতাবাসীগণের
জনসভা (আধইঞ্চি লম্বা অক্ষরে)
স্থান-ইউনিভার্সিটি ইনস্টিটিউট হল, সময় সন্ধ্যা ৬ টা।
সভাপতিত্ব করিবেন
একজন খ্যাতনামা নামজাদা প্রবীণ সাহিত্যিক।
ব্যাপার কী? চক্ষুকে যেন বিশ্বাস করিতে পারিলাম না—ভূষণদাদাকে সংবর্ধনা করিবার জন্য কলিকাতাবাসীগণ (কী ভয়ানক ব্যাপার!) জনসভা আহ্বান করিয়াছেন ইউনিভার্সিটি ইনস্টিটিউট হলে অতবড়ো নামজাদা সাহিত্যিকের সভাপতিত্বে! কই ‘নারদ’-কাব্যের এতাদৃশ জনপ্রিয়তা তো পূর্বে মোটেই শুনি নাই? যাহা হউক, হইলে খুব ভালো কথা, কিন্তু কলিকাতাবাসীগণ কী ক্ষেপিয়া গেল হঠাৎ?
হ্যান্ডবিলের তারিখ লক্ষ করিয়া দেখিলাম, সেই দিনই সন্ধ্যাবেলা সভা। সাড়ে ছ-টার বেশি দেরি নাই, যদি লোকের খুব ভিড় হয়, পৌঁনে ছটায় ইনস্টিটিউটে গিয়া ঢুকিলাম। তখনও কেহ আসে নাই—অতবড়ো হল একেবারে খালি। এক পাশে গিয়া বসিলাম। ছ-টা বাজিল, জনপ্রাণীরও দেখা নাই—এই সময় আবার জোরে বৃষ্টি নামিল, সওয়া ছ-টা— কেহই নাই, সাড়ে ছটার দু-এক মিনিট পূর্বে দেখি ভূষণদাদা অত্যন্ত উত্তেজিতভাবে একতাড়া কাগজ বগলে হলে প্রবেশ করিতেছেন, পিছনে চার পাঁচটি ভদ্রলোক—তাঁহাদের কাহাকেও চিনি না। তখন সভার সাফল্য সম্বন্ধে আমার ঘোর সন্দেহ উপস্থিত হইয়াছে, এ অবস্থায় ভূষণদাদার সহিত দেখা করিলে তিনি অপ্রতিভ হইতে পারেন—সুতরাং হলের বাহিরে গা-ঢাকা দিয়া রহিলাম।
পৌঁনে সাতটা—জনপ্রাণী না, সভাপতিও অনুপস্থিত। সাতটা, তথৈবচ। এমন জনশূন্য জনসভা যদিও-বা কখনো দেখিয়াছি! ভূষণদাদার অবস্থা দেখিয়া বড়ো কষ্ট হইল। তিনি ও তাঁহার সঙ্গের ভদ্রলোক কয়জন কেবল ঘর-বাহির করিতেছেন, নিজেদের মধ্যেই উত্তেজিত ভাবে কী পরামর্শ করিতেছেন—আবার একবার করিয়া ইনস্টিটিউট-এর গেটের কাছে যাইতেছেন। সওয়া সাতটা—কাকস্য পরিবেদনা। সাড়ে সাতটা—পূর্ববৎ অবস্থা। কলিকাতাবাসীগণের জনসভায় কলিকাতাবাসীগণই আসিতে ভুলিয়া গেলেন কেমন করিয়া!
পৌঁনে আটটার সময় ভূষণদাদা সঙ্গীদের লইয়া বাহির হইয়া গেলেন—অল্পক্ষণ পরে আমিও হল পরিত্যাগ করিলাম।
পরদিন বিনুর মেলোমশায় তারিণীবাবুর সঙ্গে দেখা। তিনি আমাকে চেনেন খুব ভালোই বিনুর সঙ্গে কতবার সিমলা স্ট্রিটে তাঁর বাড়িতে গিয়াছি। কুশল প্রশ্নাদির পরে তিনি বলিলেন, “ভূষণ যে এখানে এসেছে হে, আমার বাসাতেই আজ আট দশ দিন আছে। কী একখানা বই নিয়ে খুব ঘোরাঘুরি করছে। ওর মাথা আর মুণ্ডু। এদিকে এই অবস্থা, সতেরো-আঠারো বছরের মেয়ে একটা, পনেরো বছরের
মেয়ে একটা—পার করবে কোথা থেকে তার সংস্থান নেই—আবার কাল দেখি নিজের পয়সায় একগাদা কী মিটিং না ফিটিং-এর হ্যান্ডবিল ছেপে এনেছে। আর বলো কেন, একেবারে মাথা খারাপ!”
