এবার শুনিলাম ভূষণদাদার সে চাকুরিটাও যায় যায়। বিনুই এ সংবাদ দিল।
ভূষণদাদা আসার পরদিন জিজ্ঞাসা করিলেন, “ওহে, তোমরা তো কলকাতায় ছাত্রমহলে ঘোরো, পাঁচটা কলেজের ছাত্রদের সঙ্গে দেখা হয়, ছাত্রমহলে আমার
বই সম্বন্ধে কী মতামত কিছু শুনেছ?” |||||||||| হঠাৎ বড়ো বিব্রত হইয়া পড়িলাম, আমতা আমতা সুরে বলিলাম, “আজ্ঞে হ্যাঁ—তা বেশ ভালোই—’
বলেন কী ভূষণদাদা! বিব্রত ভাবটা কাটিয়া গিয়া এবার আমার হাসি পাইল। কলকাতায় ছাত্রমহলে ভূষণ চক্রবর্তী নামই কেউ জানে না, তার বই পড়া! আর সে সম্বন্ধে মতামত।
ভূষণদাদা উত্তেজিত স্বরে বলিলেন, “কী কী, কীরকম বলে? আমার কোন বইটার কথা শুনেছ? পাষাণপুরী না দেওয়ালি?”
অকূলে কূল পাইলাম। ভূষণদাদার বইয়ের নাম কী আমার একটাও মনে ছিল ছাই! বলিলাম, “হ্যাঁ, ওই পাষাণপুরীর কথাই যেন শুনেছি।”
ভূষণদাদা আর আমায় ছাড়িতে চান না। কী শুনিয়াছি, কোথায় শুনিয়াছি, কাহার কাছে শুনিয়াছি? পাষাণপুরী তাঁর উপন্যাসগুলির মধ্যে সর্বোৎকৃষ্ট। তবুও তো তিনি পাবলিশার পান নাই, সব বই-ই নিজে ছাপাইয়াছেন, দিনাজপুরের অজ পাড়াগাঁয়ে বসিয়া বই বিক্রি ও বিজ্ঞাপনের কোনো সুবিধা করিতে পারেন নাই।
বিনু আমায় আড়ালে বলিল, “এই অবস্থা, পঞ্চাশটি টাকা মাইনে পান ডাক্তারি করে, সংসারই চলে না, তা থেকে খরচ করেন ওইসব বাজে বই ছাপতে। ভূষণদাদার চিরকালটা একরকম গেল। বাতিক যে কতরকমের থাকে!”
ইহার পর আরও ছ-সাত বছর কাটিয়া গেল।
আমি পাস করিয়া বাহির হইয়া নানারকম কাজকর্ম করি এবং সঙ্গে সঙ্গে কিছু কিছু লিখিও।
ভুষণদাদার প্রভাব আমার জীবন হইতে সম্পূর্ণ যায় নাই, মনের তলে কোথায়। চাপা ছিল, লেখক হওয়া একটা মস্ত বড়ড়া কিছু বুঝি! সেই যে আমাদের গ্রামে বাল্যকালে সেবার ভূষণদাদাকে সম্মান পাইতে দেখিয়াছিলাম, সেই হইতেই বোধ হয় লেখক হওয়ার সাধ মনে বাসা বাঁধিয়া থাকিবে, কে জানে?
আমার লেখকজীবন যখন পাঁচ-ছ বছরের পুরাতন হইয়া পড়িয়াছে, দু-চারখানা ভালো মাসিক পত্রিকায় লেখা প্রায়শ বাহির হয়, কিছু কিছু আরও হইতেছে, সে সময় কী একটা ছুটিতে দেশে গেলাম। বিনুদের বাড়িতে গিয়া দেখি, ভূষণদাদা অসুস্থ অবস্থায় সেখানে সপরিবারে কিছুদিন হইতে আছেন। আমায় বলিলেন, “পাঁচু, শুনলাম আজকাল লিখছ? কোন কোন কাগজে লেখা বেরিয়েছে?”
