“বেশ বাংলা জানো তো! বই-টই পড় নাকি?”
এ সুযোগ ছাড়িলাম না, বলিলাম, “আজ্ঞে হ্যাঁ, আপনার বই সব পড়েছি।”
বলিতে ভুলিয়া গিয়াছি, ইতিমধ্যে ভূষণদার আরও দুইখানি উপন্যাস ও একখানি কবিতার বই বাহির হইয়াছিল—বিনুদের বাড়ি সেগুলিও আসিয়াছিল; বিনুর নিকট হইতে আমি সবগুলিই পড়িয়াছিলাম।
ভূষণদাদা বিস্ময়ের সুরে বলিলেন, “বলো কী? সব বই পড়েছ? নাম করো তো?”
“প্রেমের তুফান, বেণুর বিয়ে, কমলকুমারী আর দেওয়ালি।”
“বাঃ বাঃ, এ যে বেশ দেখছি। কী নাম বললে?”
বিনীতভাবে পুনরায় নিজের নাম নিবেদন করিলাম।
“বেশ ছেলে। দ্যাখ তো বিনু, তোর চেয়ে কত বেশি জানে!”
গর্বে আমার বুক ফুলিয়া উঠিল। একজন লেখক আমার প্রশংসা করিয়াছেন। তারপর ভূষণদাদা (বিনুর সুবাদে আমিও তাঁহাকে তখন ‘দাদা’ বলিয়া ডাকিতে আরম্ভ করিয়াছি) নবীন সেন এবং হেমচন্দ্রের কবিতা আবৃত্তি করিয়া শুনাইলেন। সাহিত্য, কবিতা এবং তাঁহার নিজের রচনা সম্বন্ধে অনেক কথা বলিলেন; তার কতক বুঝিলাম কতক বুঝিলাম না—এগারো বছরের ছেলের পক্ষে সব বোঝা সম্ভব ছিল না।
বছরের পর বছর কাটিয়া গেল। আমি হাইস্কুলে ভর্তি হইলাম। একদিন ভূষণদাদা সম্বন্ধে আমি এক বিষম ধাক্কা খাইলাম আমাদের স্কুলের বাংলা মাস্টারের নিকট হইতে। কী উপলক্ষ্যে মনে নাই, মাস্টারমশায় আমাদের ক্লাসের ছেলেদের জিজ্ঞাসা করিলেন, “বাংলার দেশের আরও দু-একজন বড়ো লেখকের নাম করতে
কে পারে?”
একজন বলিল, ‘নবীনচন্দ্র,’ একজন বলিল, ‘সুরেন ভটচাজ’ (তখনকার কালে মস্ত নাম), একজন বলিল, ‘রজনি সেন’ (তখন সবে উঠিতেছেন)—আমি একটু বেশি জানিবার বাহবা লইবার জন্য বলিলাম—’ভূষণচন্দ্র চক্রবর্তী।‘
মাস্টারমশায় বলিলেন, “কে?”
“ভূষণচন্দ্র চক্রবর্তী। আমি পড়েছি তাঁর সব বই, আমার সঙ্গে আলাপ আছে।”
“সে আবার কে?”
আমি মাস্টারমশায়ের অজ্ঞতা দেখিয়া অবাক হইলাম।
“কেন ভূষণচন্দ্র চক্রবর্তী খুব বড়ো লেখক–প্রেমের তুফান, কমলকুমারী, দেওয়ালি, বেণুর বিয়ে—এইসব বইয়ের—”।
মাস্টারমশায় হো হো করিয়া হাসিয়া উঠিলেন, ক্লাসের ছেলেদের বেশিরভাগই না-বুঝিয়া সে হাসিতে যোগ দিল। উহাদের সম্মিলিত হাসির শব্দে ক্লাসরুম ফাটিয়া পড়িবার উপক্রম হইল।
আমার কান গরম হইয়া উঠিল, রীতিমতো অপদস্থ বিবেচনা করিলাম নিজেকে। কেন, ভূষণদাদা বড়ো লেখক নন? বা রে!