বলিলাম, “হ্যাঁ-হ্যাঁ, দেখেছিলুম বটে একখানা হ্যান্ডবিলে—জনসভা না কী—”
— “জনসভা না ওর মুণ্ড! ও নিজেই তো পরশু দুপুরে বসে বসে ওখানা লিখলে! আমার বাড়িতে দুজন বেকার ভাইপো আছে, তাদের নিয়ে কোথায় সব ঘুরছে ক দিন দেখতে পাই—সাড়ে সতেরো টাকা প্রেসের বিল কাল দিলে দেখলাম আমার সামনে—এদিকে শুনি, বাড়িতে নিতান্ত দুরবস্থা…অতবড়ো সব আইবুড়ো মেয়ে গলায়, এক পয়সার সংস্থান নেই—তার বিয়ে!”
মাঘ মাসের শেষে আমি কার্যোপলক্ষ্যে জলপাইগুড়ি যাইতেছি, পার্বতীপুর স্টেশনে দেখি, ভূষণদাদা একটি ব্যাগ হাতে প্ল্যাটফর্মে পায়চারি করিতেছেন। আমি গিয়া প্রণাম করিতেই বলিলেন, “আরে পাঁচু যে! ভালো তো? সেই পশ্চিমেই আজকাল চাকুরি করো তো? কোথায় যাচ্ছ এদিকে?”
“আজ্ঞে একটু জলপাইগুড়িতে। আপনি কোথায়?”
“আমি একটু যাচ্ছি কলকাতায়। হ্যাঁ, তোমাকে বলি—শোনোনি বোধ হয়, আমার ‘নারদ’-কাব্যের খুব আদর হয়েছে। এর মধ্যে কলকাতায় ইনস্টিটিউট হলে প্রকাণ্ড সভা হয়ে গেল তাই নিয়ে। অমুকবাবু সভাপতি ছিলেন। খুব উৎসাহ দেখলাম লোকজনের মধ্যে, খুব ভিড়—দেখবে? এই দেখো।” বলিয়াই ভূষণদাদা ব্যাগ খুলিয়া জনসভায় ছাপানো হ্যান্ডবিল একখানা আমার হাতে দিয়া বলিলেন, “পড়ে দেখো।”
জলসত্র
বৃদ্ধ মাধব শিরোমণিমশায় শিষ্যবাড়ি যাচ্ছিলেন।
বেলা তখন একটার কম নয়। সূর্য মাথার উপর থেকে একটু হেলে গিয়েছে। জ্যৈষ্ঠমাসের খররৌদ্রে বালি গরম, বাতাস একেবারে আগুন, মাঠের চারিধারে কোনোদিকে কোনো সবুজ গাছপালার চিহ্ন চোখে পড়ে না। এক-আধটা বাবলা গাছ যা আছে তাও পত্রহীন। মাঠের ঘাস রোদপোড়া—কটা। ব্রাহ্মণের কাপড়চোপড় গরম হাওয়ায় আগুন হয়ে উঠল, আর গায়ে রাখা যায় না। এক একটা আগুনের ঝলকের মতো দমকা হাওয়ায় গরম বালি উড়ে এসে তাঁর চোখে মুখে তীক্ষ হয়ে বিঁধছিল। জ্যৈষ্ঠমাসের দুপুরবেলা এ-মাঠ পার হতে যাওয়া যে ইচ্ছে করে প্রাণ দিতে যাওয়ার শামিল, এ কথা নবাবগঞ্জের বাজারে তাঁকে অনেকে বলেছিল, তবুও যে তিনি কারুর কথা না-শুনে জোর করেই বেরুলেন, সে কেবল বোধহয় কপালে দুঃখ ছিল বলেই।