কাগজগুলির কয়েকখানি আমার সঙ্গেই ছিল, ইতিমধ্যে গ্রামের অনেকেই সেগুলি দেখিয়াছে। ভুষণদাদাকেও দেখাইলাম—দেখাইয়া বেশ একটু গর্ব অনুভব করিলাম।
ভূষণদাদা কাগজ ক-খানা উলটাইয়া দেখিয়া বলিলেন, “এইসব কাগজে লিখছ? বেশ বেশ। এসব তো বেশ নাম-করা পত্রিকা। একটু ধরাধরি করতে হয়, না? তুমি কাকে ধরেছিলে? একটু ধরাধরি না-করলে আজকাল কিছুই হয় না। গুণের আদর কী আর আছে? এই দেখো না কেন, আমি পাড়াগাঁয়ে থাকি বলে নিজেকে পুশ করতে পারলাম না। আমার ‘নারদ’-কাব্য পড়োনি? দু-বছর ধরে খেটে লিখেছি, প্রাণ দিয়ে লিখেছি। কিন্তু হলে হবে কী, ওই ধরাধরির অভাবে বইখানা নাম করতে পারছে না।”
বৈকালে নদীর ধারে বসিয়া ভূষণদাদার মুখে তাঁহার ‘নারদ’-কাব্যের অনেক ব্যাখ্যা শুনিলাম। অমিত্রাক্ষর ছন্দ হইলেও তাহার মধ্যে নিজস্ব জিনিস কী একটা ঢুকাইয়া দিয়াছেন ভূষণদাদা, অমন দার্শনিকতা আধুনিক কোনো বাংলা গ্রন্থে নাই, এ কথা তিনি জোর করিয়া বলিতে পারেন।
বলিলাম, “বইখানা ছেপেছে কারা?”
“আমিই ছেপেছি। লোকের দোরে দোরে বেড়িয়ে ছাপানোর জন্যে খোশামোদ করা—ওসব আমার দ্বারা হবে না।”
মনে হইল ভূষণদাদা আমারই প্রতি যেন বক্রকটাক্ষ করিতেছেন এইসব উক্তি দ্বারা। যাহা হউক, কিছু না-বলিয়া চুপ করিয়া রহিলাম।
বছরখানেক পরে আমি আমার কর্মস্থলে একটা বুকপোস্ট পাইলাম। খুলিয়া দেখি, ভূষণদাদা সেই ‘নারদ’-কাব্যখানি আমায় পাঠাইয়াছেন, সঙ্গে একখানা বড়ো চিঠি। ‘নারদ’-কাব্যখানির উচ্চ প্রশংসা করিয়া বহুলোক ইতিমধ্যে চিঠি লিখিয়াছেন। চিঠিগুলি তিনি পুস্তিকাকারে ছাপিয়া ওই সঙ্গে আমায় পাঠাইয়াছেন। আমি যেন কলিকাতার কোনো নামকরা কাগজে বইখানির ভালো ও বিস্তৃত সমালোচনা বাহির করিয়া দিই, এই ভূষণদাদার অনুরোধ।
ছাপানো প্রশংসাপত্রগুলি পড়িয়া আমার খুব ভক্তি হইল না। একজন মফসসলের কোন শহরের প্রধান ডাক্তার লিখিয়াছেন, কবি নবীনচন্দ্রের ‘রৈবতক’ কাব্যের পরে আর একখানি উৎকৃষ্ট কাব্য আবার বাংলা সাহিত্যে বাহির হইল বহুকাল পরে। আর একজন কোথাকার প্রধান উকিল লিখিতেছেন, কে বলে বাংলা ভাষার দুর্দিন? বাংলা সাহিতের দুর্দিন? যে দেশে আজও ‘নারদ’-কাব্যের মতো কাব্য রচিত হয়ে থাকে (মনে ভাবিলাম, ভদ্রলোক কী বাংলা কবিতার কিছুই পড়েন নাই?), সে দেশে, ইত্যাদি ইত্যাদি।
মন দিয়া ‘নারদ’-কাব্য পড়িলাম। নবীনচন্দ্রের ‘বৈবতক’-এর ব্যর্থ অনুকরণ। লম্বা লম্বা বক্তৃতা—মাঝে মাঝে ‘ভূমা’, ‘প্রপঞ্চ,’ ‘ক্ষর’, ‘অক্ষর,’ ‘শাশ্বত’, ‘অব্যয়’ প্রভৃতি শব্দের ভীষণ ভীড়—ইহাকে ‘নারদ’-কাব্য না-বলিয়া গীতা বা শ্রীমদ্ভাগবতের পদ্যে ব্যাখ্যা বলিলেও চলিত।
আমি চিঠির উত্তরে লিখিলাম, ‘নারদ’, বেশ লাগিয়াছে, তবে কলিকাতার কোনো নামকরা মাসিক পত্রিকায় ইহার বিস্তৃত সমালোচনা বাহির করা আমার সাধ্যায়ত্ত নয়। সে চিঠির উত্তরে ভূষণদাদা আমায় আরও দুই-তিনখানি পত্র লিখিলেন—যদি বইখানি আমার ভালো লাগিয়া থাকে, তবে সে-কথা ছাপাইয়া প্রকাশ করিবার সৎসাহস থাকা আবশ্যক ইত্যাদি। সে-সব চিঠির উত্তর দিলাম না।