মাস্টারমশায় বলিলেন, “তোমার গাঁয়ের আত্মীয় বলে আর তোমার সঙ্গে আলাপ আছে বলেই তিনি বড়ো লেখক হবেন তার কী মানে আছে? কে তাঁর নাম জানে? ওরকম বলো না।’
ভূষণদাদার সাহিত্যিক যশ ও খ্যাতি সম্বন্ধে আমি এ পর্যন্ত কেবল একতরফা বর্ণনাই শুনিয়া আসিয়াছি বিনুর মায়ের মুখে, বিনুর বাবার মুখে, ভূষণদাদার নিজের মুখে। তাহাই বিশ্বাস করিয়াছিলাম, সরল বালক মনে। এই প্রথম আমার তাহার উপর সন্দেহের ছায়াপাত হইল।
এতদিন গাঁয়ে থাকিয়া কেবল সুগন্ধি তেলের বিজ্ঞাপনের নভেলই পড়িয়াছি— ক্রমে স্কুল লাইব্রেরি হইতে বঙ্কিমচন্দ্রের ও আরও অন্যান্য বড়ো লেখকের বই লইয়া পড়িতে আরম্ভ করিলাম। বয়স বাড়িবার সঙ্গে সঙ্গে ভালো মন্দ বুঝিবার ক্ষমতাও জন্মিল—ফলে বছর চার-পাঁচ স্কুলে পড়িবার পরে আমার উপরে ভুষণচন্দ্র চক্রবর্তীর প্রভাব যে অত্যন্ত ফিকে হইয়া দাঁড়াইবে, ইহা অত্যন্ত স্বাভাবিক ব্যাপার।
আমি যে-বার ম্যাট্রিক পাস করিয়া কলেজে ভর্তি হইয়াছি, সে-বার শ্রাবণ মাসে বিনুর ভগ্নীর বিবাহ উপলক্ষ্যে ভূষণদাদা আবার আমাদের গ্রামে আসিলেন। তখন আমার চোখে তিনি আর ছেলেবেলার সে বড়ো লেখক ভূষণচন্দ্র নন, বিনুর ভূষণদাদা, সুতরাং আমারও ভূষণদাদা। তখন বেশ সমানে সমানে কথাবার্তা। বলিলাম, দাদারও আর সে মুরুব্বিয়ানা চাল নাই, থাকিবার কথাও নয়। তিনিও সমানে সমানেই মিশিলেন।
একখানা বই দেখিলাম, বিবাহ-বাটীর কুটুম্বসাক্ষাৎদের হাতে হাতে ঘুরিতেছে, কবিতার বই, নাম—’প্রতিমা-বিসর্জন’। দ্বিতীয় পক্ষের পত্নীর মৃত্যুতে শোকোচ্ছাস প্রকাশ করিয়া ভূষণদাদা কবিতা লিখিয়া বই ছাপাইয়াছেন বিনামূল্যে বিতরণের জন্য।
বিনুও তো আর বাল্যের সেই বিনু নাই। সে বলিল—”মজার কথা শোন, আগের বউদিদি ষোলো বছর ঘর করে ছেলেপুলের মা হয়ে মরে গেল বেচারি, তার বেলা শোকের কবিতা বেরুল না। দ্বিতীয় পক্ষের বউদি—দু-তিন বছর ঘর করে ডবকা বয়সেই মারা গেল—দাদার তাই শোকটা বড্ড লেগেছে—একেবারে। প্রতিমা—বি স র্জ-ন!”
ভূষণদাদা আমাকেও একখানা বই দিয়াছিলেন, দু-তিন দিন পরে আমায় বলিলেন, “প্রতিমা-বিসর্জন কেমন পড়লে হে?”
অতিসাধারণ ধরনের কবিতা বলিয়া মনে হইলেও বলিলাম, “বেশ চমৎকার!’’ ভূষণদাদা উৎসাহের সহিত বলিলেন, “বাংলা দেশে ‘উদভ্রান্ত-প্রেম’-এর পরে আমার মনে হয়, এ ধরনের বই আর বেরোয়নি। নিজের মুখে নিজের কথা বলছি বলে কিছু মনে কোরো না-তবে তোমাদের ছোটো দেখেছি, তোমাদের কাছে বলতে দোষ নেই।”
ভূষণদাদার দাড়ি চুলে বেশ পাক ধরিয়াছে, তাঁহাকে সমীহ করিয়া চলি, সুতরাং প্রতিবাদ না-করিয়া চুপ করিয়া গেলাম। যদিও ‘উদ্ভান্ত-প্রেম’-এর প্রতি আমার যে খুব শ্রদ্ধা ছিল তাহা নয়, তবুও ভূষণদাদার কথা শুনিয়া সমলোচনা-শক্তির প্রতি বিশ্বাস হারাইলাম।
ভূষণদাদার আর্থিক অবস্থা খুব ভালো নয়, অনেকদিন হইতেই জানি। তিনি ক্যাম্বেল স্কুল হইতে ডাক্তারি পাস করিয়া দিনাজপুরের এক সুদূর পল্লিগ্রামে জমিদারদের দাতব্যচিকিৎসালয়ে চাকুরি করিতেন, স্বাধীন ব্যাবসা কোনোদিন করেন নাই।
